করোনা মহামারির কারণে ৫৪৩ দিন বন্ধ থাকার পর গতকাল ১২ সেপ্টেম্বর খুলেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। করোনা মহামারির এ সময় শ্রেণীকক্ষের বাইরে ছিল জেলার লক্ষাধিক শিক্ষার্থী। গতকাল স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করেই জেলার ১ হাজার ৩ শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান চালু করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধানগণ। এর মধ্যে ৬৬৭ টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৫৩৮ টি মাধ্যমিক- নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়, দাখিল মাদ্রাসা, ২৩টি কলেজ এবং ১ টি বিশ্ববিদ্যালয়। সরকারি নির্দেশনা মানা হয়েছে কিনা এবং স্বাস্থ্যবিধি কতটা নিশ্চিত করা হয়েছে তা পরিদর্শন করেছেন জেলা শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ সালেহ উদ্দিন চৌধুরী।
গতকাল সকাল সাড়ে ১০ টায় কক্সবাজার মডেল হাইস্কুল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন- শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাণ হচ্ছে শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থীদের শতভাগ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবে পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শারীরিক-মানসিক উৎকর্ষ সাধনে শিক্ষকদের সচেষ্ট হতে হবে। কোন শিক্ষার্থী যাতে মাক্স ছাড়া শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করতে না পারে সেই দিকে শিক্ষকগণকে সচেতন থাকতে হবে। পাশাপাশি সকল বিদ্যালয় আইসোলেশন সেন্টার খোলা হয়েছে কিনা তাও আজকের পরিদর্শনের মূল কারণ।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে তা মেনে চলার জন্য প্রতিষ্ঠান প্রধানগণ উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। তিনি কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চিতের বিষয়টি নিশ্চিত হন। নিয়ম মেনে বিদ্যালয় প্রবেশপথে হ্যান্ড স্যানিটাইজার, তাপ পরিমাপের যন্ত্র, হাত ধোয়ার বেসিন স্থাপনের উপর গুরুত্বারোপ করেন। তাছাড়া শ্রেণীকক্ষে গাদাগাদি করে ক্লাস করায় শিশুরা করোনায় আক্রান্ত হতে পারে— এমন আশঙ্কার জায়গা থেকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার উপর গুরুত্বারোপ করেন। কক্সবাজার মডেল হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোঃ রমজান আলী বলেন- সরকারি নির্দেশনা মেনে আমরা সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে আমরা গত সপ্তাহ যাবৎ পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করেছি। বিদ্যালয়ের প্রাণ তো শিক্ষার্থী।
আজ আবার তাদের আগমনে মুখরিত হয়েছে স্কুল। রামু কলেজের একাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী তাসমিন আক্তার বলেন , আমি খুব খুশি, এখন ক্লাসটা অন্তত করতে পারছি। অনেকজনকে দীর্ঘদিন পর দেখেছি। খুবই ভালো লাগছে। বাসায় থাকতে আর ভালো লাগে না।’  প্রথম থেকে চতুর্থ ও ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের সপ্তাহে এক দিন সশরীরে ক্লাস হচ্ছে। এ কারনে অনেকে আবার সিলেবাস শেষ করা নিয়ে উদ্বিগ্ন। কক্সবাজার কেজি স্কুলের ৪র্থ শ্রেণির ছাত্র আনিসুর রহমান বলেন- সপ্তাহে এক দিন ক্লাস খুবই কম সময়। স্কুল আমাদের আনন্দের জায়গা ও পড়ালেখার জায়গা।
আরো ক্লাস করতে পারলে ভালো হত। স্কুলে আমরা বেশি ভালো শিখতে পারতাম। কক্সবাজার মডেল হাইস্কুলের ছাত্র  কুদ্দুস আফ্রাদ বলেন-এতদিন আমরা অনলাইন ক্লাস করেছি। এখন সরাসরি ক্লাস করতে পেরে আমরা খুবই আনন্দিত। অনলাইন ক্লাসে অনেক কিছু বুঝা যায় না।অনলাইনে নেটওয়ার্কের সমস্যা তো ছিলই। আমি চাই শিগগির সশরীরে পূর্ণ ক্লাস চালু করা হোক।’
এদিকে স্কুল-কলেজগুলো শিক্ষার্থীদের করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষিত রাখতে পারবে কি না অভিভাবকদের ভেতরে সেই উদ্বেগ থেকেই গেছে।ফলে অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে পাচ্ছেন। তেমনই একজন সাইফুল ইসলাম। তিনি আরও এক-দুই সপ্তাহ পর্যবেক্ষণ করার পরে সন্তানকে স্কুলে পাঠাবেন বলে জানান।  সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, স্কুল ও কলেজ খোলার পর উচ্চ মাধ্যমিক ২০২১ ও ২০২২ সালের মাধ্যমিক এবং এ বছরের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার (পিইসিই) শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন ক্লাস করবে।
প্রথম থেকে চতুর্থ ও ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা সপ্তাহে এক দিন করে সশরীরে ক্লাস করবে যা গতকাল ১২ সেপ্টেম্বর থেকে দেশব্যাপি শুরু হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের কাছে স্বাস্থ্য নির্দেশনার সাধারণ পরিচালন পদ্ধতি (এসওপি) পাঠিয়েছে। স্কুলে ক্লাস শুরু হওয়ার পর গতকাল থেকে নির্দেশনাগুলো মেনে চলতে বলা হয়েছে। এই নির্দেশনায় প্রধান শিক্ষকদের সব শিক্ষার্থী, শিক্ষক-শিক্ষিকা ও কর্মীদের সারাক্ষণ মাস্ক পরে থাকা এবং শ্রেণীকক্ষে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করা। এ ছাড়া, কোনো শিক্ষার্থী, শিক্ষক-শিক্ষিকা অথবা কর্মীর করোনাভাইরাসের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনে ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে বা আইসোলেশনে থাকতে পারবে এবং তাদেরকে অনুপস্থিত হিসেবে গণ্য করা হবে না। প্রতিটি ক্লাসের শুরুতে একটি অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য দেওয়ার জন্য। কোনো ছাত্র যেন ক্লাসের মাঝখানে বের হয়ে না যায়, সেটা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে নির্দেশনায়।
শিক্ষার্থীরা  যেন যে কোনো ধরনের অসুস্থতার কথা শিগগির অভিভাবক ও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জানায়। কোনো জরুরি কারণ ছাড়া শ্রেণীকক্ষের বাইরে না যাওয়ার কথাও বলা হয়েছ। পরিবারের কোনো সদস্য করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে যেন তারা শিগগির এই তথ্যটি প্রধান শিক্ষককে জানান। একইসঙ্গে, শিশুদের বাইরের খাবার খেতে নিরুৎসাহিত করার ওপরেও জোর দেওয়া হয়েছে নির্দেশনায়। উল্লেখ্য করোনাভাইরাসের সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য দেশব্যাপি গত বছরের ১৭ মার্চ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলশ্রুতিতে ক্লাস ও পরীক্ষা বাতিল হয়ে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *