পার্বত্য চট্টগ্রামের জুমচাষীরা পাহাড়ের চুঁড়ায় আগে ধান চাষ করতেন। কিন্তু গত কয়েকবছর ধরে তারা ঝুঁকছেন মিষ্টি পান চাষে। এর ফলশ্রুতিতে শত শত সুউচ্চ পাহাড়ে এখন উৎপাদিত হচ্ছে মুখরোচক মিষ্টি পান। আর আর্থিকভাবে লাভজনক হওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে পান চাষ।
অপার সম্ভাবনাময় পার্বত্য চট্টগ্রাম যেন একখণ্ড ভূ-স্বর্গ। শরৎ মৌসুমে ঘন সবুজে মোড়ানো পাহাড়। কাঁচা পাকা ধানে ভরে গেছে জুম। খাগড়াছড়ির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বেশীর ভাগ মানুষ জুম চাষের উপর নির্ভরশীল। অতীতে এক পাহাড়ে জুম চাষ করার পর ১০ থেকে ১৫ বছর পর আবার সেই পাহাড় জুমের আবাদ করা হত। তবে ইদানিং উপর্যুপরি ও বিরতিহীনভাবে জুমে চাষাবাদ হওয়ায় কমছে ভূমির উর্বরতা। জুমে ধান, হলুদ, মারফা, মিষ্টি কুমড়ো, তিল, ভুট্টা, বরবটিসহ প্রায় ৪০ ধরনের সবজি উৎপাদিত হয়।
জুমিয়ারা জানান, অতীতে এক পাহাড়ে জুম চাষ করার পর এক দশকের বেশি সময় পর সেই পাহাড় জুমের আবাদ করা হত। তবে পাহাড়ে রাবার বাগান, সেগুনসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক বনায়নের কারণে কমেছে জুমের পরিমাণ। বাধ্য হয়ে মাত্র ২ থেকে ৩ বছর পর একই পাহাড়ে জুমের আবাদ করা হচ্ছে। এতে কমছে জমির উর্বরতা। জুম চাষ করে ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারছে না জুমচাষীরা।
তবে জুমের সাথে এবার পাহাড়ের চূড়ায় পান চাষ করে রীতিমত বিপ্লব ঘটিয়েছে খাগড়াছড়ি দীঘিনালার সীমানা পাড়া এলাকার অন্তত ৬০ জন পানচাষী। বিস্ময়কর হলেও পাহাড়ের চূড়ায় পান চাষ করেছে তারা। পানচাষীরা বলছেন, জুমের চেয়ে পান চাষে লাভ বেশি। অনেকে পান চাষ করছে। আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ায় দিন দিন বাড়ছে পান চাষীর সংখ্যা। খাগড়াছড়িতে পাহাড়ের চূড়ায় প্রথমবারের মতো ৬০ বরজে পানের আবাদ করেছে চাষীরা। খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় পাহাড়ের চূড়া বা ঢালু জমিতে পানের বরজ দৃশ্যমান। একসময় এসব পাহাড়ে কেবল জুম চাষ হলেও এখন জুমের পাশাপাশি প্রথমবাবের মতো পান চাষ করেছে চাষীরা। পাহাড়ে বৃষ্টি শুরু হওয়ার পরপর পানে আবাদ শুরু করে চাষীরা। প্রতি ২৫ শতক জমিতে পানের আবাদ করতে খরচ প্রায় ৪০ হাজার টাকা। বাজারে পানের দাম ভালো থাকলে প্রায় দেড় লাখ টাকা লাভ করতে পারবে চাষীরা। পান চাষ করে অনেকে আত্মনির্ভরশীল হয়েছে।
সীমানা পাড়া এলাকায় পাহাড়ের ঢালুতে জুম ক্ষেতের অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি পান চাষ করেছে নবীন ত্রিপুরা। সরেজমিনে নবীন ত্রিপুরার বাগানে গিয়ে দেখা যায়, সন্ত্রীক বাগানে পানের যত্ন নিচ্ছেন তিনি। কীভাবে পান চাষ শুরু করেছে এমন প্রশ্নের জবাবে নবীন ত্রিপুরা জানান, আমরা এখানে বছরের পর বছর জুম চাষ করেছি। তবে এক স্বজনের মাধ্যমে পাহাড়ের চূড়ায় পান চাষের কৌশল সম্পর্কে ধারণা নিয়েছি। পরে নিজে নিজে ২০ শতক জমিতে পানের আবাদ শুরু করেছি এবং দ্রুত সাফল্য পেয়েছি। মে মাসে পানের বরজে চারা রোপণ করেছি। ধীরে ধীরে পুরো বরজ সবুজ পানে ভরে গেছে। প্রতি সপ্তাহে ১শ বিড়া পান বিক্রি করি। এই বরজ থেকে অন্তত দেড় লাখ টাকার পান বিক্রি করতে পারব।
নবীন ত্রিপুরার স্ত্রী জানান, পাহাড়ে জুম চাষের পাশাপাশি আমরা পানে আবাদ করেছি। ভালো লাভ হচ্ছে। পান চাষ করে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, সংসার চলে। প্রথমবারে মতো পান চাষ করে আমরা লাভবান হয়েছি।
পাহাড়ে পানির স্বল্পতার কারণে মে মাসে বৃষ্টির শুরুতে পানের চারা রোপণ করা হয়। পুরো বৃষ্টির মৌসুমে পানের বৃদ্ধি ঘটে। পাহাড়ের ঢালুতে পানি না জমায় পানের গাছ নষ্ট হয় না। তবে শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে পাহাড়ে চাষ বন্ধ থাকে। পাহাড়ে ঝিরি ঝরনায় ছোট ছোট কৃত্রিম বাঁধ সৃষ্টি করতে পারলে সারা বছরই পাহাড়ের চূড়ায় পানের আবাদ করা সম্ভব। এই বিষয়ে কৃষি বিভাগের সহযোগিতা চায় চাষীরা।
পাহাড়ের চূড়ায় পানচাষকে নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে কৃষি বিভাগ। দীঘিনালা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওঙ্কার বিশ্বাস জানান, কৃষকদের আর্থিক প্রনোদনা ও ঋণ সহায়তা প্রদানে ব্যাংকগুলোকে অনুরোধ করেছে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট থাকার পরও পাহাড়ে পান চাষ করে চাষীরা লাভবান হচ্ছে। তবে এসব কৃষকদের যাতে কৃষি ঋণের আওতায় নিয়ে আসা যায় সেই বিষয়ে আমরা কৃষি ব্যাংকের সাথে কথা বলেছি। কৃষকদের মাঝে ঋণ প্রদানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
আরব আমীরাত প্রবাসী কক্সবাজারের ফরিদ জানান, মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোতে বাংলাদেশী মিষ্টি পানের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশীরা ছাড়াও আরব নাগরিকরাও মাঝে মধ্যে পান খান।
তাই মিষ্টি পান এখন রপ্তানীপণ্য বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *