বিআইএন ছাড়া ঋণ নয়, এসএমই খাত নিয়ে এবিবি-এনবিআর মুখোমুখি

  বিশেষ প্রতিনিধি    29-09-2026    9
বিআইএন ছাড়া ঋণ নয়, এসএমই খাত নিয়ে এবিবি-এনবিআর মুখোমুখি

ভ্যাটের আওতা বাড়াতে সরকার চলতি অর্থবছরে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব খোলা ও ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার বা বিআইএন বাধ্যতামূলক করে। এমন সিদ্ধান্তে দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি এসএমই (সিএমএসএমই) খাতের লাখো উদ্যোক্তা চাপে পড়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

উদ্যোক্তাদের চাপের মুখে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ওই শর্ত শিথিল বা বাতিলের দাবি জানিয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এমন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আইনি বাধ্যবাধকতার কথা বলে উল্লেখ করে ইতোমধ্যে তা নাকচ করে দিয়েছে।

এনবিআর বলছে আইন অনুসারে সবাইকে একই নিয়মের আওতায় আনতে হবে। কঠোর যাচাইয়ের মাধ্যমে বিআইএন নিবন্ধন বাড়ানো এবং ভ্যাটের আওতা সম্প্রসারণই মূল লক্ষ্য প্রতিষ্ঠানটির। অন্যদিকে এবিবির যুক্তি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বাস্তবতা বিবেচনা না করে হঠাৎ কঠোর শর্ত চাপিয়ে দিলে ঋণপ্রবাহ ব্যাহত হতে পারে। সিএমএসএমই খাতে ঋণের গতি কমে গেলে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। অর্থ্যাৎ ব্যাংকগুলোও হিসাব খোলা ও ঋণ বিতরণে বেকায়দায় পড়ছে বলে দাবি এবিবির।

এ বিষয়ে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা বলেন, ভ্যাটের আওতা বাড়ানো সরকারের বৈধ ও প্রয়োজনীয় লক্ষ্য। বিআইএন বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি কোনো ব্যাংক বা এনবিআরের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নয়। এটি আইন অনুযায়ী করা হয়েছে। ক্ষুদ্র, মাঝারি বা বড় সব ধরনের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের জন্যই একই বিধান প্রযোজ্য। এর মূল উদ্দেশ্য হলো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আনুষ্ঠানিক কর কাঠামোর আওতায় আনা এবং ভ্যাটের ভিত্তি সম্প্রসারণ করা।

অন্যদিকে এসএমই খাত সংশ্লিষ্ট এক ব্যবসায়ী বলেন, এসএমই খাতের বাস্তবতা উপেক্ষা করে হঠাৎ কঠোর বাস্তবায়ন করলে লাখো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ব্যাংকিং সেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। পর্যায়ক্রমিক বাস্তবায়ন, সাময়িক শিথিলতা বা বিদ্যমান ব্যাংকিং রেকর্ডকে সহায়ক প্রমাণ হিসেবে বিবেচনার সুযোগ রাখা যেতে পারে। এনবিআরের কঠোর অবস্থানের কারণে ব্যাংকগুলো এখন নতুন হিসাব খোলা ও ঋণ অনুমোদনে আরও সতর্ক হয়ে উঠেছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে এসএমই খাতকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে স্পষ্ট মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের দাবি ও এনবিআরের জবাব

অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি (সিএমএসএমই) উদ্যোক্তাদের অনেকের বিআইএন নেই বা নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতেও সময় লাগছে। ফলে নতুন হিসাব খোলা ও ঋণ পাওয়ায় বিঘ্ন ঘটছে। করপোরেট ও ব্যবসায়িক গ্রাহকরাও সমস্যায় পড়ছেন। এসব ভোগান্তির কথা বিবেচনা করে এবিবি গত ১৭ আগস্ট এনবিআর চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়ে তিনটি দাবি জানায় সংগঠনটি। যার মধ্যে রয়েছে - কটেজ, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যাংক হিসাব খোলা এবং ঋণ বা ক্রেডিট সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে বিআইএন নিবন্ধনের প্রমাণ দাখিলের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেওয়া।

এই অব্যাহতির প্রস্তাব বিবেচনা ও বাস্তবায়নের আগ পর্যন্ত সিএমএসএমই গ্রাহকদের জন্য বিআইএন দাখিলের সময়সীমা যুক্তিসঙ্গতভাবে বাড়ানো। এবং এসএমই উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে বিআইএন আনুষ্ঠানিকীকরণ পর্যায়ক্রমে ও ধাপে ধাপে করা। এটি ট্রেড লাইসেন্স বা ব্যবসায়িক নিবন্ধনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে এবং প্রয়োজনে বিদ্যমান ব্যাংকিং রেকর্ডকে সহায়ক প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

ওই দাবির প্রেক্ষিতে এনবিআর ১৭ সেপ্টেম্বর এবিবিকে জবাব দিয়ে জানিয়েছে, মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ধারা-৪-এর উপধারা (৩)-এর দফা (ক) ও (খ) অনুযায়ী ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চলতি হিসাব বা এসটিডি হিসাব খোলা, পরিচালনা এবং ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে বিআইএন উপস্থাপন বাধ্যতামূলক। তাই আইনি বাধ্যবাধকতা থাকায় এবিবির আবেদন বিবেচনার কোনো সুযোগ নেই। সার্বিক বিবেচনায় এনবিআর বলছে যেসব প্রতিষ্ঠান আগে বিআইএন ছাড়া হিসাব খুলেছে, তাদের দ্রুত ভ্যাট নিবন্ধন গ্রহণ করতে উৎসাহিত করতে হবে এবং নতুন হিসাব খোলার ক্ষেত্রে আবশ্যিকভাবে বিআইএন যাচাই করতে উচিত।

কেন বিআইএন বাধ্যতামূলক

চলতি অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ভ্যাটের ভিত্তি প্রশস্ত করার অংশ হিসেবে ব্যবসার উদ্দেশ্যে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার প্রক্রিয়াকে ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় আনার প্রস্তাব করেন। বাজেট পাসের পর অর্থ বিলে এই বিধান অন্তর্ভুক্ত হয়। নতুন আইন অনুযায়ী, অন্যান্য আইনে যাই থাকুক না কেন, ব্যাংক, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট কিংবা শর্ট-টার্ম ডিপোজিট (এসটিডি) হিসাব খোলা বা পরিচালনার সময় বিআইএন প্রমাণপত্র বাধ্যতামূলক করা হয়। একই শর্ত ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এছাড়া ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলা, বাণিজ্য সংগঠনের সদস্যপদ, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ এবং বিআরটিএতে কোম্পানির নামে যানবাহন নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও বিআইএন লাগবে।

এখানে এনবিআরের যুক্তি, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে আরও বেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে আনুষ্ঠানিক কর কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা যাবে এবং রাজস্ব সংগ্রহ বাড়বে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) থেকে পাওয়া তথ্যানুসারে, দেশে মোট অর্থনৈতিক ইউনিট প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ ২ হাজার ৭৯২টি। এর মধ্যে প্রায় ৯৯ শতাংশই কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) প্রতিষ্ঠান। আকারভেদে মাইক্রো রয়েছে প্রায় ৬৬ লাখ ৩১ হাজার, কুটির প্রায় ৪৫ লাখ ৩৩ হাজার, ক্ষুদ্র প্রায় ৪ লাখ ৯২ হাজার, মাঝারি প্রায় ৩৬ হাজার এবং বৃহৎ ৯ হাজারেরও কম। এসব খাতে কর্মসংস্থান ৩ কোটিরও বেশি মানুষের, যা শিল্প খাতের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশ। জিডিপিতে এর অবদান বিভিন্ন হিসাবে ২৫ থেকে ৩২ শতাংশের মধ্যে। ওই সব উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশ এখনো বিআইএন নিবন্ধনের বাইরে থাকার ফলেই হিসাব খোলা ও ঋণ পাওয়ায় জটিলতা দেখা দিয়েছে। সে কারণেই এনবিআর সবাইকে একই আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে।

সারাদেশ-এর আরও খবর

আরও পড়ুন