পর্যটনের টানে বদলে যাচ্ছে পাহাড়, খুলছে নতুন জীবিকার দুয়ার

  বিশেষ প্রতিনিধি    01-08-2026    43
পর্যটনের টানে বদলে যাচ্ছে পাহাড়, খুলছে নতুন জীবিকার দুয়ার

পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে সবুজের সমারোহ। কোথাও মেঘের সঙ্গে পাহাড়ের লুকোচুরি, কোথাও ঝরণা-ছড়া, কিংবা সবুজ অরণ্য। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাহাড়ের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, খাবার, পোশাক ও জীবনযাত্রা। প্রকৃতি ও সংস্কৃতির এই বৈচিত্র্যের কারণে দেশের পর্যটন মানচিত্রে আলাদা অবস্থান তৈরি করেছে খাগড়াছড়ি।

আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র, হর্টিকালচার হেরিটেজ পার্ক, রিছাং ঝরণা, মায়াবিনী লেকসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে ছুটির দিন ও পর্যটন মৌসুমে বাড়ে পর্যটকের ভিড়। পর্যটকদের ঘিরে শহর ও পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে গড়ে উঠেছে হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ছোট দোকান, স্থানীয় খাবার ও কৃষিপণ্যের ব্যবসা। পর্যটনের এই বিস্তারের সঙ্গে ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে পাহাড়ের মানুষের আয়-রোজগারের ধরনও।

একসময় পাহাড়ের বহু পরিবারের প্রধান অবলম্বন ছিল কৃষিকাজ। কৃষিনির্ভর সেই অর্থনীতির সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে পর্যটননির্ভর নানা কর্মকাণ্ড। কেউ গাড়ি চালাচ্ছেন, কেউ হোটেল-রেস্তোরাঁয় কাজ করছেন, কেউ স্থানীয় খাবার বিক্রি করছেন, আবার কেউ গাইড, কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হিসেবে আয় করছেন। ফলে পর্যটন এখন শুধু বিনোদনের খাত নয়, অনেকের কাছে হয়ে উঠছে বিকল্প জীবিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, সম্ভাবনার তুলনায় খাগড়াছড়িতে পর্যটন এখনও অনেকটাই অপরিকল্পিত। পর্যাপ্ত অবকাঠামো, বিনিয়োগ, পর্যটনকেন্দ্রগুলোর মধ্যে যোগাযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। এসব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে পারলে পর্যটন খাত জেলার অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে পারে।

বিশেষ করে পাহাড়ের তরুণদের জন্য পর্যটন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে। কৃষিকাজের পাশাপাশি গাড়ি চালানো, রেস্তোরাঁ, আবাসন, গাইডিং, ফটোগ্রাফি, অনলাইন প্রচার, হস্তশিল্প ও স্থানীয় খাবারের ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

পর্যটনের সুফল পাচ্ছেন পাহাড়ের বাসিন্দারা

পর্যটনের বিস্তারের ফলে শুধু শহরকেন্দ্রিক ব্যবসায়ীরাই নন, প্রত্যন্ত এলাকার অনেক বাসিন্দাও বিভিন্নভাবে উপকৃত হচ্ছেন। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ফলমূল, শাকসবজি, বাঁশ-বেতের তৈরি পণ্য, পাহাড়ি খাবার, পোশাক ও হস্তশিল্প পর্যটকদের কাছে বিক্রির সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

পর্যটনকেন্দ্রের আশপাশে ছোট খাবারের দোকান, চায়ের দোকান, ফলের দোকান ও বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসা গড়ে উঠছে। স্থানীয় তরুণদের কেউ কেউ পর্যটকদের গন্তব্য দেখানো, পরিবহন সহযোগিতা কিংবা বিভিন্ন সেবা দেওয়ার মাধ্যমে আয় করছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এভাবে পর্যটনের সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতির সংযোগ যত বাড়বে, ততই পাহাড়ের মানুষের সামনে বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি হবে। এতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি তরুণদের কর্মসংস্থানও বাড়বে।

পর্যটনবিরোধিতার পেছনে স্বার্থান্বেষী মহল—স্থানীয়দের অভিযোগ

তবে পর্যটনের সম্ভাবনার পাশাপাশি এ খাতের বিকাশে নানা বাধার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের একটি অংশের অভিযোগ, পাহাড়ের পর্যটন খাত বিকশিত হলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে, কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং অনেক পরিবার নিজেদের উদ্যোগে স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে। এ কারণে স্বার্থান্বেষী কিছু মহল পর্যটনের বিকাশে নানা অপপ্রচার ও বাধা সৃষ্টি করছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠলে পাহাড়ের সাধারণ মানুষ নানা ধরনের প্রভাব, উসকানি বা তথাকথিত আন্দোলনের ওপর নির্ভরশীল থাকবে না। নিজেদের কর্মসংস্থান ও ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত থাকবে তারা। এ কারণে পাহাড়ের বাসিন্দাদের অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে রাখতে কোনো কোনো মহল পর্যটনসহ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সারাদেশ-এর আরও খবর

আরও পড়ুন