আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের গৌরবদীপ্ত পথচলায় বিরাট কোহলি পূরণ করলেন ১২ বছর। ২০০৮ সালের ১৮ অগাস্ট শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওয়ানডে দিয়ে শুরু হয়েছিল যে ক্যারিয়ার, নানা বাঁক পেরিয়ে, অসাধারণ সব অর্জন ও রেকর্ডে রাঙিয়ে সেই ক্যারিয়ারের এক যুগ পূর্তি হলো মঙ্গলবার।

২০০৮ সালের মার্চে ভারতকে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জয়ে নেতৃত্বে দিয়েছিলেন কোহলি। সেই বছরের অগাস্টে জাতীয় দলের হয়েও অভিষেক হয়ে যায়। সেই সময়ের সম্ভাবনাময় তরুণ আজ ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন, ভারতের টেস্ট ইতিহাসের সফলতম অধিনায়ক।

প্রতিভার সঙ্গে প্রচণ্ড পরিশ্রম, তীব্র আবেগ, বিস্ময়কর নিবেদন আর নিরন্তর নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিজ্ঞা মিলিয়ে কোহলি নিত্য নিজেকে তুলে নিয়েছেন নতুন উচ্চতায়। তার ব্যাটসম্যানশীপ, তার চরিত্র, তার ধরন ও ঘরানা, ক্রিকেট খেলাটিকেও নতুন মানদণ্ডে পৌঁছে দেওয়া, সব মিলিয়ে এই ৩১ বছর বয়সেই ক্রিকেট ইতিহাসে অমর হয়ে গেছেন তিনি। সামনেও তার দেওয়ার আছে, তার কাছ থেকে ক্রিকেটের পাওয়ার আছে আরও অনেক কিছু।

রেকর্ড বইয়ে অবিশ্বাস্য সব সংখ্যার আঁকিবুকি হয়েছে তার ব্যাট দিয়ে। ১২ বছর পূর্তির দিনটিতে তার সেই রেকর্ডের ভান্ডার থেকে তুলে ধরা হলো ১২টি উল্লেখযোগ্য রেকর্ড।

১. রান তাড়ার রাজা

সর্বকালের সেরাদের মধ্যেও কোহলি নিজের আলাদা জায়গা করে নিয়েছেন রান তাড়ার শ্রেষ্ঠত্বে। ওয়ানডেতে রান তাড়ায় ২৬ সেঞ্চুরি করেছেন তিনি, যেখানে তার ধারেকাছে নেই কেউ। ১৩৪ ইনিংসেই করেছেন এই ২৬ সেঞ্চুরি, দুইয়ে থাকা শচিন টেন্ডুলকার ১৭ সেঞ্চুরি করেছেন ২৩২ ইনিংস খেলে।

রান তাড়ায় জয়ের ক্ষেত্রেও চিত্রটি একই। ওয়ানডেতে পরে ব্যাট করে ২২টি সেঞ্চুরিতে দলকে জিতিয়েছেন। এখানেও দুইয়ে থাকা টেন্ডুলকার আছেন অনেকটা পেছনে (১৪ সেঞ্চুরি)।

টি-টোয়েন্টিতে ক্রিকেটে রান তাড়ায় সবচেয়ে বেশি রান এসেছে কোহলির ব্যাট থেকেই , ১ হাজার ৫৬১। এই সংস্করণে রান তাড়ায় জয়ের ম্যাচে হাজার ছুঁতে পেরেছেন এখনও পর্যন্ত কেবল কোহলিই (১ হাজার ২৯৫)।

২. ম্যাচ জয়ী ব্যাটসম্যান

ওয়ানডেতে শচিন টেন্ডুলকারের ৪৯ সেঞ্চুরির রেকর্ড স্পর্শ করা থেকে আর মাত্র ৬টি সেঞ্চুরি দূরে আছেন কোহলি। তবে একটি জায়গায় টেন্ডুলকারকে ছাড়িয়ে গেছেন আগেই। ম্যাচ জেতানো সেঞ্চুরি!

কোহলির ৩৫ সেঞ্চুরিতে জিতেছে দল। টেন্ডুলকারের রেকর্ড ছিল দলের জয়ে ৩৩ সেঞ্চুরি।

দলের জয়ের ম্যাচে কোহলির ওয়ানডে ব্যাটিং গড় ৭৭.৩৭। অন্তত ৩ হাজার রান করা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে ৭০ গড়ও নেই আর কারও।

৩. দুইশর নেতা

টেস্ট ক্যারিয়ারে ৭টি ডাবল সেঞ্চুরি করেছেন কোহলি, সবকটিই অধিনায়ক হিসেবে। টেস্ট ইতিহাসে এতগুলি ডাবল সেঞ্চুরি নেই আর কোনো অধিনায়কের।

অধিনায়কত্বে ব্রায়ান লারার ৫ ডাবল সেঞ্চুরি ছিল আগের রেকর্ড।

৪. মাইলফলকে দ্রুততম

ওয়ানডেতে সবচেয়ে কম ইনিংস খেলে ৯ হাজার, ১০ হাজার ও ১১ হাজার রানের রেকর্ড কোহলির।

৯ হাজার ছুঁতে দুইশর কম ইনিংস (১৯৪) লেগেছে একমাত্র তারই। পেছনে ফেলেছেন এবি ডি ভিলিয়ার্সের রেকর্ড (২০৫)।

১০ হাজার ছুঁয়েছেন কোহলি ২০৫ ইনিংসে, আগের রেকর্ড ছিল শচিন টেন্ডুলকারের ২৫৯ ইনিংসে। ১১ হাজার ছুঁতে কোহলির লেগেছে ২২২ ইনিংস, টেন্ডুলকারের রেকর্ড ছিল ২৭৬ ইনিংসে।

৫. ঝড়ের বেগে হাজারে

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এক পঞ্জিকাবর্ষে ১ হাজার রান ছোঁয়ার ঘটনা ক্রিকেট এখনও পর্যন্ত দেখেছে ৯১৮টি। সবচেয়ে কম ইনিংস খেলে এই মাইলফলক ছুঁয়েছেন কোহলি। ২০১৮ সালে মাত্র ১১ ইনিংস খেলেই তিনি পা রাখেন হাজারে। হাশিম আমলার ১৫ ইনিংস ছিল আগের রেকর্ড।

৬. নেতার ধারাবাহিকতা

অধিনায়ক হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে টানা তিন পঞ্জিকাবর্ষে দুই হাজার রান স্পর্শ করার একমাত্র কীর্তি কোহলির। ২০১৭, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে তিনি পেরিয়েছেন দুই হাজার।

নেতৃত্বে এক পঞ্জিকাবর্ষে তিনবার দুই হাজার রান করার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন আর কেবল রিকি পন্টিং। তবে তিনি পারেননি পরপর তিন বছরে করতে। সাবেক অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক করেছিলেন ২০০৫, ২০০৬ ও ২০০৯ সালে।

৭. সফল অধিনায়ক

২০১৪-১৫ মৌসুমে অস্ট্রেলিয়া সফরের মাঝপথে মহেন্দ্র সিং ধোনি আচমকাই টেস্ট থেকে বিদায় নিলে নেতৃত্ব পান বিরাট কোহলি। পরে সেই ধোনিকেই ছাড়িয়ে কোহলি হয়ে উঠেছেন ভারতের সফলতম টেস্ট অধিনায়ক।

কোহলির নেতৃত্বে ৫৫ টেস্টে এখনও পর্যন্ত ৩৩ টেস্ট জিতেছে ভারত। অধিনায়ক ধোনির ৬০ টেস্টে জয় ছিল ২৭টি।

দেশের বাইরে সাফল্যেও সবার ওপরে কোহলি। তার অধিনায়কত্বে বিদেশে ১৩ টেস্ট জিতেছে ভারত। সৌরভ গাঙ্গুলির নেতৃত্বে ঘরের বাইরে জয় ছিল ১১ টেস্টে।

৮. নেতৃত্বে শতরান

অধিনায়ক হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি সেঞ্চুরি কোহলির, ৪১টি। এই রেকর্ডে অবশ্য আপাতত তিনি যৌথভাবে শীর্ষে রিকি পন্টিংয়ের সঙ্গে।

তবে অধিনায়ক পন্টিং ৪১ সেঞ্চুরি করেছেন ৩৭৬ ইনিংসে, কোহলি ২১০ ইনিংসেই।

৯. দুইশর চার অধ্যায়

টেস্ট ক্যারিয়ারে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরির স্বাদ পেতে ৫ বছরের বেশি সময় লেগেছে কোহলি। তবে প্রথমটির পর ডাবল সেঞ্চুরি এসেছে একের পর এক। ২০১৬ ও ২০১৭ মিলিয়ে টানা চার সিরিজে করেছিলেন চারটি ডাবল সেঞ্চুরি। টেস্ট ইতিহাসে আর কারও নেই এই কীর্তি।

কোহলির টানা চার দুইশ ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউ জিল্যান্ড, ইংল্যান্ড ও বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজে।

কোহলির আগে টানা তিন সিরিজে ডাবল সেঞ্চুরির রেকর্ড ছিল স্যার ডন ব্র্যাডম্যান ও রাহুল দ্রাবিড়ের।

১০. গতিময় নেতা

অধিনায়ক হিসেবে টেস্ট ও ওয়ানডে, দুটিতেই দ্রুততম ৫ হাজার রানের রেকর্ড কোহলির।

টেস্টে এই মাইলফলক ছুঁয়েছেন ৮৬ ইনিংসে। ৯৭ ইনিংসের আগের রেকর্ড ছিল রিকি পন্টিংয়ের।

ওয়ানডেতে এই রেকর্ডে কোহলি ছাড়িয়েছেন তার পূর্বসূরী মহেন্দ্র সিং ধোনিকে। ৮২ ইনিংস লেগেছে কোহলির, ধোনির লেগেছিল ১২৭ ইনিংস।

১১. জুটির শিরোমণি

ওয়ানডেতে সবচেয়ে বেশি ডাবল সেঞ্চুরি জুটিতে অংশীদার কোহলি। রোহিত শর্মার সঙ্গে গড়েছেন তিনি ৫টি দুইশ রানের জুটি!

এই রেকর্ডের দুইয়েও আছে কোহলির নাম। গৌতম গম্ভিরের সঙ্গে তার ডাবল সেঞ্চুরি জুটি হয়েছে ৩টি।

পাশাপাশি তিনটি করে দ্বিশতক জুটি আছে শচিন টেন্ডুলকার-সৌরভ গাঙ্গুলি, মাহেলা জয়াবর্ধনে-উপুল থারাঙ্গা জুটির।

১২. প্রতিপক্ষের যম

ওয়ানডেতে কোনো এক প্রতিপক্ষের বিপক্ষে সবচেয়ে বেশি সেঞ্চুরির যৌথ রেকর্ড কোহলির। এখানে তার সঙ্গী শচিন টেন্ডুলকার। কোহলি ৯টি সেঞ্চুরি করেছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে, টেন্ডুলকার অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে।

এছাড়া অস্ট্রেলিয়া ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এখনও পর্যন্ত ৮টি করে সেঞ্চুরি করেছেন কোহলি।

ভিন্ন দুই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে টানা তিন ম্যাচে সেঞ্চুরির অনন্য কীর্তিও আছে কোহলির। ২০১২ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে করেছিলেন টানা তিন সেঞ্চুরি। ২০১৭ ও ২০১৮ মিলিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করেছিলেন টানা চার ম্যাচে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *