ছাত্র-জনতার আন্দোলনে তখন দিশাহারা শেখ হাসিনার সরকার। সারাদেশে চলছে কারফিউ। বন্ধ ইন্টারনেট। এর মধ্যে ২১ জুলাই সকালে বসলেন আপিল বিভাগ। সকাল ১০টার আগে আপিল বিভাগের এজলাস কক্ষ আইনজীবী ও সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়।
সকাল ১০টা ১৫ মিনিটের দিকে প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানসহ ৭ বিচারপতি এজলাসে আসন গ্রহণ করেন। অন্য ছয়জন হলেন- বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম, বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী, বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম, বিচারপতি মো. শাহীনুর ইসলাম ও বিচারপতি কাশেফা হোসেন।
বিচারকাজ শুরু হয়ে যায়। প্রথমে আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় থাকা ১ ও ২ নম্বর মামলা শুনানির জন্য এক সপ্তাহ সময় আবেদন মঞ্জুর করেন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কোটা নিয়ে হাইকোর্টের রায় বাতিল করতে লিভ টু আপিলের শুনানি শুরু হয়।
প্রথমে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন শুনানি শুরু করেন। শুনানিতে তিনি হাইকোর্টের রায় বাতিলের পক্ষে বিভিন্ন আইনি যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন জাজমেন্টের রেফারেন্স তুলে ধরে বলেন, কোটা পদ্ধতি বাতিল করে সরকার ২০১৮ সালে যে পরিপত্র জারি করেছিল সেটি ছিল সরকারের পলিসি ডিসিশন। এই পলিসি ডিসিশনে আদালত হস্তক্ষেপ করতে পারেন না। প্রায় এক ঘণ্টা অ্যাটর্নি জেনারেল শুনানি করেন। এরপর শুনানি করেন লিভ টু আপিল দায়ের করা দুই ছাত্রের পক্ষের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট শাহ মঞ্জুরুল হক। তিনি কোটা নিয়ে হাইকোর্টের রায় বাতিলের পাশাপাশি কোটা পদ্ধতি সংস্কার করে রায় দেওয়ার আর্জি জানান আদালতের কাছে। রিটের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী।
এরপর আদালতের কাছে একে একে মতামত তুলে ধরেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ এফ হাসান আরিফ, অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, ব্যারিস্টার তানজীবুল আলম, ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর, অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না, অ্যাডভোকেট ইউনুছ আলী আকন্দ। শুনানিতে তারা প্রায় সবাই কোটা নিয়ে হাইকোর্টের রায় বাতিলের পক্ষে মত দেন। দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে শুনানি শেষ হয়। এরপর বিরতিতে যান আপিল বিভাগ। ১টা ২৫ মিনিটের দিকে প্রধান বিচারপতিসহ ৭ বিচারপতি আবারও এজলাসে আসন গ্রহণ করেন। তারপর কোটা নিয়ে হাইকোর্টের রায় বাতিল করে রায় ঘোষণা করেন আপিল বিভাগ। রায় পড়ে শোনান প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। তিনি বলেন, সাত বিচারপতি ঐকমত্যের ভিত্তিতেই এই রায় দিয়েছেন।
ঘোষিত রায়ে আন্দোলনরত কোমলমতি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে সর্বোচ্চ আদালত বেশ কিছু অভিমত দেন। একইসঙ্গে রায় ও আদেশের পর শিক্ষার্থীরা কোটা সংক্রান্ত চলমান কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেবে বলেও দৃঢ়ভাবে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন আদালত। আপিল বিভাগ বলেন, শিক্ষার্থীরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। দেশের বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও আইন বিভাগের দায়িত্ব একদিন তাদেরকেই নিতে হবে। আমরা যারা বয়োবৃদ্ধ আমাদেরকে তাদের জন্য জায়গা ছেড়ে দিতে হবে। কবি সুকান্তের ভাষায় ‘এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান’।
‘বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনে কার্পণ্য দেখানো যাবে না’
রায়ে আদালত বলেন, এই বিষয়গুলো আন্দোলনকারী সব শিক্ষার্থীকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে। তাদের চিন্তায়, মননে, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখতে হবে। তাহলেই শুধু পথ হারাবে না বাংলাদেশ। টিকে থাকবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিষ্ঠিত আমাদের এই মাতৃভূমি। এর মধ্য দিয়েই বেঁচে থাকবো আমরা, বেঁচে থাকবে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের সব শহীদদের স্মৃতি আদিকাল। মুক্তিযুদ্ধের শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাগণ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি লাল সবুজের পতাকা। তাদের প্রতি কোনো রকম অসম্মান অবশ্যই জাতি ভালোভাবে নেয় না। সংশ্লিষ্ট সবাইকে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনে যাতে আমাদের কখনো কার্পণ্য না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
রায়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক এবং সরকারের প্রতি ছয় দফা অভিমত দেন আপিল বিভাগ। অভিমতে আদালত বলেন, ভবিষ্যতে রাষ্ট্র কর্তৃক যে গুরু দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের উপর অর্পণ করা হবে সেজন্য নিজেদেরকে গড়ে তুলতে হবে। যাতে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার যথাযথ পরিবেশ সৃষ্টি হয়। স্ব স্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের অবিলম্বে ফিরে গিয়ে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করতে হবে। আশা করি আমাদের সন্তান তুল্য প্রিয় শিক্ষার্থীরা এক্ষেত্রে সব সময় দায়িত্বশীল ও ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে। এছাড়া সব বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুল ও মাদ্রাসাসমূহের প্রধানরা অনতিবিলম্বে শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে নিতে উদ্যোগী হবেন। আশা করি, শিক্ষকরা এ ব্যাপারে যত্নবান হবেন।
আন্দোলনরত কোমলমতি ছাত্রদের অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান, তারা যেন সন্তানদেরকে দ্রুত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে নিয়ে পড়াশোনায় মনোযোগী হতে উদ্বুদ্ধ করবেন। এছাড়া সরকারের প্রতি আহ্বান, দ্রুত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে সাহায্য করুন। যাতে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে গিয়ে পড়াশোনা ও হাসি-খেলার মধ্য দিয়ে তাদের সুন্দর জীবন সমাপ্ত করতে পারে।
রায় ঘোষণার আগে আপিল বিভাগ বলেন, কোটা আন্দোলন নিয়ে নিহত শিক্ষার্থী ও সহিংসতার ঘটনা তদন্তে হাইকোর্টের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেছে সরকার। কমিশন এরইমধ্যে কাজ শুরু করেছে। সরকারের প্রতি আহ্বান, তদন্ত কমিশন যাতে সঠিকভাবে অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিন। তদন্ত কমিশন প্রতিটি শিক্ষার্থীর মৃত্যুর কারণ উদঘাটন করে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করবে। আমরা মনে করি কমিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সরকার দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, ১০ জুলাই হাইকোর্টের রায় স্থগিত হওয়ায় (যদিও আপিল বিভাগ স্থিতাবস্থার আদেশ দিয়েছিলেন) ২০১৮ সালের কোটা পদ্ধতি বাতিল করে সরকারের পরিপত্রটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমাদের এই আদেশটির অর্থ শিক্ষার্থী ছেলে-মেয়েরা সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারেনি। ফলে নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে। ঝড়ে গেছে অনেকের প্রাণ, যা মোটেই কাম্য ছিল না।
আপিল বিভাগ বলেন, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের আদালতে এসে আইনজীবীর মাধ্যমে বক্তব্য তুলে ধরতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তারা আদালতে এসে বক্তব্য দেননি। তবে সাধারণ ছাত্রদের পক্ষ থেকে দুইজন ছাত্র আন্দোলনরত ছাত্রদের পক্ষে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করেন। দুই শিক্ষার্থীর পাশাপাশি সরকারের করা লিভ টু আপিল পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় দুটো আবেদনের বক্তব্য সমার্থক। তাই দুটি লিভ টু আপিলই নিষ্পত্তি করে এই রায় দেওয়া হলো। রায়ে আপিল বিভাগ বলেন, কোটা নির্ধারণের বিষয়টি রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণী বিষয়। তথাপি আদালত সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদের এখতিয়ারবলে সম্পূর্ণ ন্যায়বিচারের স্বার্থে সংবিধানের ১৯, ২৭, ২৮ (৪), ২৯(১) (২) অনুচ্ছেদে উল্লেখিত সমতার নীতি ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর প্রজাতন্ত্রের কমে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতকরণে সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের চাকরিতে নিয়োগ পাওয়ার জন্য কোটা প্রথা নির্ধারণ করা হলো। একইসঙ্গে এই রায়ের মধ্য দিয়ে ২০১৮ সালে কোটা পদ্ধতি বাতিল করে জারি করা সরকারের পরিপত্রটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অকার্যকর হলো।
এরপর আপিল বিভাগ চাকরিতে কোটার পরিমাণও নির্ধারণ করে দেন। যেখানে চাকরিতে শতকরা ৯৩ শতাংশ কোটা রাখা হয় মেধাবীদের জন্য। এছাড়া বীর মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানদের জন্য ৫ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য এক শতাংশ এবং প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য নির্ধারণ করা হয় এক শতাংশ কোটা। তবে নির্ধারিত কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে সংশ্লিষ্ট কোটার শূন্য পদগুলো সাধারণ মেধা তালিকা থেকে পূরণের নির্দেশনা দেন সর্বোচ্চ আদালত।
তবে, তখন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন এতোটাই তুঙ্গে ছিল যে, আপিল বিভাগের এই রায়ের দিকে নজর ছিল না ছাত্র-জনতার।
২১ জুলাই ২০২৪ : বসলেন আপিল বিভাগ, কোটা সংস্কার করে দিলেন রায়
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে তখন দিশাহারা শেখ হাসিনার সরকার। সারাদেশে চলছে কারফিউ। বন্ধ ইন্টারনেট। এর মধ্যে ২১ জুলাই সকালে বসলেন আপিল বিভাগ। সকাল ১০টার আগে আপিল বিভাগের এজলাস কক্ষ আইনজীবী ও সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়।
সকাল ১০টা ১৫ মিনিটের দিকে প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানসহ ৭ বিচারপতি এজলাসে আসন গ্রহণ করেন। অন্য ছয়জন হলেন- বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম, বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী, বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম, বিচারপতি মো. শাহীনুর ইসলাম ও বিচারপতি কাশেফা হোসেন।
বিচারকাজ শুরু হয়ে যায়। প্রথমে আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় থাকা ১ ও ২ নম্বর মামলা শুনানির জন্য এক সপ্তাহ সময় আবেদন মঞ্জুর করেন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কোটা নিয়ে হাইকোর্টের রায় বাতিল করতে লিভ টু আপিলের শুনানি শুরু হয়।
প্রথমে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন শুনানি শুরু করেন। শুনানিতে তিনি হাইকোর্টের রায় বাতিলের পক্ষে বিভিন্ন আইনি যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন জাজমেন্টের রেফারেন্স তুলে ধরে বলেন, কোটা পদ্ধতি বাতিল করে সরকার ২০১৮ সালে যে পরিপত্র জারি করেছিল সেটি ছিল সরকারের পলিসি ডিসিশন। এই পলিসি ডিসিশনে আদালত হস্তক্ষেপ করতে পারেন না। প্রায় এক ঘণ্টা অ্যাটর্নি জেনারেল শুনানি করেন। এরপর শুনানি করেন লিভ টু আপিল দায়ের করা দুই ছাত্রের পক্ষের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট শাহ মঞ্জুরুল হক। তিনি কোটা নিয়ে হাইকোর্টের রায় বাতিলের পাশাপাশি কোটা পদ্ধতি সংস্কার করে রায় দেওয়ার আর্জি জানান আদালতের কাছে। রিটের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী।
এরপর আদালতের কাছে একে একে মতামত তুলে ধরেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ এফ হাসান আরিফ, অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, ব্যারিস্টার তানজীবুল আলম, ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর, অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না, অ্যাডভোকেট ইউনুছ আলী আকন্দ। শুনানিতে তারা প্রায় সবাই কোটা নিয়ে হাইকোর্টের রায় বাতিলের পক্ষে মত দেন। দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে শুনানি শেষ হয়। এরপর বিরতিতে যান আপিল বিভাগ। ১টা ২৫ মিনিটের দিকে প্রধান বিচারপতিসহ ৭ বিচারপতি আবারও এজলাসে আসন গ্রহণ করেন। তারপর কোটা নিয়ে হাইকোর্টের রায় বাতিল করে রায় ঘোষণা করেন আপিল বিভাগ। রায় পড়ে শোনান প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। তিনি বলেন, সাত বিচারপতি ঐকমত্যের ভিত্তিতেই এই রায় দিয়েছেন।
ঘোষিত রায়ে আন্দোলনরত কোমলমতি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে সর্বোচ্চ আদালত বেশ কিছু অভিমত দেন। একইসঙ্গে রায় ও আদেশের পর শিক্ষার্থীরা কোটা সংক্রান্ত চলমান কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেবে বলেও দৃঢ়ভাবে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন আদালত। আপিল বিভাগ বলেন, শিক্ষার্থীরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। দেশের বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও আইন বিভাগের দায়িত্ব একদিন তাদেরকেই নিতে হবে। আমরা যারা বয়োবৃদ্ধ আমাদেরকে তাদের জন্য জায়গা ছেড়ে দিতে হবে। কবি সুকান্তের ভাষায় ‘এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান’।
‘বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনে কার্পণ্য দেখানো যাবে না’
রায়ে আদালত বলেন, এই বিষয়গুলো আন্দোলনকারী সব শিক্ষার্থীকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে। তাদের চিন্তায়, মননে, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখতে হবে। তাহলেই শুধু পথ হারাবে না বাংলাদেশ। টিকে থাকবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিষ্ঠিত আমাদের এই মাতৃভূমি। এর মধ্য দিয়েই বেঁচে থাকবো আমরা, বেঁচে থাকবে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের সব শহীদদের স্মৃতি আদিকাল। মুক্তিযুদ্ধের শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাগণ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি লাল সবুজের পতাকা। তাদের প্রতি কোনো রকম অসম্মান অবশ্যই জাতি ভালোভাবে নেয় না। সংশ্লিষ্ট সবাইকে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনে যাতে আমাদের কখনো কার্পণ্য না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
রায়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক এবং সরকারের প্রতি ছয় দফা অভিমত দেন আপিল বিভাগ। অভিমতে আদালত বলেন, ভবিষ্যতে রাষ্ট্র কর্তৃক যে গুরু দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের উপর অর্পণ করা হবে সেজন্য নিজেদেরকে গড়ে তুলতে হবে। যাতে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার যথাযথ পরিবেশ সৃষ্টি হয়। স্ব স্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের অবিলম্বে ফিরে গিয়ে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করতে হবে। আশা করি আমাদের সন্তান তুল্য প্রিয় শিক্ষার্থীরা এক্ষেত্রে সব সময় দায়িত্বশীল ও ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে। এছাড়া সব বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুল ও মাদ্রাসাসমূহের প্রধানরা অনতিবিলম্বে শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে নিতে উদ্যোগী হবেন। আশা করি, শিক্ষকরা এ ব্যাপারে যত্নবান হবেন।
আন্দোলনরত কোমলমতি ছাত্রদের অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান, তারা যেন সন্তানদেরকে দ্রুত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে নিয়ে পড়াশোনায় মনোযোগী হতে উদ্বুদ্ধ করবেন। এছাড়া সরকারের প্রতি আহ্বান, দ্রুত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে সাহায্য করুন। যাতে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে গিয়ে পড়াশোনা ও হাসি-খেলার মধ্য দিয়ে তাদের সুন্দর জীবন সমাপ্ত করতে পারে।
রায় ঘোষণার আগে আপিল বিভাগ বলেন, কোটা আন্দোলন নিয়ে নিহত শিক্ষার্থী ও সহিংসতার ঘটনা তদন্তে হাইকোর্টের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেছে সরকার। কমিশন এরইমধ্যে কাজ শুরু করেছে। সরকারের প্রতি আহ্বান, তদন্ত কমিশন যাতে সঠিকভাবে অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিন। তদন্ত কমিশন প্রতিটি শিক্ষার্থীর মৃত্যুর কারণ উদঘাটন করে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করবে। আমরা মনে করি কমিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সরকার দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, ১০ জুলাই হাইকোর্টের রায় স্থগিত হওয়ায় (যদিও আপিল বিভাগ স্থিতাবস্থার আদেশ দিয়েছিলেন) ২০১৮ সালের কোটা পদ্ধতি বাতিল করে সরকারের পরিপত্রটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমাদের এই আদেশটির অর্থ শিক্ষার্থী ছেলে-মেয়েরা সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারেনি। ফলে নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে। ঝড়ে গেছে অনেকের প্রাণ, যা মোটেই কাম্য ছিল না।
আপিল বিভাগ বলেন, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের আদালতে এসে আইনজীবীর মাধ্যমে বক্তব্য তুলে ধরতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তারা আদালতে এসে বক্তব্য দেননি। তবে সাধারণ ছাত্রদের পক্ষ থেকে দুইজন ছাত্র আন্দোলনরত ছাত্রদের পক্ষে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করেন। দুই শিক্ষার্থীর পাশাপাশি সরকারের করা লিভ টু আপিল পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় দুটো আবেদনের বক্তব্য সমার্থক। তাই দুটি লিভ টু আপিলই নিষ্পত্তি করে এই রায় দেওয়া হলো। রায়ে আপিল বিভাগ বলেন, কোটা নির্ধারণের বিষয়টি রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণী বিষয়। তথাপি আদালত সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদের এখতিয়ারবলে সম্পূর্ণ ন্যায়বিচারের স্বার্থে সংবিধানের ১৯, ২৭, ২৮ (৪), ২৯(১) (২) অনুচ্ছেদে উল্লেখিত সমতার নীতি ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর প্রজাতন্ত্রের কমে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতকরণে সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের চাকরিতে নিয়োগ পাওয়ার জন্য কোটা প্রথা নির্ধারণ করা হলো। একইসঙ্গে এই রায়ের মধ্য দিয়ে ২০১৮ সালে কোটা পদ্ধতি বাতিল করে জারি করা সরকারের পরিপত্রটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অকার্যকর হলো।
এরপর আপিল বিভাগ চাকরিতে কোটার পরিমাণও নির্ধারণ করে দেন। যেখানে চাকরিতে শতকরা ৯৩ শতাংশ কোটা রাখা হয় মেধাবীদের জন্য। এছাড়া বীর মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানদের জন্য ৫ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য এক শতাংশ এবং প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য নির্ধারণ করা হয় এক শতাংশ কোটা। তবে নির্ধারিত কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে সংশ্লিষ্ট কোটার শূন্য পদগুলো সাধারণ মেধা তালিকা থেকে পূরণের নির্দেশনা দেন সর্বোচ্চ আদালত।
তবে, তখন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন এতোটাই তুঙ্গে ছিল যে, আপিল বিভাগের এই রায়ের দিকে নজর ছিল না ছাত্র-জনতার।
সম্পাদক ও প্রকাশক
এ এম জি ফেরদৌস
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
নাহিদুল ইসলাম ফাহিম
বার্তা সম্পাদক
এ কে এম আবু সাঈম
|
প্রধান কার্যালয়
পূর্ব লিংক রোড, ঝিলংজা, কক্সবাজার, বাংলাদেশ, ৪৭০০
মোবাইল: ০১৮১৯-৫০২-৩২২
ই-মেইল beachnews247@gmail.com |
প্রিন্টের তারিখ ও সময়: July 22, 2026, 3:41 am