বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও ১৫ আগস্টের ইতিহাস এবং তার স্ত্রীর অপহরণসহ বিভিন্ন প্রসঙ্গে জানালেন দীর্ঘদিন আড়ালে থাকা মেজর ডালিম

  বিশেষ প্রতিনিধি    07-01-2025    145
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও ১৫ আগস্টের ইতিহাস এবং তার স্ত্রীর অপহরণসহ বিভিন্ন প্রসঙ্গে জানালেন দীর্ঘদিন আড়ালে থাকা মেজর ডালিম

দীর্ঘদিন আড়ালে থাকা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা মেজর ডালিম রবিবার দিবাগত রাতে প্রবাসী সাংবাদিক ইলিয়াস হোসেনের ইউটিউব চ্যানেলে লাইভ টকশোতে অংশগ্রহণ করেন। লাইভ টকশোতে তিনি বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ইতিহাস এবং তার স্ত্রীর অপহরণসহ বিভিন্ন প্রসঙ্গে তুলে ধরেন। এছাড়া বিদেশে নির্বাসিত আলোচিত এই সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ৫০ বছরের নানা ঘটনার কথা উল্লেখ করেন।

৫ জানুয়ারি রোববার রাতে বিশেষ লাইভে যুক্ত আছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর ডালিম (বীর বিক্রম) শিরোনামের লাইভে যুক্ত হন সাবেক এই সামরিক কর্মকর্তা। ইলিয়াসের নিজের ইউটিউব চ্যানেলে প্রচারিত টকশোটি মুহূর্তেই ভাইরাল হয়।

টকশোতে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও ৭৫ এর ১৫ আগস্টের নেপথ্যের ইতিহাস তুলে ধরেন বিদেশে নির্বাসিত আলোচিত এই সাবেক সামরিক কর্মকর্তা।

টকশোর শুরুতে মেজর ডালিম বলেন, দেশবাসীকে বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের ছাত্র-জনতাকে, যারা আংশিক বিজয় অর্জন করেছেন, তাদের লাল শুভেচ্ছা জানাই। বিপ্লব একটি সমাজ যেকোনো রাষ্ট্রে একটি চলমান প্রক্রিয়া। সেই অর্থে তাদের বিজয় এখনও পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। তার জন্য আরও সময় প্রয়োজন।

২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের নেপথ্যের নায়ক ছাত্র-জনতাকে পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, সম্প্রসারণবাদী-হিন্দুত্ববাদী ভারত যার কবজায় আমরা প্রায় চলে গিয়েছি। সেই অবস্থান থেকে সেই ৭১ এর মতো আরেকটা স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে। তা না হলে বিপ্লব ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।

১৫ই আগস্ট ১৯৭৫ এর হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, খুবই স্পর্শকাতর প্রশ্ন। নিজের বাদ্য নিজে বাজানো যায় না। প্রথম কথা, ১৫ই আগস্ট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। এটার সূত্রপাত হয় মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অবস্থায়। আমরা বুঝতে পেরেছিলাম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধটা কাদের ইন্টারেস্টে হচ্ছে? এটা কি আমাদের ইন্টারেস্টের জন্য হচ্ছে যে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করবো। নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্য কাজ করবো।

মেজর ডালিম বলেন, প্রথম ১৫ই আগস্ট এটা সূএপাত হয় মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অবস্থায়, আমরা বুঝতে পেরেছিলাম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একচুয়ালি কাদের ইন্ধনে হচ্ছে এটা কি শুধুমাত্র বাংলাদেশ ইন্ধনে দিয়েছে নাকি পিছনে অন্য কারের ইন্ধন রয়েছে, যখন ৭ দফা চুক্তি করে নজরুল ইসলাম এবং তাজউদ্দিন আহমেদকে তখন তাদের পারমিশন দেওয়া হলো প্রবাসী সরকার গঠন করার, এই ৭ দফা পড়ে সাইন করা শেষে নজরুল ইসলাম জ্ঞান হারায় ফেলেন, কারণ সেই ৭ দফা চুক্তিতে ইন্ডিয়ার দাস ঘর ছিল বাংলাদেশ, একটা চুক্তি ছিল ইন্ডিয়ার স্বার্থ কারণ ভারত একটা কর্ণরাজ্য, তারি ধারাবাহিকতা হিসেবে বাংলাদেশকে অঙ্গরাজ্য হিসেবে শাসন করতে চাই ভারত।

আর ওই জয়েন ডিক্লারেশন ওসমানী ও জেনারেল মানিকসহ জয়েন্ট কমান্ড স্টাফ লিস্ট করার পর বাংলাদেশের মুক্তিফৌজ কমান্ডারিং চিপ হিসেবে কাজ করার কথা ছিল জেনারেল ওসমানির কিন্তু তখন সেটা হতে দেয়া হলো না। ১৬ই ডিসেম্বরে যে রেসকোর্স ময়দানে স্যালেন্ডারের হল সেখানে পরিষ্কার বাংলাদেশের জনগণ দেখতে পেল যে পাকিস্তান আর্মি সালেন্ডার করছে ইন্ডিয়ান আর্মির কাছে, এবং সেখানে সাইন করছেন ভারতীয আরোরা, আর ওদিকে সাইন করছে নিয়াজি পাকিস্তানি আর্মির পক্ষে, তাহলে সেখানে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা কোথায়?

তখন বাংলাদেশের মুক্তিফৌজরা পড়ে থাকল ঝাড়ুদার হিসেবে, আর ইন্ডিয়ান আর্মিরা রাস্তা পরিষ্কার করে তাদের শোষণ কাজ শুরু করে দিল, তখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শহর গঞ্জে ঢোকার কোন পারমিশনই দিল না তাজউদ্দিনের সরকার, মানে আওয়ামী লীগের সরকার।

আওয়ামী লীগের শুরুটা হয়েছিল তাজাউদ্দিন এর হাত ধরে, এমত অবস্থায় তখন কি প্রমাণিত হলো যে বাংলাদেশের জনগণ নিজেরা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেনি, বাংলাদেশ নামক একটা রাষ্ট্রকে জন্ম দেওয়া হয়েছে যেখানে ইন্ডিয়ার ভূমিকা ছিল অপরিসীম, এখান থেকে শুরু হলো বাংলাদেশের ইতিহাসের, যুদ্ধের আগে মুজিব তার পুরো পরিবারকে পাকিস্তানি আর্মির কাছে তুলে দিয়ে নিজে আত্তসর্ম্পণ করলো। এরপর যুদ্ধ শেষে শেখ মুজিবকে যখন ছাড়া হল জেল থেকে সে তখন মুক্তিযুদ্ধের কিছুই জানতো না, যে দেশ স্বাধীন হয়েছে, হাজার হাজার মানুষ দেশের জন্য জীবন দিয়েছে, দেশে মুক্তি ফৌজ বলে কোন কিছু ছিল, সে কিছুই জানতো না।

তাকে যখন ছেড়ে দেওয়া হল তখন জেল থেকে ছাড়া পেয়ে শেখ মুজিব ইন্দিরা গান্ধীকে ফোন করে বলল আমি দেশে ফিরে যাচ্ছি, আর আমি দেশে যাওয়ার আগে আপনার সাথে একটু দেখা করে আপনাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই। ইন্দিরা গান্ধী তখন বলল কৃতজ্ঞতা জানাবেন আপনাকে ফোন আমি দিতাম আপনি আগে সরাসরি ঢাকায় যাবেন না, আগে নয়া দিল্লি হয়ে তারপর দেশে যাবেন। মুজিব তখন সেটাই করলেন তিনি লন্ডন হয়ে চলে গেলেন নয়া দিল্লি, সেখানে গিয়ে কি হলো ওই যে ৭ দফা সাইন করেছিল প্রবাসী সরকার গঠন করার জন্য, তাজ উদ্দিন আহমেদ এবং নজরুল সেখানে সাইন করার পর সরকার গঠন না করে আওয়ামী লীগ সরকার নিজেই ক্ষমতা দখল করল, আর সেই ৭ দফাতে দিল্লি গিয়ে সাইন করল শেখ মুজিব, সাইন করে দেশে এসে তাজউদ্দিনকে শেখ মুজিব বলল যে তোমাকে প্রাইম মিনিস্টার থাকার দরকার নেই , এখন থেকে প্রাইম মিনিস্টার আমি।

তারপর তিনি বাংলাদেশের ক্ষমতা নিজের হাতে তুলে নিলেন, তারপর কি হলো নতুন করে কোন নির্বাচন নেই ওই যে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের সুবাদে ইন্ডিয়ান তার-তরম্ভ ডুপ্লিকেট করে বাংলাদেশে ইনপুট করল আওয়ামী লীগ, তারপর তারা নিজে একটা সংগঠন করল হুবহু এক ইন্ডিয়া তার-তরম্ভ বাংলাদেশে চলছে কোন পরিবর্তন নেই।

এই বীর বিক্রম বলেন, যখন সাতদফাতে চুক্তি করে নজরুল ইসলাম, তাজ উদ্দিনকে পারমিশন দেওয়া হলো একটা প্রভিশনাল গভমেন্ট গঠন করার। সাতটা ক্লজ পড়ে সাইন করার পর নজরুল ইসলাম ফিট হয়ে পড়ে গিয়েছিলেন যে, আমরা ক্রমান্বয়ে ভারতের একটা করদরাজ্য-অঙ্গরাজ্যে পরিণত হব।

তিনি বলেন, শেখ মুজিব তার জুলুমের মাত্রা এতোটাই তীব্র করেছিল স্বৈরাচারী আচরণের মতো যে, তখন মানুষ রবের কাছে মুক্তি চাচ্ছিল তার জুলুমের অবসানের জন্য।

মেজর ডালিম বলেন, মুজিব তো মারা যায়নি, মুজিব একটি সেনা অভ্যুত্থানে নিহত হয়েছেন। সেনা অভ্যুত্থান তো আর আর খালি হাতে মার্বেল খেলা না। ওখানে দুই পক্ষ থেকেই গোলাগুলি হয় এবং হতাহত হয় দুইপক্ষেই। যেমন মুজিবের পক্ষের কিছু লোক মারা গেল সেভাবে সেনাঅভ্যুত্থানকারী বিপ্লবীদের পক্ষ থেকেও কিছু লোক প্রাণ হারায়। এটাই বাস্তবতা। কিন্তু বিপ্লবীরা বিজয়ী হয়ে গেল, তারা ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়ে নিলো।

তিনি বলেন, মুজিবের মৃত্যুর খবর জানার পর আর বাকশালের পতনের খবর জানার পর শহর বন্দর গ্রামের লাখ লাখ মানুষ আনন্দ মিছিল বের করলো। যে সমস্ত রাজনৈতিক নেতা বা দলগুলো আন্ডারগ্রাউন্ড ছিল তারাও জনসমর্থন নিয়ে রাস্তায় চলে আসে। এভাবেই জনস্বীকৃতি পেয়েছিল ১৫ আগস্টের বৈপ্লবিক সামরিক অভ্যুত্থান।

জাতীয় সঙ্গীত ইস্যুতে মেজর ডালিম বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের না হয়ে কাজী নজরুল ইসলাম বা অন্যান্য স্বনামধন্য দেশীয় কবিদের গান হতে পারত। ভিনদেশী একজন কবির গানকে জাতীয় সঙ্গীত বানানোকে পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মেজর ডালিম তার স্ত্রীর অপহরণের প্রসঙ্গে ইলিয়াসের প্রশ্নের জবাবে বলেন, এটা একটা মজার ঘটনা। আমি আমার বইতে এটির কথা উল্লেখ করেছি। আমার এক খালাতো বোন, পারভিনা, যার বিয়ের আয়োজন আমি এবং নিম্নি কর্নেল অলিউল্লা করেছিলেন, যিনি আমাদের চেয়ে জুনিয়র ছিলেন। বিয়ে ও অনুষ্ঠান লেডিস ক্লাবে হবে। দুপক্ষই আমাদের পরিচিত ছিলো। সব আয়োজন আমাদের ওপর ছিল। এই আয়োজনের মধ্যে ২-৩ হাজার লোককে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিলো। বিয়ের আসর চলছিল, তখন আমার একমাত্র শালা বাপ্পি, যিনি ম্যাগগিল ইউনিভার্সিটিতে পড়তেন, ছুটিতে দেশে এসেছিলেন। সে অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিল। আমি ও নিম্নি দুই পক্ষের হোস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম।

তিনি আরও বলেন, বাপ্পি ছেলেদের বসার জায়গায় বসেছিল, তখন কিছু ছেলে তার চুল টানতে থাকে। প্রথমবারে বাপ্পি কিছু বলেনি, কিন্তু পরেরবার টানার পর সে পেছনে তাকিয়ে দেখে একজন ছেলে। তারপর সে বলেছিল, তুমি চুল টানছো? তখন ওই ছেলে বলেছিল, হ্যাঁ, আমরা দেখছিলাম, তোমার চুল এত সুন্দর, এটি কি পরচুলা না আসল? বাপ্পি বলেছিল, বেয়াদব ছেলে, তুমি আর এখানে বসবে না। এরপর ছেলেগুলো চলে যায়। তারপর মেজর ডালিমের বিয়ের অনুষ্ঠানে ঘটনার চরম উত্তেজনা দেখা দেয়। কিছুক্ষণ পর রেডক্রসের দুটি মাইক্রোবাস ও একটি গাড়ি এসে থামে এবং সাদা পোশাকধারী লোকেরা নামতে থাকে। গাজী গোলাম মোস্তফা, যিনি তখন আওয়ামী লীগ নেতা এবং রেডক্রসের চেয়ারম্যান ছিলেন, গাড়ি থেকে বেরিয়ে চিৎকার করতে শুরু করেন, মেজর ডালিম কোথায়? কোথায় মেজর ডালিম? এরপর তার সাথে ৮-১০ জন সশস্ত্র ব্যক্তি উপস্থিত ছিলো।

গাজী গোলাম মোস্তফা মেজর ডালিমকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যান, তবে এর মধ্যে মেজর ডালিম তাকে বাধা দেন এবং বলেন, আপনি আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন জানি না, কিন্তু হাজার হাজার মানুষ আমাদেরকে দেখছে, আপনি যা করছেন তা আপনার জন্য ভালো হবে না। এর পর গাজী গোলাম মোস্তফা কিছুটা ভয় পেয়ে যান ।

এই ঘটনার পর মেজর ডালিমের ছোট ভাই স্বপন (বীর বিক্রম) ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে চলে যান এবং তিনি জানান যে বিয়ের অনুষ্ঠানে তাকে অপহরণ করা হয়েছে। এই কথোপকথনের পরই মাহবুব লিটুকে সঙ্গে করে চলে আসে ৩২নং ধানমন্ডিতে। মাহ্‌বুবের ভিতরে যাওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই রেহানা, কামাল ছুটে বাইরে এসে আমাদের ভিতরে নিয়ে যায়। আলম ও চুল্লুর রক্তক্ষরণ দেখে শেখ সাহেব ও অন্যান্য সবাই শংকিত হয়ে উঠেন। হারামজাদা, এইডা কি করছস তুই? গাজীকে উদ্দেশ্য করে গর্জে উঠলেন শেখ মুজিব- ডালিম আর নিম্মীর কাছে মাফ চা । আর আমারে উদ্দেশ্য কইরা শেখ মুজিব বললেন- তুই গাজীরে মাফ কইরা দে। আর গাজী তুই নিজে খোদ উপস্থিত থাকবি কন্যা সম্প্রদানের অনুষ্ঠান শেষ না হওয়া পর্যন্ত।

২৪ এর বিপ্লবীদের উদ্দেশ্যে মেজর ডালিম বলেন, বর্তমান প্রজন্মের বিল্পবীদের, ছাত্র-জনতার বিপ্লবী কর্মকান্ড যদি কোনো রকম অবদান রাখতে পারি, আমাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা, যোগাযোগ থেকে, তাহলে আমরা সেটা করতে প্রস্তুত। পিছপা হবো না, ইনশাআল্লাহ। আমরা তাদেরকে শ্রদ্ধা, সালাম এবং বিপ্লবী সালাম, সাথে মন থেকে দোয়া করছি তাদের বিপ্লব যাতে ব্যর্থ না হয়। তারা যাতে বিজয় অর্জন করে সুখী সমৃদ্ধ শক্তিশালী দুর্জয়ের ঘাঁটি হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে পারে।

জাতীয়-এর আরও খবর