ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) ক্রিকেট খেলা নিয়ে জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়েছে পুরো জেলার তরুণ এবং যুবক সমাজ। শহরসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে মুদির দোকান, সেলুন, হোটেল, রেস্তোরাঁ, ক্লাব ও ঘরে বসছে জুয়ার আসর। এ ব্যাপারে প্রশাসনের কোনো তৎপরতা না থাকায় এ আসর জমজমাট হয়ে উঠছে দিনে দিনে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহরের অলিতে-গলিতে আন্তর্জাতিক ওয়ানডে, টেস্ট, টি-২০ আসর, এমনকি দেশ-বিদেশের ঘরোয়া লিগ নিয়ে নিয়মিত চলে জুয়া। কোন দল জিতবে, কোন খেলোয়াড় কত রান করবে, কোন বোলার কয়টা উইকেট নেবে-এমন অনেক বিষয় নিয়ে বাজি ধরা হয়। জুয়ার খেলোয়াড়রা দু’ভাবে খেলে। প্রথমত, একসঙ্গে কোনও দোকান, সেলুন, হোটেল বা ঘরে বসে জুয়া খেলে। এরা বাজির টাকা নগদ পরিশোধ করে। দ্বিতীয়ত, বাড়ি, অফিস বা অন্যত্র বসে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পরিচিতদের সঙ্গে বাজি ধরে। এরা টাকা লেনদেন করে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। জুয়ার টাকার পরিমাণ ৫০০ টাকা থেকে হাজার হাজার টাকা পর্যন্ত চলে। প্রতি ওভার কিংবা বলেও বাজি ধরে বলে অভিযোগ উঠেছে।
দোকানদার, সেলুনের নাপিত, ছাত্র সমাজ, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ এ জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। এর মধ্যে শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী বেশি। লোভের বশবর্তী হয়ে দিনমজুর ও রিকশাচালকরাও জুয়া খেলছেন। এদের কেউ কেউ বাড়ির জিনিসপত্র বিক্রি ও সুদে ঋণ নিয়ে জুয়ায় অংশ নিয়ে সব হারাচ্ছেন। খেলা শুরুর আগেই জুয়াড়িরা টেলিভিশনের সামনে বসে পড়েন। সবার হাতে হাতে থাকে মোবাইল ফোন আর ব্রাউজ করা থাকে বিভিন্ন স্কোর অ্যাপ্লিকেশন।
জুয়া খেলাকে কেন্দ্র করে অনেক অঘটনও ঘটছে নিয়মিত। শহরের আলীর জাঁহাল, বাসটার্মিনাল টেকপাড়া, পাহাড়তলী, বাহারছড়া এবং নুনিয়ারছরা এই অঞ্চলগুলোতে আইপিএল নিয়ে নিয়মিত অঘটন ঘটে। বন্ধু-বন্ধুর বিপক্ষে ভাই-ভাইয়ের বিপক্ষে জুয়া খেলাকে কেন্দ্র করে অভিযোগ তুলে একজন অপরজনকে আঘাত করার জন্য ধারালো অস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাহাড়তলীর এক সমাজকর্মী জানান, ‘সদ্য শেষ হওয়া আইপিএল এর নবম রাউন্ডের কিংস ইলেভেন পাঞ্জাব বনাম রাজস্থান রয়্যালস ম্যাচে রাজস্থান এর তেবাটিয়ার ১ ওভারে ৫ ছক্কাসহ ৭ ছক্কায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে পাহাড়তলীর তরুণরা। ৩১ বলে তাঁর সংগ্রহীত ৫৩ রান মিরাকেলের মতো ভাগ্য পরিবর্তন করে জুয়াড়িদের। খেলার শুরুতে অনেকেই বাজি ধরে পাঞ্জাবের পক্ষে, পুরো খেলা পাঞ্জাবের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও রাজস্থান এর তেবাটিয়া তাঁর সেরা পারফরম্যান্সের মাধ্যমে ভেঙ্গে দিয়েছে শত জুয়াড়ি তরুণের স্বপ্ন।’
ওই ম্যাচে ২০ ওভারে ২ উইকেটের বিনিময়ে পাঞ্জাবের করা ২২৩ রানের টার্গেট ভেঙে পেলে রাজস্থান রয়্যালস। রাজস্থান ৩ বল হাতে রেখেই ৬ উইকেট খরচে ২২৬ রান করে দুর্দান্ত জয় ছিনিয়ে আনে যা কল্পনাও করতে পারেনি বাজি ধরা জুয়াড়ি তরুণ-যুবারা।
জেলা ক্রীড়া সংগঠক জাহেদ উল্লাহ জাহেদ জানান, ‘আইপিএল জুয়া শুধু শহরে নয়, জেলা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এ জুয়াতে তরুণ ও যুবকরা বেশি ঝুঁকে পড়েছেন। খেলা উপভোগ্য হিসেবে মনমানসিকতা তৈরী করতে হবে। এটি কখনো জুয়ার মাধ্যম হতে পারে না। খেলাকে উপভোগ না করে জুয়ার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করলে অনেক বড় অঘটন ঘটতে পারে।’
আমরা কক্সবাজারবাসীর সমন্বয়ক নাজিম উদ্দিন জানান, ‘আইপিএল নিয়ে জুয়া নতুন কিছু নয়। আইপিএল গঠনের শুরু থেকে দেশের আনাচে কানাচে জুয়ার আসর বসে আসছে। এই ধারাবাহিকতা কক্সবাজারেও চলছে। এটি একটি জঘন্যতম অপরাধ। জুয়ায় জড়িত অপরাধীদের ধরে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের এমনভাবে শাস্তি দিতে হবে যেন অন্যরা আর জুয়ায় আগ্রহ না দেখায়।’
এ ব্যাপারে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় নবনিযুক্ত ওসি শেখ মুনিরউল গিয়াস জানান, ‘এই রকম কোনো অভিযোগ এই প্রথম পেলাম। খবর রাখছি এবং সঠিক তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে অপরাধীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *