কোটা আন্দোলন থেকে সরকার পতন, ইতিহাস পাল্টানো বিপ্লবের সূচনার দিন আজ

  বিশেষ প্রতিনিধি    01-07-2026    25
কোটা আন্দোলন থেকে সরকার পতন, ইতিহাস পাল্টানো বিপ্লবের সূচনার দিন আজ

আজ ১ জুলাই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনার দিন। ঠিক দুই বছর আগে (২০২৪ সালে) সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হয়েছিল শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলন, যা পরবর্তী সময়ে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিয়ে ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। জগদ্দল পাথরের মতে চেপে বসা স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পলায়নের মধ্য দিয়ে ইতিহাসে এই আন্দোলন পরিচিতি পেয়েছে ‘জুলাই বিপ্লব’ নামেই।

২০২৪ সালের ১ জুলাই ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ নাম নতুন প্লাটফর্মের আত্মপ্রকাশ ঘটে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন-এর ব্যানারেই গণপদযাত্রা, সড়ক অবরোধ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা সমাবেশ, বিক্ষোভ ও ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের কর্মসূচি পালন করেন।

যেভাবে শুরু জুলাই আন্দোলনের জুলাই আন্দোলনের সূচনা সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালের বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট ২০১৮ সালে জারি করা কোটা বাতিলের সরকারি পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করলে মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ মোট ৫৬ শতাংশ কোটা পুনর্বহাল হয়। এর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা নতুন করে আন্দোলনে নামেন এবং কোটা বাতিলের নির্বাহী আদেশ জারির দাবি জানান। আন্দোলনের শুরুটা ছিল শান্তিপূর্ণ। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কর্মসূচি বিস্তৃত হতে থাকে। ১ জুলাই থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে অবস্থান, মিছিল ও রাজু ভাস্কর্যে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ২ থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত ধারাবাহিক কর্মসূচিও ঘোষণা করেন আন্দোলনের সমন্বয়করা।

শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, একই দিন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতীকীভাবে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে কোটা ব্যবস্থা বাতিলের দাবি জানান।

আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল আরও আগে। ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা বাতিলের ঘোষণা দেয়। কিন্তু ২০২৪ সালের হাইকোর্টের রায়ের পর সেই কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহাল হলে আবারও ক্ষোভে ফেটে পড়েন শিক্ষার্থীরা।

৯ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সরকারকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন। দাবি বাস্তবায়ন না হলে সর্বাত্মক আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হয়। পরে ১ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে দেশব্যাপী কর্মসূচি শুরু হয়।

আন্দোলনের সমাবেশে সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ঘোষণা দেন, ৪ জুলাইয়ের মধ্যে দাবি আদায়ে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার্থীদের আবাসন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবিও জানান তিনি।

এরপর আন্দোলন ক্রমেই তীব্র হতে থাকে। কিন্তু আপিল বিভাগের শুনানি হাইকোর্টের রায় বহাল রাখা হয়। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর নিয়মিত আপিল করার পরামর্শ দেয় আপিল বিভাগ।

৬ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি ঘোষণা করে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে আনুষ্ঠানিক নৈতিক সমর্থন জানায় জামায়াত ও বিএনপি। ৭ জুলাই ঘোষিত কর্মসূচি বাংলা ব্লকেডে সাড়া দিয়ে শিক্ষার্থীরা মোড়ে মোড়ে অবস্থান নিয়ে অবরোধ করেন। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ওই দিনই অনির্দিষ্টকালের জন্য কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা।

৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৬৫ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়। ন্যূনতম কোটা রেখে সরকারি চাকরির সব গ্রেডে -অযৌক্তিক- কোটা বাতিলের দাবি শিক্ষার্থীদের।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের। সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, বল এখন সরকারের কোর্টে। এখন আর আদালত দেখিয়ে কোনো লাভ নেই। সরকারই ঠিক করতে পারে, এই আন্দোলনের গতিপথ কী হবে। ৯ জুলাই সারা দেশে আবারও সকাল-সন্ধ্যা ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা আন্দোলনকারীদের। হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিলে পক্ষভুক্ত হতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীর আবেদন করেন।

১০ জুলাই হাইকোর্টের রায়ের ওপর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চার সপ্তাহের স্থিতাবস্থা ঘোষণা। ৭ আগস্ট পরবর্তী শুনানির তারিখ ধার্য করে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরে যাওয়ার আহ্বান তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের। এরপর ওই দিনই সড়ক-মহাসড়কের সঙ্গে রেলপথও শিক্ষার্থীরা অবরোধ করেন। ঢাকার সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

১১ জুলাই শাহবাগে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের হাতাহাতি, ব্যারিকেড ভেঙে সড়ক অবরোধ। কুমিল্লা, চট্টগ্রামসহ কয়েকটি স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে শিক্ষার্থীদের অনেকে আহত হয়। সেদিন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান শিক্ষার্থীরা ‘লিমিট ক্রস করে যাচ্ছে’, বলে মন্তব্য করেন।

অন্যদিকে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, রাস্তায় চেঁচিয়ে আদালতের রায় পাল্টানো যায় না... জনগণের চলাফেরার নিরাপত্তা এবং কাজ করার পরিবেশ রক্ষা করার দায়িত্ব সরকারে। এগুলো যদি হুমকির মুখে পড়ে, তাহলে সরকারকে নিশ্চয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

১২ জুলাই পুলিশি হামলার প্রতিবাদে ঢাকার শাহবাগসহ বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ। ১১ জুলাই শাহবাগে হাতাহাতির ঘটনায় অজ্ঞাতনামা আসামি করে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করে।

১৩ জুলাই মিথ্যা মামলা দিয়ে আন্দোলনে বাধা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে, সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ তোলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। একই দিন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ মন্তব্য করেন- কোটার সমাধান আদালতের মাধ্যমেই হতে হবে।

১৪ জুলাই কোটা বহালের পক্ষে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ পায়। সেদিনই গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে তৎকালীন স্বৈরাচার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান-নাতি-পুতিরা কেউ মেধাবী না, যত রাজাকারের বাচ্চারা-নাতি-পুতি হলো মেধাবী, তাই না?... মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতিরাও (সরকারি চাকরি) পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতি-পুতিরা পাবে? তার ওই মন্তব্যের পরই মূলত কোটা সংস্কার আন্দোলন ভিন্নমাত্রা পায়। প্রতিবাদে ‘তুমি কে, আমি কে?- রাজাকার-রাজাকার; কে বলেছে, কে বলেছে?- স্বৈরাচার স্বৈরাচার, ‘চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’ স্লোগানে মধ্যরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা। একই দিন কোটা আন্দোলনকে সরকারবিরোধী রূপ দেওয়ার পাঁয়তারা চালাচ্ছে বিএনপি, এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেন তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

পরের দিন ১৫ জুলাই ‘রাজাকার স্লোগানের জবাব দেওয়ার জন্য ছাত্রলীগই যথেষ্ট’ বলে মন্তব্য করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এরপর হুমকি দিয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনে যারা রাজাকার স্লোগান দিচ্ছেন, তাদের শেষ দেখিয়ে ছাড়বো। ওইদিন দুপুরে বহিরাগতদের নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ হামলা চালায়। পুলিশের সহযোগিতায় সেদিন ছাত্রলীগের নির্বিচারে মারধরে ছাত্রীসহ শতাধিক শিক্ষার্থী আহত, রক্তাক্ত হয়। ওই দিন বিকেলে কার্জন হল এলাকায় বেশ কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে, ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্রও দেখা যায়।

জাতীয়-এর আরও খবর

আরও পড়ুন