হাফেজ মুহাম্মদ আবুল মঞ্জুর

শায়খুল হাদীস আল্লামা হাফেজ জুনাইদ বাবুনগরী ( হাফিজাহুল্লাহ) বহুল সমাদৃত ও জনপ্রিয় একটি নাম। কেবলমাত্র একজন ব্যক্তির নাম নয়; এটি এক সংগ্রামী চেতনা ও বিপ্লবের নাম। আল্লামা বাবুনগরী একাধারে বরেণ্য ইসলামী চিন্তাবিদ, বিদগ্ধ মুহাদ্দিস, প্রখ্যাত মুফাসসির, হাফেজে কুরআন, তাত্ত্বিক গবেষক ও বিশিষ্ট লেখক। মাতা-পিতার বংশধারার দিক থেকেও তিনি অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত ও বুযুর্গ পরিবারের সন্তান। উপমহাদেশের প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ আল্লামা আবুল হাসান রহ. তাঁর মুহতারাম পিতা। যিনি বিখ্যাত হাদীসের কিতাব “মিশকাত শরীফ” র ব্যাখ্যাগ্রন্থ “তানজীমুল আশতাত”র রচয়িতা। যেটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হাদীস শাস্ত্রে পাঠ্য। আর নানা আল্লামা হারুন বাবুনগরী রহ.ও একজন খ্যাতিমান বুযুর্গ। যিনি দেশের ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র জামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগরের প্রতিষ্ঠাতা। বর্তমান সময়ে এদেশের তৌহিদী জনতার অন্যতম আধ্যাত্মিক রাহবার, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নবনির্বাচিত প্রধান উপদেষ্টা আল্লামা মুহিববুল্লাহ বাবুনগরী ( দা. বা.) তাঁর মামা।

আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরীর পরনে সুন্নাতী লেবাস, চেহারায় ঈমানের আলোকপ্রভা, আচরণ -বিচরণে বিনয় ও ভদ্রতায় তাঁর বুযুর্গ ব্যক্তিত্ব প্রোজ্জ্বল হয়ে উঠে। পিতার মত তিনিও ইসলামী জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অধ্যাবসায়ের ফলশ্রুতিতে গভীর বুৎপত্তি অর্জনপূর্বক দরসে হাদীসের খেদমতে আত্মনিবেদন করেন। উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীনতম ইসলামী শিক্ষায়তন জামিয়া আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারীতে হাদীসের কিতাবসহ গুরুত্বপূর্ণ কিতাবাদীর দরসদানে জীবনের সিংহভাগ সময় কাটিয়েছেন। দীর্ঘ ৪০ বছরেরও অধিক সময় ধরে দরসে হাদীসের মসনদে আসীন তিনি। তাঁর রয়েছে হাজার হাজার ছাত্র -শিষ্য। নিরবচ্ছিন্নভাবে আঞ্জাম দিয়ে চলেছেন ইলমে নবভীর দরস- তাদরীসের খেদমত। রচনা করেছেন বহু প্রামাণ্য কিতাব ও মৌলিক গ্রন্থ। কখনো প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন না। ছিলেন না রাজপথের পরিচিতমুখ। কিন্তু যখন আল্লাহ ও মহানবী হযরত মুহাম্মদ স., ইসলামের বিধি-বিধান ও ঐতিহ্য -নিদর্শন সম্পর্কে নাস্তিক ব্লগারচক্র লাগামহীনভাবে জঘন্যতম কুৎসা রটনা শুরু করে তখন আল্লাহর এই মুখলিস বান্দাহ, একনিষ্ঠ নবীপ্রেমিক আর মাদ্রাসা ক্যাম্পাসে নিরব বসে থাকতে পারেননি। নাস্তিক ব্লগারচক্রের এহেন ইসলাম বিদ্বেষের প্রতিবাদে নেমে আসেন রাজপথে। শামিল হন ইসলাম বিদ্বেষী নাস্তিকদের সর্বোচ্চ শাস্তিসহ ১৩ দফা ঈমানী দাবীতে শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ. এর নেতৃত্বে গড়ে উঠা হেফাজতে ইসলামের শান্তিপূর্ণ ঈমানী আন্দোলনের অগ্রভাগে। একপর্যায়ে এ মর্দে মুজাহিদের ওপর অর্পিত হয় হেফাজতে ইসলামের মহাসচিবের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বভার। কোন ধরনের রাজনৈতিক অভিলাষ কিংবা পার্থিব মোহে নয়; বরং ঈমানী চেতনায় উজ্জীবিত হয়েই ষাটোর্ধ্ব বয়সে তিনি এই দায়িত্ব সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে পালন করে আসছেন। তাঁর সাহসী ও দূরদর্শী ভূমিকায় বেগবান হয় ঈমান-আক্বিদা রক্ষার সংগ্রাম। দেশব্যাপী সভা-সমাবেশ, সংবাদ সম্মেলনসহ শান্তিপূর্ণ কর্মসূচীতে তাঁর ঈমানী চেতনাসমৃদ্ধ জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতায় পুরো জাতি পান সময়োপযোগী দিক-নির্দেশনা এবং আদর্শিক অভিযাত্রায় এগিয়ে চলার প্রেরণা। ফলশ্রুতিতে অত্যন্ত সাদামাটা জীবন যাপনকারী মহৎপ্রাণ এই মানুষটি শুধু বাংলাদেশ নয়; মুসলিম বিশ্বে তৌহিদী জনতার অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে সমাদৃতি লাভ করেন। বাতিলের বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রাম ও সত্যের পথে নির্ভীকতার কারণে তিনি বিশ্বাসী মানুষের প্রিয়তম ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। ঈমানদার মানুষের হৃদয় গভীরে ঈমানী আন্দোলনের প্রাণপুরুষ হিসেবে তাঁর জন্য গড়ে উঠে অকৃত্রিম শ্রদ্ধার আসন। মু’মিন মুসলমানের যোগ্য পথপ্রদর্শকের ভূমিকাপালনকারী এই বুযুর্গ ও সংগ্রামী আলিম ২০১৩ সালের ৫ই মে দিনে ও গভীর রাতে ঢাকায় হেফাজতে ইসলামের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচীতে অংশগ্রহনকারীদের ওপর ঘটে যাওয়া ভয়াবহ নির্মমতার ধারাবাহিকতায় ৬ মে গ্রেফতার হন। ওই সময় প্রথমে ৯ দিন, পরে ২২ দিনসহ পরপর রিমান্ড ও কারাভোগে তাঁর অবস্থা সঙ্কটাপন্ন হওয়ায় ২৯ মে আদালত তাঁকে জামিনে মুক্তি দেন। তখন বেশ কিছুদিন হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে চিকিৎসাধীন থেকে তিনি মোটামুটি সুস্থ হয়ে উঠলেও মাঝে-সাঝে বিভিন্ন ইনফেকশনে পূনরায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর পাসপোর্টটি দীর্ঘ সময় সরকার কর্তৃক জব্দ করে রাখার কারণে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ সত্ত্বেও যথাযথ চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া সম্ভবপর হচ্ছিলনা। পরবর্তীতে পাসপোর্ট ফেরত দেয়ার দাবী জোরালো হয়ে উঠলে সরকার কর্তৃক তাঁর পাসপোর্ট ফেরত দেয়া হয়। সেই সাথে তাঁর চিকিৎসার দায়িত্বগ্রহনে সরকারের অভিপ্রায়ও জানানো হয়। কিন্তু তিনি তাতে অসম্মতি জ্ঞাপন করে আবারো আপসহীনতা ও নির্লোভ চরিত্রের প্রকৃষ্ঠ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
হকের পক্ষে দৃঢ়তা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদী চেতনা, উঁচু মাপের ইলমী যোগ্যতা ও নির্লোভ চরিত্রের ফলশ্রতিতে ক্রমান্বয়ে আলেম-ওলামা, শিক্ষার্থীসহ ইসলামপ্রিয় জনতার হৃদয়ে তাঁর শ্রদ্ধা, ভক্তি ও আবেগ-অনুরাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর আমীরে হেফাজত, শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ. এর ইন্তেকালের পর তাওহিদী জনতার অবিসংবাদিত রাহবার হিসেবে আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরীর অনিবার্যতা আরও বেশি প্রতিভাত হয়ে উঠে। এমতাবস্থায় ১৫ নভেম্বর সংশ্লিষ্ট নেতৃবৃন্দ, শীর্ষস্থানীয় ও প্রতিনিধিত্বশীল ওলামায়েকেরামের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহনে এ দেশের সর্ববৃহৎ আধ্যাত্মিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের বহুল আকাঙ্ক্ষিত সম্মেলনে তাঁকে আমীরে হেফাজত নির্বাচিত করা হয়। ইতিপূর্বে ১৯ সেপ্টেম্বর শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ. এর নামাযে জানাযার পরে অনুষ্ঠিত জামিয়া আহলিয়া মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারীর মজলিসে শুরা কর্তৃক তিনি জামিয়ার শায়খুল হাদীস ও শিক্ষা পরিচালক পদে অভিষিক্ত হন।
আমরা মহান আল্লাহর দরবারে আকুল ফরিয়াদ জানাই, তিনি যেন ঈমানী আন্দোলনের নিশানবরদার আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরী ( দা.বা.) কে পূর্ণ সূস্থতার নিয়ামত ও দীর্ঘ হায়াত দান করেন। আমিন।

লেখক- সিনিয়র সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসমাজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *