দেশে সাইবার ক্রাইমের সংখ্যা বেড়েই চলছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এ সংক্রান্ত মামলার সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু সেই তুলনায় মামলার বিচার নিষ্পত্তি ও সাজার হার খুবই কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মামলার বিচারে এই ধীর গতির কারণ কী? এ প্রশ্নে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাইবার ক্রাইমের মামলাগুলো দায়ের করার সময় তা যথেষ্ট যাচাই-বাছাই করা হয় না। বেশিরভাগ মামলাই ভিত্তিহীন। এমনকি মামলাগুলো দক্ষ তদন্ত কর্মকর্তা দিয়ে তদন্তও করানো হচ্ছে না। ফলে মামলার সংখ্যা বাড়তেই থাকে। ঝুলে যায় বিচার কাজ। আবার যথেষ্ট যুক্তি প্রমাণের অভাবে মামলাগুলো যেমন খারিজ হয়ে যায়, আসামিরাও তেমনই খালাস পেয়ে যান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাইবার ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর নজরুল ইসলাম শামীম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সাইবার ক্রাইমের যে মামলাগুলো থানায় নেওয়া হচ্ছে, সেগুলো বেশিরভাগই ভিত্তিহীন। কোনোরকম যাচাই-বাছাই না করেই থানায় মামলা নেওয়া হচ্ছে। ফলে পরবর্তীতে তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হলেও আসামিরা মামলা থেকে অব্যাহতি বা খালাস পেয়ে যান।’

তিনি জানান, ২০১৩ সাল থেকে চলতি বছরের ১৭ আগস্ট পর্যন্ত ১২৪টি মামলার রায় ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্যে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় ৩৫টি মামলায় আসামির সাজা হয়েছে। আর অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় ৮৯টি মামলায় আসামিরা খালাস পেয়েছেন। এছাড়া, অভিযোগ গঠনের শুনানির দিনে মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন ২০০টিরও বেশি মামলার আসামিরা।

ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সাল থেকে চলতি বছরের ১৭ আগস্ট পর্যন্ত সারাদেশের বিভিন্ন থানা থেকে বিচারের জন্য সাইবার ট্রাইব্যুনালে মোট মামলা এসেছে দুই হাজার ৬৪২টি। এরমধ্যে ২০২০ সালে ২৫৬টি, ২০১৯ সালে ৭২১টি, ২০১৮ সালে ৬৭৬টি, ২০১৭ সালে ৫৬৮টি, ২০১৬ সালে ২৩৩টি, ২০১৫ সালে ১৫২টি, ২০১৪ সালে ৩৩টি এবং ২০১৩ সালে এসেছে ৩টি মামলা।

এছাড়া, সরাসরি ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা হয়েছে ১০৮২টি মামলা। এর মধ্যে ২০১৮ সালে ২৪৯টি, ২০১৯ সালে ৬৬৮টি ও চলতি বছরের ১৭ আগস্ট পর্যন্ত ১৬৫টি মামলা সরাসরি ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা হয়। দেখা গেছে, এই ১০৮২টি মামলার মধ্যে ৪৪৭টি মামলা বিভিন্ন সংস্থাকে তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। বাকি ৬৩৫টি মামলায় প্রয়োজনীয় উপাদান না থাকায় আদালত খারিজ করে দেন। তদন্তাধীন ৪৪৭টি মামলার মধ্যে ১৫০টি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ইতোমধ্যে আদালতে জমা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে সাইবার ট্রাইব্যুনালে সব মিলিয়ে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা মোট দুই হাজার।

এত বেশি সংখ্যক মামলার আসামি খালাস পাওয়ার কারণ সম্পর্কে সাইবার ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর নজরুল ইসলাম শামীম বলেন, ‘থানায় বেইসলেস মামলা নেওয়া, মামলা দায়েরের পরে বাদী ও আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে সঠিকভাবে সাক্ষ্য উপস্থাপন না করা, তদন্ত কর্মকর্তা মামলার অভিযোগপত্রে আইটি রিপোর্ট দাখিল না করা এবং তদন্ত কর্মকর্তা সাক্ষীদের সাক্ষ্য ও মামলার তথ্যগত কাগজপত্র সঠিভাবে পর্যালোচনা না করে আদালতে রিপোর্ট প্রদান করায় আসামিরা খালাস পেয়ে যান।’

নজরুল ইসলাম শামীম আরও বলেন, ‘থানার উচিত সাইবার ক্রাইম সংক্রান্ত ভিত্তিহীন মামলা পরিহার করা। যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত ও প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট ছাড়া মামলা গ্রহণ না করা। দক্ষ তদন্ত কর্মকর্তা দিয়ে মামলার তদন্ত করা। মামলার বিচার চলাকালে সাক্ষ্য গ্রহণের সময় সাক্ষীদেরও সতর্ক থাকা উচিত।’

সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলার সংখ্যা বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘থানাগুলো অভিযোগ আসলেই তা যাচাই-বাছাই না করেই মামলা রেকর্ড করে ফেলে। ট্রাইব্যুনালে মামলার সংখ্যা বেড়ে যাওয়া এটাই অন্যতম কারণ বলে আমি মনে করি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *