বিদেশে গিয়ে শুঁটকি উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শেখার ব্যয় কমিয়ে ৪৫ লাখ টাকা করা হয়েছে। ৩০ জনের বদলে এখন প্রশিক্ষণ নেবেন ১৫ জন। ‘কক্সবাজার জেলায় শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপন’ প্রকল্পের অধীনে বিদেশে প্রশিক্ষণ নিতে ৩০ জনকে পাঠানোর প্রস্তাব করেছিল বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি)। এ জন্য ব্যয় চাওয়া হয়েছিল এক কোটি ৭০ লাখ টাকা। ফলে প্রকল্পের আওতায় ভ্রমণ ব্যয় কমছে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

জানা গেছে, শুধু সংশ্লিষ্ট ১৫ কর্মকর্তা বিদেশে প্রশিক্ষণ নিতে যাবেন। তারা স্টাডি ভিজিট বা ভ্রমণ করবেন না। প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা দেশে ফিরে উন্নত মানের শুঁটকি তৈরিতে ভূমিকা রাখবেন। এরইমধে প্রকল্পের প্রস্তাবনা পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে বিএফডিসি। গত ১৪ অক্টোবর পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) জাকির হোসেন আকন্দের সভাপতিত্বে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিএফডিসি, পরিকল্পনা কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় শুঁটকি তৈরি শিখতে বিদেশ ভ্রমণ ও প্রশিক্ষণ বাবদ ব্যয় ও কর্মকর্তাদের সংখ্যা কমানোর প্রস্তাব করা হয়।

করোনা মহামারির কারণে দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বৈদেশিক প্রশিক্ষণ ও ভ্রমণ খাতের ব্যয় কমানো প্রয়োজন বলে মত দেয় পরিকল্পনা কমিশন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শুঁটকি তৈরির জন্য মাছের সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণের বিভিন্ন আধুনিক পদ্ধতি, ভ্যালু এডিশন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ পদ্ধতি ও পলিসি বিষয়ে সম্যক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জনের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তারা দুটি ব্যাচে ভাগ হয়ে বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য যাবেন।
শুঁটকি তৈরি শিখতে বিদেশ ভ্রমণ ব্যয় কমিয়ে দেওয়া প্রসঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) জাকির হোসেন আকন্দ বলেন, শুঁটকি তৈরির কাজে বিদেশে প্রশিক্ষণ বাবদ স্টাডি ট্যুর বাদ দেওয়া হয়েছে। এ কারণে ব্যয় কমিয়ে ৪৫ লাখ টাকা করা হয়েছে। আমরা বলেছি, বিদেশে স্টাডির দরকার নেই। ভারত, ফিলিপাইন্স ও থাইল্যাণ্ডে থেকে কিছু কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ নিয়ে শুঁটকি তৈরি শিখতে পারেন। যেটা যৌক্তিক সেটা রাখা হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় প্রস্তাবিত শুঁটকি জোনে প্রস্তাবিত তিনটি আরসিসি জোট নির্মাণের সংস্থান থাকবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কর্তৃক গৃহীত ‘খুরশকুল বিশেষ আশ্রয়ণ’ প্রকল্পের আওতায় মাস্টার প্ল্যানের জোন-০৪ এ স্থানান্তর করা যেতে পারে। শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রটিতে খুরুশকূলে পুনর্বাসিতব্য দারিদ্র জেলে পরিবারগুলোর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রে মেকানিক্যাল ড্রাইয়ার ও গ্রিন হাউজ ড্রাইয়ার ছাড়াও সৌর বিদ্যুৎ চালিত ড্রাইয়ারের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে বলে মত দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।

প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২০০ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। চলতি সময় থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। ৩৫০টি গ্রিন হাউস মেকানিক্যাল ড্রায়ার এবং ৩০টি মেকানিক্যাল ড্রায়ার নির্মাণ করা হবে। এসব পরিচালনার জন্য বিদেশে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন বলে দাবি করেছে বিএফডিসি। প্রকল্পের আওতায় একটি জিপ, একটি ডাবল কেবিন পিকআপ, একটি মাইক্রোবাস ও চারটি মোটরসাইকেল কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণ নেওয়া ছাড়াও অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ বাবদ ১ কোটি ২১ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। ৪ হাজার ৮৫৫ জন বিএফডিসির কর্মকর্তা, কর্মচারী, উপকারভোগী ও স্টেকহোল্ডারের জন্য প্রশিক্ষণ বাবদ এই টাকা ব্যয় হবে। প্রতিজনের প্রশিক্ষণ ভাতা ধরা হয়েছে ১ হাজার ৫০০ টাকা। প্রশিক্ষণ সামগ্রী (ব্যাগ, নোট প্যাড ও কলম) বাবদ ১ হাজার ২০০ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। নাস্তা ও দুপুরের খাবার বাবদ প্রতিজনের জন্য ব্যয় হবে ৫০০ টাকা।

প্রকল্পের আওতায় আড়াই হাজার বর্গমিটার আয়তনের অবতরণ শেড, ১ হাজার ৮৬০ বর্গমিটার আয়তনের চারতলা ল্যাব, অফিস, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র কাম ডরমেটরি নির্মাণ করা হবে। ১০০ টন ক্ষমতাসম্পন্ন কোল্ড স্টোরেজ (চার চেম্বার বিশিষ্ট), প্যাকেজিং ফ্যাক্টরি ও ৩৬টি শুঁটকি বিক্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পের আওতায় ১০টি টয়লেট, তরল বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি, ইনচার্জ অব ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ডাব্লিউটিপি) নির্মাণ করা হবে।

প্রকল্পের আওতায় চারজন কর্মকর্তার মূল বেতন ধরা হয়েছে ৬৯ লাখ ১৬ হাজার টাকা এবং ৩ জন কর্মচারীরর মূল বেতন ধরা হয়েছে ১৫ লাখ ৭১ হাজার টাকা। এছাড়া প্রকল্পের আওতায় একজনের মোবাইল ভাতা ধরা হয়েছে ৯৭ হাজার টাকা। একজনের মোটরযান রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা ধরা হয়েছে ২১ লাখ টাকা। পেট্রোল ও লুব্রিকেন্ট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৬ লাখ টাকা। সাত জনের বাড়ি ভাড়া ভাতা ধরা হয়েছে ৩৮ লাখ ১০ হাজার টাকা।

বিএফডিসি সূত্র জানায়, মাছের অপচয় কমিয়ে শুঁটকি উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করবে সরকার। শুঁটকি উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও বিপনের কাজে জড়িতদের জন্য নিরাপদ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।

বিএফডিসি সূত্র জানায়, সারা বছরই কক্সবাজারের মহালগুলোতে শুঁটকি উৎপাদন করা হচ্ছে। শুঁটকি তৈরি একটি অতি প্রচলিত মাছ সংরক্ষণ পদ্ধতি হলেও বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই বাণিজ্যিক শুঁটকি উৎপাদন ও সংরক্ষণ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন প্রকার কৃষিজ কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। তাছাড়া শুঁটকি তৈরির সময় মাছ ভালোভাবে পরিষ্কার না করা, পরিবেশ, আবহাওয়া ও গুণগতমান রক্ষার অভাবে কাঙ্ক্ষিত মানসম্পন্ন শুঁটকি তৈরি সম্ভব হয়ে ওঠে না।

সিঙ্গাপুর, হংকং, মালয়েশিয়া, যুক্তরোজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশে উৎপাদিত শুঁটকি রফতানি হয়ে থাকে। অনুমান করা হয়, সমুদ্র এলাকায় পচন ও পোকা-মাকডের আক্রমণে ১০ থেকে ৩৫ শতাংশ শুঁটকি নষ্ট হয়। শুঁটকির গুণগত মান উন্নত করার জন্য দেশি উপায়ে তৈরি গ্রিন হাউস মেকানিক্যাল ড্রায়ার খুবই উপযোগী। -বাংলানিউজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *