ঢাকার অলিগলিতে নামে-বেনামে স্কুল, দেখেও না দেখার ভান সরকারের!

  বিশেষ প্রতিনিধি    26-01-2026    69
ঢাকার অলিগলিতে নামে-বেনামে স্কুল, দেখেও না দেখার ভান সরকারের!

ঢাকার অলিগলিতে নামে-বেনামে কার্যক্রম চালাচ্ছে প্রাথমিক পর্যায়ের শত-শত স্কুল। সরু গলির ভেতরে, আবাসিক ভবনের নিচতলায়, ভাড়া করা ফ্ল্যাটে কিংবা অস্থায়ী কিছু কক্ষে চলছে এসব প্রতিষ্ঠান। প্রি-প্রাইমারি, কেজি, স্কুল-মাদ্রাসা, ইংলিশ মিডিয়ামসহ নানা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করা হচ্ছে শিশু শিক্ষার্থীদের। প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশিরভাগেরই নেই খোলা ক্লাসরুম, খেলার জায়গা কিংবা অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা।

এ ধরনের স্কুলগুলোর শিক্ষার মান, শিশুদের মানসিক ও শারীরিক সুরক্ষার নিশ্চয়তা বিধানে সরকারের কোনো তদারকি নেই, নেই সুস্পষ্ট কোনো নীতিমালাও। স্কুলগুলো কে খুলছে, কারা চালাচ্ছে, কার অনুমতিতে চলছে, সরকার আদৌ জানে কি না সেখানে কী হচ্ছে– এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই।

সম্প্রতি রাজধানীর নয়াপল্টন এলাকায় শারমিন একাডেমি নামে একটি স্কুলের ভেতরে এক শিশু শিক্ষার্থীকে নির্মমভাবে মারধরের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। এতে দেখা যায়, স্কুলের অফিস কক্ষের ভেতরে এক ব্যক্তি ৪ বছর বয়সি শিশুটিকে বেধড়ক মারধর করছেন। পাশে গোলাপি শাড়ি পরা এক নারী শিশুটির হাত ধরে রেখেছেন। কিছুক্ষণ পরপর ওই ব্যক্তি শিশুটিকে আঘাত করছেন। পরে জানা যায়, মারধরকারী ব্যক্তি ওই স্কুলের ব্যবস্থাপক পবিত্র কুমার, আর পাশে বসে থাকা নারী সেখানকার প্রধান শিক্ষক শারমিন আক্তার। মূলত এ দুজনই একাডেমিটির মালিক। ঘটনার তিনদিন পর পুলিশ পবিত্র কুমারকে গ্রেপ্তার করে। গত ২২ জানুয়ারি সকাল থেকে নয়াপল্টনের ওই এলাকা ও স্কুল প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা গেছে, স্কুলের ভেতরে কোনো ধরনের কার্যক্রম নেই। মাঝে মধ্যে দুই–একজন অভিভাবক ও কৌতূহলী পথচারী সেখানে এসে স্কুলের ভেতরের দিকে তাকাচ্ছেন, কেউ কেউ খোঁজখবর নিচ্ছেন। তবে ভেতর থেকে প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ তালাবদ্ধ থাকায় কারও প্রবেশের সুযোগ ছিল না। স্কুল ভবনের কেয়ারটেকার কামরুল হক ঢাকা পোস্টকে জানান, গতকাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি খোলা ছিল। আজ (বৃহস্পতিবার) সকাল থেকে কাউকে আসতে দেখেননি তিনি। কেন স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে– এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো কারণও জানাতে পারেননি তিনি। এ বিষয়ে জানতে স্কুলটির দেয়ালে ও ব্যানারে থাকা কয়েকটি নম্বরে যোগাযোগ করা হলে সবগুলো বন্ধ পাওয়া যায়। স্থানীয় ও আশপাশের বাসিন্দারা জানান, ঢাকার বহু অলিগলির স্কুলের মতো শারমিন একাডেমিও পরিচালিত হচ্ছে সীমিত পরিসরে একটি ভবনের মধ্যে। ওই ভবনের ভেতরে রয়েছে একটি বিউটি পার্লারও। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে জানতেন সেখানে একটি স্কুল আছে কিন্তু সেটির অনুমোদন আছে কি না, শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার কোনো নীতিমালা আছে কি না বা শিশুরা সেখানে নিরাপদ কি না– এসব বিষয়ে কারও কোনো ধারণা নেই।

অবশ্য গোটা রাজধানীজুড়েই এমন অসংখ্য স্কুল-মাদ্রাসা রয়েছে। যেগুলোর শুধু সাইনবোর্ড দেখে মানুষ, আর বাচ্চাদের ভর্তি করে দেয়। অনুমোদিত নাকি অননুমোদিত প্রতিষ্ঠান তা আর যাচাই করে না কেউ। রাজধানীর আজিমপুর, পুরান ঢাকা, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, বাড্ডা, খিলগাঁও, যাত্রাবাড়ী, পল্টনসহ বিভিন্ন এলাকায় অলিগলির ভেতরে গড়ে ওঠা এমন স্কুলের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে একটি ফ্ল্যাটে ৩০-৪০ জন শিশুকে গাদাগাদি করে বসানো হচ্ছে। নেই খোলা জায়গা, নেই জরুরি নির্গমন ব্যবস্থা। তবুও এসব প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর ধরে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

২০২৫ সালে বেড়েছে শিশু শিক্ষার্থী নির্যাতন আইন অনুযায়ী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ২০১১ সালে হাইকোর্ট স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন, শিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক শাস্তি মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং অসাংবিধানিক। শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী, শিশুকে নির্যাতন করা একটি ফৌজদারি অপরাধ।

প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী নির্যাতনের আলাদা তথ্য না থাকলেও আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সামগ্রিক তথ্য বলছে, ২০২১ সালে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে শিক্ষকদের নির্যাতনের ২১টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছিল, যেখানে শিক্ষার্থীদের বয়স ছিল শূন্য থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। এই সংখ্যা ২০২২ সালে বেড়ে ৪৯-এ দাঁড়ায়। তারপর ২০২৩ সালে সামান্য কমে ৪৭ এবং ২০২৪ সালে আরও কমে ৩০-এ নেমে আসে। তবে নির্যাতনের ঘটনা বন্ধ হয় না।

২০২৫ সালে শিশু নির্যাতনের ঘটনার সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫৯টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা

এমন অবস্থায় রাজধানীসহ সারা দেশের অভিভাবকরা বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। সামাকি মাধ্যমে অনেকে এসব নির্যাতনের ঘটনা দেখে আঁতকে উঠছেন এবং স্কুলগুলোর তদারকির ব্যবস্থা কী- সেই প্রশ্ন রাখছেন। তারা বলছেন, এখনই কঠোর নজরদারি ও বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের মাধ্যমে এসব স্কুলকে তদারকির আওতায় আনা দরকার।

রাজধানীর মিরপুর এলকার নাঈমা মিতু নামে এক অভিভাবক বলেন, আমরা বাবা-মায়েরা চাকরি বা কাজের কারণে বাধ্য হয়ে কাছাকাছি স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করাই। কিন্তু এসব স্কুলের ভেতরে কী হচ্ছে, শিক্ষকরা কেমন আচরণ করেন– তা জানার কোনো উপায় নেই। শারমিন একাডেমির ঘটনার ভিডিও দেখে আমি ভীষণ আতঙ্কিত। যদি আমার সন্তানের সঙ্গে এমন কিছু ঘটে? সরকারের উচিত এসব স্কুলের নিয়মিত তদারকি করা বা শিক্ষাদান ও শিক্ষকদের গুণগত মানের বিষয়ে খোঁজখবর রাখা।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য-এর আরও খবর