হাদিকে গুলি করা হয় হোন্ডা হর্নেট থেকে, রিমান্ডে সুজুকি জিক্সার মালিক

  বিশেষ প্রতিনিধি    18-12-2025    56
হাদিকে গুলি করা হয় হোন্ডা হর্নেট থেকে, রিমান্ডে সুজুকি জিক্সার মালিক

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী শরীফ ওসমান হাদিকে গুলি করার ঘটনায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের মালিকানা ও নম্বর প্লেট ঘিরে তৈরি হয়েছে রহস্য। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে মোটরসাইকেলের নম্বর শনাক্তের ভিত্তিতে আব্দুল হান্নান নামে একজনকে ওই গাড়ির মালিক দাবি করে তাকে আটক করে র‍্যাব-২ । তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই মোটরসাইকেলের প্রকৃত মালিক নন আব্দুল হান্নান।

তবে কেন তাকে আটক করা হলো, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অনুসন্ধানে নামে ঢাকা পোস্ট। অনুসন্ধানে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। গত শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর) দুপুর আনুমানিক আড়াইটার দিকে পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে রিকশাযোগে যাওয়ার সময় শরীফ ওসমান হাদির ওপর মোটরসাইকেলে করে আসা দুই ব্যক্তি হামলা চালায়। তাদের একজন খুব কাছ থেকে হাদির মাথায় গুলি করে। ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে র‍্যাব-২ হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের নম্বর শনাক্ত করে। নম্বরটি ছিল- ঢাকা মেট্রো-ল ৫৪-৬৩৭৬, যা ইংরেজি অক্ষরে লেখা ছিল। ওই নম্বর প্লেটের সূত্র ধরে র‍্যাব মোটরসাইকেলের মালিক হিসেবে আব্দুল হান্নানকে শনাক্ত করে। এরপর শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) ভোরে মোহাম্মদপুরের চন্দ্রিমা হাউজিংয়ের এভিনিউ-২, সি-ব্লকের ২ নম্বর বাসা থেকে মোটরসাইকেলের মালিক সন্দেহে তাকে আটক করা হয়। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ শেষে র‍্যাব-২-এর উপ-পরিদর্শক (এসআই) বিপ্লব বাড়ৈ তাকে পল্টন থানায় হস্তান্তর করেন। পরে পল্টন থানা পুলিশ আদালতে ৫৪ ধারায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে তিন দিনের রিমান্ড আবেদন করে, যা মঞ্জুর করেন আদালত।

সিসিটিভি ও মোটরসাইকেলের নম্বর ঘিরে ভিন্ন চিত্র, প্রশ্নবিদ্ধ র‍্যাবের গ্রেপ্তার তবে ঢাকা পোস্টের অনুসন্ধান বলছে ভিন্ন কথা। র‍্যাব-২ যে মোটরসাইকেলের মালিককে আটক করেছিল, সেটি ছিল ঢাকা মেট্রো-ল ৫৪-৬৩৭৫ সিরিয়ালের সুজুকি জিক্সার এসএফ মডেলের একটি মোটরসাইকেল। অথচ সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, শরীফ ওসমান হাদিকে গুলি করার ঘটনায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি ছিল হোন্ডা হর্নেট, যার নম্বর ঢাকা মেট্রো-ল ৫৪-৬৩৭৬। অর্থাৎ হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের নম্বরের শেষ ডিজিট ছিল ‘৬’, কিন্তু আটক করা হয় শেষ ডিজিট ‘৫’ থাকা মোটরসাইকেলের মালিককে।

অনুসন্ধানে গিয়ে ঢাকা পোস্ট ঢাকা মেট্রো-ল ৫৪-৬৩৭৬ সিরিয়ালের মোটরসাইকেলের মালিকানার কাগজপত্র সংগ্রহ করে। এতে দেখা যায়, মোটরসাইকেলটির রং ব্লু/সিলভার এবং এটি ২৬ মে ২০২৪ সালে রেজিস্ট্রেশন করা। অন্যদিকে, যে মোটরসাইকেলের নম্বর প্লেটের সূত্র ধরে আব্দুল হান্নানকে গ্রেপ্তার করা হয়- সেটি সুজুকি জিক্সার এসএফ মডেলের ঢাকা মেট্রো-ল ৫৪-৬৩৭৫ নম্বরের গাড়ি, যার রং অরেঞ্জ-সিলভার। ওই মোটরসাইকেলটির ছবি ও ভিডিও ঢাকা পোস্টের হাতে রয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজে যেখানে স্পষ্টভাবে ঢাকা মেট্রো-ল ৫৪-৬৩৭৬ নম্বরের মোটরসাইকেল দেখা যায়, সেখানে ওই মোটরসাইকেলের মালিককে আটক করা হয়নি। বরং নম্বরের শেষ ডিজিটে পার্থক্য থাকার পরও ৫৪-৬৩৭৫ নম্বরের মোটরসাইকেলের মালিক আব্দুল হান্নানকে আটক করা হয়। অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। আব্দুল হান্নানকে যেই মোটরসাইকেলের মালিক হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেই মোটরসাইকেলের ডিজিটাল নম্বর প্লেটটি ছিল ইংরেজিতে লেখা। অথচ বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) থেকে ইস্যু করা সব ডিজিটাল নম্বর প্লেটই বাংলায় লেখা হয়।

এই তথ্যের ভিত্তিতে প্রশ্ন উঠছে- যারা শরীফ ওসমান হাদিকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি চালিয়েছিল, তারা কি ইচ্ছাকৃতভাবে নম্বর প্লেট পরিবর্তন করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে? ডিজিটাল নম্বর প্লেট বিষয়ে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) উপ-পরিচালক এস এম কামরুল হাসানের সঙ্গে কথা বলে ঢাকা পোস্ট। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশে বিআরটিএ থেকে যে ডিজিটাল নম্বর প্লেট ইস্যু করা হয়, তা কখনোই ইংরেজিতে লেখা থাকে না। ডিজিটাল নম্বর প্লেট সবসময় বাংলা ভাষাতেই দেওয়া হয়। শুধু কাগজপত্র ইংরেজিতে দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, কোনো অপরাধী বা প্রতারক অপরাধ করার জন্য নম্বর প্লেট ইংরেজিতে করে থাকতে পারে। র‍্যাবের একটি সূত্র জানায়, ঢাকা মেট্রো-ল ৫৪-৬৩৭৫ ও ঢাকা মেট্রো-ল ৫৪-৬৩৭৬- এই দুই মোটরসাইকেলের মালিকানাই যাচাই করা হয়। সূত্রের দাবি, যে মোটরসাইকেল থেকে গুলি চালানো হয়, সেটির রং ছিল অরেঞ্জ/সিলভার এবং নম্বর ঢাকা মেট্রো-ল ৫৪-৬৩৭৫। অন্যদিকে ঢাকা মেট্রো-ল ৫৪-৬৩৭৬ নম্বরের মোটরসাইকেলটির রং ছিল ব্লু/সিলভার এবং গঠনের দিক থেকেও সেটি সিসিটিভি ফুটেজের সঙ্গে মেলেনি। সে কারণে ওই মোটরসাইকেলের মালিককে আর আটক করা হয়নি। এসব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের পর ঢাকা মেট্রো-ল ৫৪-৬৩৭৫ নম্বরের মোটরসাইকেলের মালিক আব্দুল হান্নানকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করে পল্টন থানায় হস্তান্তর করা হয়। গ্রেপ্তার আব্দুল হান্নানের স্ত্রী পারভিন বলেন, শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) ভোররাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকজন সদস্য আমাদের বাসায় ঢুকে পড়েন। পরে সকাল ৬টার দিকে আমার স্বামীকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যান।

তিনি বলেন, যে গুলির ঘটনায় মোটরসাইকেলের মালিক হিসেবে আমার স্বামীকে আটক করা হয়েছে, ওই মডেলের হোন্ডা হর্নেট মোটরসাইকেল তার কখনোই ছিল না। তিনি কখনো ওই কোম্পানির মোটরসাইকেল চালাননি। আমার স্বামী সর্বশেষ যে মোটরসাইকেলটি চালাতেন, সেটি ছিল সুজুকি জিক্সার এসএফ। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, যে মোটরসাইকেলের মালিক হিসেবে তাকে আটক করা হয়েছে, সেটিও হোন্ডা হর্নেট নয়। ওই সুজুকি জিক্সার এসএফ মোটরসাইকেলটি তিনি কয়েক মাস আগেই অন্য একজনের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। তাহলে এত বড় একটি ঘটনায় কেন আমার স্বামীকে আটক করা হলো, এখন তার ভবিষ্যৎ কী হবে?

জাতীয়-এর আরও খবর