কক্সবাজারের ৩৪ রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প এখন অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, মাদক কিংবা মানব পাচার শরণার্থী ক্যাম্পের নিত্য ঘটনা। ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তার এবং নিজেদের অবস্থান সংহত করতে প্রায়ই অস্ত্রের মহড়া কিংবা রক্তের হোলি খেলায় মেতে ওঠে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা। মাঝেমধ্যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযানের মুখে কেউ কেউ গ্রেফতার হলেও থামানো যাচ্ছে না শরণার্থী ক্যাম্পের সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর অপরাধ তৎপরতা।

চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সব সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে পুলিশ। কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এরই মধ্যে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে অনেক রোহিঙ্গাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন-১৪-এর পুলিশ সুপার নাঈমুল হক বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত টহল দেয় আইনশৃঙ্খলা প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা। এ ছাড়া চেকপোস্টে তল্লাশি হয় নিয়মিত।

তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনতে ক্যাম্পগুলোতে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হচ্ছে এবং তৈরি হচ্ছে ওয়াচ টাওয়ার। এ কাজগুলো শেষ হলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ আরও সহজ হবে।

জানা যায়, বাংলাদেশে আশ্রয় পাওয়া রোহিঙ্গারা শরণার্থী ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তার এবং দ্রুত ধনী হতে জড়িয়ে পড়েছে নানা অপরাধ কর্মকান্ডে। ক্যাম্পের বিভিন্ন ব্লকে নিজের অবস্থান সুসংহত করতে তৈরি করেছে অপরাধী গ্রুপ। তারা ক্যাম্পের বিভিন্ন ব্লকে আধিপত্য বিস্তার, মাদক ও মানব পাচার, অস্ত্র ব্যবসা, চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে প্রায় সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। এতে প্রায়ই খুন, সংঘাতের ঘটনা ঘটছে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ঘটছে অপহরণের মতো ঘটনাও। এ ছাড়া ধর্ষণ, ডাকাতির ‘সাধারণ’ ঘটনায় পরিণত হয়েছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। সন্ত্রাসীরা রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে ইয়াবার আখড়ায় পরিণত করেছে। মিয়ানমার থেকে ইয়াবার চালান সরাসরি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আসার কারণে দেশের মাদকের অন্যতম ট্রানজিট পয়েন্টেও পরিণত হয়েছে ক্যাম্পগুলো। শরণার্থী ক্যাম্প হয়েই প্রতিদিন শত কোটি টাকার ইয়াবা ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। ক্যাম্পের মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করে কমপক্ষে অর্ধশত ইয়াবা মাফিয়া। রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ইয়াবা ক্যারিয়ার হিসেবে কাজ করছে কয়েকশ রোহিঙ্গা।

অপরাধী চক্রগুলোর পাশাপাশি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সক্রিয় রয়েছে চার জঙ্গি সংগঠন। এ সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা), রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও), ইসলামী মাহাজ এবং জমিয়তুল মুজাহিদীন। ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মধ্যে ২৭টিতে রয়েছে আরসার আধিপত্য। সাতটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিচরণ রয়েছে আরএসও, ইসলামী মাহাজ ও জমিয়তুল মুজাহিদীনের। জঙ্গি সংগঠনগুলো নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার ও কোন্দলের জের ধরে প্রায়ই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। এরই মধ্যে নিজেদের কয়েকজন নেতা অপহরণের অভিযোগ তুলেছে একে অপরের বিরুদ্ধে।

কক্সবাজারের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অপরাধ পরিসংখ্যানেও উঠে এসেছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অপরাধের ঊর্ধ্বগতির চিত্র। গত চার বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্প সংশ্লিষ্ট দায়ের হওয়া মামলাগুলোর সিংহভাগ হচ্ছে খুন, ডাকাতি, ধর্ষণ, অপহরণ, অস্ত্র, মাদক এবং মানব পাচার মামলা।

প্রশাসনের দেওয়া তথ্য মতে- ২০১৭ সালে নানান অপরাধে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মামলা হয় ৭৬টি। যাতে আসামি ছিলেন ১৫৯ জন। পরের বছর ২০১৮ সালে মামলা ও আসামি সংখ্যা বেড়ে হয় দ্বিগুণ। ওই বছর ২০৮ মামলায় আসামি হন ৪১৪ জন। ২০১৯ সালে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মোট মামলা হয় ২৬৩টি এবং আসামি হন ৬৪৯ জন। ২০২০ সালে করোনা প্রাদুর্ভাবের মধ্যে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সার্বিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ব্যতিক্রম ছিল রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো। করোনার বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নানান অপরাধে ১৮৪ মামলা দায়ের হয়। যাতে আসামি করা হয় ৪৪৯ জনকে। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে মামলা দায়ের হয় ৬ শতাধিক। যাতে আসামি করা হয় হাজারের ওপরে।

উখিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে ছয় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী আটক: কক্সবাজারের উখিয়ার টেকনাফে অবস্থিত ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের গ্রেফতারে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে উখিয়ার কয়েকটি ক্যাম্প থেকে এপিবিএন সদস্যরা ছয় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীকে আটক করেছে। গতকাল ভোররাতে অভিযান চালিয়ে এসব সন্ত্রাসীকে আটক করা হয়।

উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দায়িত্ব পালনকারী ১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক পুলিশ সুপার নাঈমুল হক জানান, ক্যাম্প এলাকায় নানা অপরাধে জড়িত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করতে তাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অভিযানের অংশ হিসেবে গতকাল ভোররাতে মধুছড়া ক্যাম্প থেকে আবদুল মান্নান, এনায়েতুল্লাহ ইরানি পাহাড় ক্যাম্প থেকে তাহের, লম্বাশিয়া ক্যাম্প থেকে নাজিম উদ্দিন, নুর বাশার, কুতুপালং ক্যাম্প থেকে ডা. উসমানকে গ্রেফতার করা হয়।

১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক নাঈমুল হক জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় চাঁদাবাজি, অপহরণ, ডাকাতি, হত্যাসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল গ্রেফতারকৃতরা। আইনগত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য তাদের উখিয়া থানায় প্রেরণ করা হয়েছে। সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *