দেশের প্রযুক্তিবাজারে পণ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। ডিলার ও ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী আমদানিকারক ও পরিবেশকরা পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় এই সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। প্রযুক্তি ব্যবসায়ীরা বলছেন, শিগগিরই এই সংকট কেটে যাবে এবং বাজার করোনাকালের আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। জানা গেছে, পণ্য সংকটের শীর্ষে রয়েছে ল্যাপটপ, মনিটর, মাদারবোর্ড, গ্রাফিকস কার্ড, রাউটার, মডেম, ওয়েবক্যাম, হেডফোন ইত্যাদি। এসব পণ্যের বিক্রি বেড়ে যাওয়ার কারণে বাজারে পণ্যের সংকট দেখা দিয়েছে।

বাজারে পণ্যের সংকট থাকলেও ব্যবসায়ীরা খুশি বিক্রি বেড়ে যাওয়ায়। তাদের অভিমত, ক্রেতারা তাদের পছন্দের পণ্য না পেয়ে সংকটের কারণে হাতের কাছে যা পাচ্ছেন ( ব্র্যান্ড, নন ব্র্যান্ড পণ্য) তাই কিনছেন। ফলে বিক্রি বেড়ে গেছে।
এই সংকটের মাঝেও প্রযুক্তি পণ্যের দাম বেড়েছে খুচরা বাজারে। খুচরা বিক্রেতারা ৫-৭ শতাংশ দাম বাডিয়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রযুক্তি পণ্যের আমদানিকারক ও পরিবেশকরা দাম বাড়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, আমাদের বা ডিলার পর্যায়ে দাম বাড়েনি। বেড়েছে খুচরা বিক্রিতে। চাহিদা বাড়ার কারণে এমনটা হয়েছে। আমদানি পর্যাপ্ত পরিমাণে হলে এবং চাহিদা কমে গেলে দামও কমে যাবে। তারা মনে করেন, এ অবস্থায় ডিলাররা ভালো মার্জিন পাচ্ছেন। যেটা সব সময় হওয়ার কথা, কিন্তু তারা বিক্রি বাড়াতে গিয়ে কখনও কখনও কম দামেও পণ্য বিক্রি করে থাকেন, এটা কখনও কাম্য নয়। বাজার ভালো ও স্থিতিশীল রাখতে হলে সব পক্ষের মধ্যে সমন্বয় জরুরি।
বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির (বিসিএস) সভাপতি মো. শাহিদ উল মুনীর বলেন, ‘প্রযুক্তি বাজার চাঙ্গা হয়েছে এন্ড ইউজারদের কারণে। কিন্তু সরকারি ও করপোরেট পর্যায়ে কেনাকাটা এখনও শুরু হয়নি। এটা শুরু হলে বাজার পুরোপুরি আগের জায়গায় ফিরে আসবে।’

বাজারে প্রযুক্তি পণ্যের সংকটের কথা স্বীকার করে বিসিএস সভাপতি বলেন, ‘দীর্ঘদিন পণ্য আমদানি বন্ধ ছিল। এ কারণে প্রযুক্তি পণ্যের সংকট চলছে।’ তিনি মনে করেন, অন্যান্য ব্যবসায়ের তুলনায় দেশের প্রযুক্তি পণ্যের বাজার ভালো ছিল। এই মার্কেট একদম অচল হয়ে যায়নি।’
তিনি জানান, পুরোদমে আমদানি শুরু হলে মার্কেট আবারও আগের অবস্থায় ফিরে আসবে, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের আগে যেমন ছিল।
এ দেশে প্রযুক্তি পণ্যের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ব্র্যান্ড প্রাইভেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান আব্দুল ফাত্তাহ স্বীকার করে বলেন, ‘দেশে প্রযুক্তি পণ্যের ঘাটতি রয়েছে। দিন দিন পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। এটা একদিক দিয়ে ভালো। দীর্ঘদিন পরে বাজারমুখী হয়েছেন ক্রেতারা।’
তিনি জানান, শুধু বাংলাদেশেই নয় সারাবিশ্বে প্রযুক্তি পণ্যের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তিনি আরও জানান, ‘ডিমান্ড অনুযায়ী রাইট কম্পোনেন্ট’ পাচ্ছে না প্রযুক্তি পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে পণ্য সরবরাহে ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। এ সময়ে হোম অফিস ও অনলাইনে ক্লাস শুরু হওয়ায় ল্যাপটপ, রাউটার, ওয়েবক্যাম, স্পিকার, হেডফোনের বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় ওভার অল বিক্রি ভালো বলে তিনি জানান। তার প্রতিষ্ঠান আসুস ল্যাপটপের একমাত্র পরিবেশক এ দেশে। তিনি বলেন, ‘ল্যাপটপের চাহিদা বেড়েছে। বাসা থেকে অফিস করা ও অনলাইনে ক্লাস হওয়ায় একটি পরিবারেই এখন একাধিক ল্যাপটপের চাহিদা দেখা দিয়েছে। ফলে ল্যাপটপের বিক্রি যেমন বেড়েছে, তেমনি ঘাটতিও দেখা দিয়েছে। তবে অন্যান্য পণ্যের চাহিদা বাড়েনি।’
দেশের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি পণ্যের আমদানিকারক ও পরিবেশক প্রতিষ্ঠান স্মার্ট টেকনোলজিসের পরিচালক (চ্যানেল সেল্স) মুজাহিদ আল বেরুনি সুজন বলেন, ‘বাজারে প্রযুক্তি পণের সংকট রয়েছে। বিশেষ করে ল্যাপটপ, মনিটর ও পেরিফেরিয়ালস পণ্যের সংকট বেশি। আমরা উৎপাদকদের কাছে চাহিদা পাঠাচ্ছি, তারা চাহিদা অনুযায়ী পণ্য দিতে পারছে না।’ তিনি বলেন, ‘দেখা গেলো আমরা চাহিদা দিলাম ২০ হাজার ইউনিট ল্যাপটপের, তারা পাঠালো ১০ হাজার ইউনিট।’ তিনি উল্লেখ করেন, প্রযুক্তি পণ্য উৎপাদকরা যান্ত্রাংশের ঘাটতির কারণে চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারছে না। লকডাউনের কারণে যন্ত্রাংশ নির্মাতারা উৎপাদন বন্ধ রাখায় এই সংকট তৈরি হয়েছে।
ইউসিসির প্রধান নির্বাহী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সারোয়ার মাহমুদ খানও বলেন, ‘বাজার ভালো যাচ্ছে আদতে চাহিদার কারণে। ডিলাররা ভালো মার্জিন পাচ্ছে।’ এটাই হওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অনেক সময় ডিলাররা লসেও বাজারে পণ্য বিক্রি করেন। এটা কাম্য নয়।’
তিনিও স্বীকার করেন, বাজারে পণ্যর সংকট রয়েছে। ডেস্কটপ, ল্যাপটপ কম্পিউটার, রাউটারের বিক্রি ভালো হলেও মাদারবোর্ড, প্রসেসর, হার্ডড্রাইভের ঘাটতি আছে বাজারে।
প্রযুক্তি পণ্যর দাম ৫-৭ শতাংশ বেড়েছে কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা খুচরা বাজারে বেড়েছে। পরিবেশক বা ডিলাররা বাডায়নি।’ কারণ হিসেবে তিনি পণ্যের ঘাটতির কথা উল্লেখ করেন। ঘাটতির কারণে কেউ কেউ পণ্যের দাম বাডিয়ে থাকতে পারে বলে জানান ট্রান্সসেন্ড, এমএসআই ও এসার (একাংশের) পণ্যের এই পরিবেশক।
বাজার সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডের মাল্টিপ্ল্যান কম্পিউটার মার্কেট (ইসিএস কম্পিউটার সিটি)-এর সাধারণ সম্পাদক সুব্রত সরকার বলেন, ‘মার্কেটে বেচাবিক্রি ভালো। আমার ব্যবসায়ীরা খুশি।’ মার্কেটে ল্যাপটপের ঘাটতি আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বড় বড় ব্র্যান্ডের সব মডেল মার্কেটে পাওয়া যাচ্ছে না। যা আছে সব বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। ল্যাপটপের পাশাপাশি বেশি বিক্রি হচ্ছে গ্রাফিক্স কার্ড, ওয়েবক্যাম, রাউটার, হেডফোন ইত্যাদি।’ সুব্রত সরকার প্রযুক্তি পণ্যের এই ঘাটতিকে আমাদের দেশীয় বলতে নারাজ। তিনি বলেন, ‘সারাবিশ্বেই পণ্যের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।’
খুচরা বিক্রিতে দাম বেড়েছে, ক্রেতাদের এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সুব্রত সরকার বলেন, ‘বাজারে পণ্যের সংকট হলে দাম কিছুটা বাড়ে। তবে বেশি বাড়েনি। ৫-৭ শতাংশ দাম বেড়ে থাকতে পারে।’ তিনি উল্লেখ করেন, দাম বাড়লেও কিন্তু ক্রেতা কমেনি। তিনি বলেন, ‘আমাদের মার্কেটে যে রেকর্ড সংখ্যক মানুষ প্রবেশ করেছে, তার রেকর্ড আমাদের কাছে আছে। একদিনে সর্বোচ্চ মানুষ প্রবেশ করেছে তার সংখ্যা ১৭ হাজার। এরমধ্যে সর্বোচ্চ ৭ হাজার হলো দোকান মালিক ও বিক্রয়কর্মী। ক্রেতার সংখ্যা ছিল ১০ হাজারের বেশি। এছাড়া এখন প্রতিদিন ১২-১৪ হাজার লোক মার্কেটে আসে। এরমধ্যে ৭-৯ হাজার ক্রেতা। করোনায় লকডাউন উঠে যাওয়ার পরের চিত্র এটি। ফলে আমরা বলতে পারি বর্তমানে প্রযুক্তি পণ্যের বাজার ভালো করছে। ব্যবসায়ীরা সন্তুষ্ট।’
শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাস শুরুর পর চাহিদা বেড়েছে হেডফোন, ভার্ভবাডস ও ইয়ারফোনের। দেশে মটোরোলা পণ্যের (মোবাইল ফোন ও একসেসরিজ) পরিবেশক সেলেক্সস্ট্রা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিব আরাফাত বলেন, ‘এই সময়ে ভার্ভবাডস, হেডফোন ভালো চলছে। বিক্রি আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে।’
জানা গেছে, দেশে বর্তমানে প্রতিমাসে ২০-২৫ হাজার ইউনিট ল্যাপটপ বিক্রি হচ্ছে, যা বছর দুই তিন আগে হতো বলে প্রযুক্তি ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, করোনার আগে প্রতিমাসে বিক্রি হতো ৮-১০ হাজার ইউনিট ল্যাপটপ। বাজারে ল্যাপটপের সংকট না হলে এর বিক্রি আরও বাড়তো বলে তারা মনে করেন। যদিও জুলাই মাসের শেষে প্রযুক্তি পণ্যের ব্যবসায়ীরা পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, আগস্ট মাস বা সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে ল্যাপটপের সংকট দেখা দেবে। দামও কিছুটা বাড়তে পারে।
করোনার এই মহামারির সময়ে বাসাবাড়িতে বন্দিজীবন কাটাতে হচ্ছে অনেককে। গেম খেলে, ইউটিউবে ভিডিও দেখে সময় কাটাচ্ছেন তরুণরা। অন্তত ব্যান্ডউইথের ব্যবহার বলছে যে, গেমসের পেছনেই ব্যান্ডউইথ ব্যবহার হচ্ছে ৫৫০ জিবিপিএসের (আপ ও ডাউন স্ট্রিট মিলিয়ে) বেশি। স্বভাবতই গেমিং ডিভাইসের বিক্রিও বেড়েছে বলে জানালেন ব্যবসায়ীরা। দেশের শীর্ষ গেমিং ডিভাইস নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গিগাবাইটের বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার খাজা মো. আনাস খান বলেন, ‌‘শুধু করোনার সময়ই নয়, বরাবরই গেমারদের কাছে গিগাবাইটের মাদারবোর্ড, গ্রাফিকস কার্ড, গেমিং চেয়ার, গেমিং মনিটর, মাউস পছন্দের শীর্ষে। করোনাকালেও এসবের বিক্রি কমেনি। বরং চাহিদা ছিল অন্য সময়ের তুলনায় বেশি। তবে মাদারবোর্ড ও গ্রাফিকস কার্ডের সংকট রয়েছে বাজারে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *