|| নজরুল ইসলাম বকসী ||

বঙ্গবন্ধুর খুনী মেজর বজলুল হুদা ১৯৮৭ সালের ২৯ এপ্রিল অতি গোপনে কক্সবাজার বেড়াতে আসেন। তার আগমনের তিনদিন আগে আমি বিশ্বস্ত সূত্রে খবরটি জানতে পারি এবং এনিয়ে আমার সমমনা তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা কক্সবাজার আদালতের বর্তমান পিপি ফরিদুল আলমের সাথে সন্তর্পণে আলাপ করি। ফরিদুল আলমও তার সমমনা আরো দুইজনের সাথে বিষয়টি আলাপ করেন। আমরা এই চারজন তরুণ (দুইজনের নাম আমি জানিনা, ফরিদ ভাই জানেন) একমত হলাম ৩০ এপ্রিল মেজর হুদা তার এক সঙ্গী সহ সৈকতে সমুদ্র স্নান করতে গেলে তাদের উপর আমরা সশস্ত্র হামলা করবো এবং অন্তত মেজর হুদাকে হত্যা করবো। তরুণ বয়েসী বিপ্লবীরা ন্যায় অন্যায় কমই চিন্তা করে এবং পরিণতি কি হতে পারে তা অনেকটাই ভাবেনা। ফলে ২৯ এপ্রিল রাতেই আমরা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র জোগাড় করে রাখলাম।

রাতে ঘুম আসছিলনা। চরম উত্তেজনায় রাত যেন কাটছেইনা। গভীর রাতে হঠাৎ মনে হলো যদি আমরা ঘটনা ঘটিয়ে ফেলি তখনতো আমাদের বিরুদ্ধে মামলা মোকদ্দমা হবে। আর এজন্য আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দ ও অভিজ্ঞ আইনজীবীর প্রয়োজন হবে। তাই পরদিন ৩০ এপ্রিল সকাল ৯ টায় বিশিষ্ট আইনজীবি এডভোকেট জহিরুল ইসলামের সাথে কথা বলার মনস্হির করলাম।

অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম এসময় কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তিনি আমাকে ‘বিদগ্ধ বঙ্গবন্ধু ভক্ত’ উপাধি দিয়েছিলেন। তাকে আমি সীমাহীন পছন্দ করতাম ও অগাধ আস্থা রাখতাম। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তখন তিনি নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

পরদিন সকালে আমি বার লাইব্রেরিতে যাই। বার লাইব্রেরির উত্তর পাশে কয়েকটি কাঠের কামরা ছিল। তারই একটাতে তিনি আর আমি একান্তে বসলাম। আমার নিরুদ্বিগ্ন সহজ ভাষায় তাকে বজলুল হুদাকে হত্যার পরিকল্পনার কথা বলি, যা শুনে তিনি চমকে উঠলেন— যেন তিনি আকাশ থেকে পড়েছেন। কিছুক্ষণ আমার দিকে চেয়ে থাকলেন এবং ক্রমেই গম্ভীর হয়ে উঠলেন। বললেন— এধরনের উদ্ভট চিন্তা তোমাদের মাথায় কে ঢুকিয়ে দিয়েছে। আমি বললাম কেউ দেয়নি, আমরাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং আমরা তা করবোই। তখন খুব ভারী ও শীতল কণ্ঠে কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি বললেন— করলে করতে পারো তবে এব্যাপারে আওয়ামীলীগ বা আমার পক্ষ থেকে তোমরা কোন সহযোগিতা পাবেনা।

তিনি বললেন আওয়ামীলীগ সম্পূর্ণরূপে একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। এই দল সন্ত্রাসে বিশ্বাস করেনা। আওয়ামীলীগ সশস্ত্র আন্দোলন বা হঠকারী পন্থায় ক্ষমতায় আসতেও চায় না। আওয়ামীলীগ জনগনের ম্যান্ডেট নিয়েই একদিন ক্ষমতায় আসবে এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার উপযুক্ত বিচার করবে। তাই আমার (এড. জহির সাহেব ) অনুরোধ এবং নির্দেশ তোমরা কোন হঠকারী পদক্ষেপ গ্রহন করোনা। এতে তোমাদের ক্ষতি হবে, আওয়ামীলীগের ক্ষতি হবে।

জহির সাহেবের কথায় আমার মনে কিছুটা অস্থিরতা আসলো এবং আমি ফিফটি পার্সেন্ট হতাশ হয়ে গেলাম। এদিকে সকাল ১১ টায় হুদাদের সাগরপারে যাওয়ার কথা। আমি তাড়াতাড়ি ফরিদ ভাইয়ের কাছে গেলাম। গিয়ে শুনলাম আমাদের মধ্যে সবচেয়ে ইম্পর্টেন্ট ব্যক্তি যে সে নাকি ইমার্জেন্সি চট্টগ্রাম চলে গেছে । কথাটি আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না। সম্ভবত সে ভয় পেয়েছে তাই পিছু হটেছে।

দুইদিক থেকে হতাশার কারণে সম্পূর্ণ পরিকল্পনাটাই বাতিল করতে হলো। কিন্তু তারপরও অদম্য কৌতুহল দমন করতে পারলামনা। সকাল ১১ টায় একাই আমি খালি হাতে চুপিচুপি সাগরপাড়ে গেলাম। তখন শুধু লাবনী পয়েন্টই ছিল পর্যটকদের গোসল করার স্থান। সাগরপাড়ে তখন তেমন ভীড় হতোনা। সেখানে গিয়ে দেখলাম মূল পয়েন্ট থেকে একটু দক্ষিণে নির্জন স্থানে দুইজন লোক অল্প পানিতে সাঁতার কাটছেন। দুইজনেরই পরনে সাদা হাফপেন্ট। আমি বালির উপর দিয়ে আনমনা হয়ে দক্ষিণ দিকে হেঁটে যাচ্ছিলাম এবং কাছাকাছি গিয়ে একজনকে চিনতে পারলাম যার নাম বজলুল হুদা। কারণ তাকে আগে না দেখলেও তার অসংখ্য ছবি আমি দেখেছি।

ঐদিন বেলা ৩ টায় বজলুল হুদার সাথে আমার দেখা করার একটা কর্মসূচি আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। ফ্রীডম পার্টিতে যোগদান করার কথা বলে এই প্রোগ্রাম করেছিলাম। নতুবা হুদার কক্সবাজার সফরের খবরাখবর আমার পক্ষে জানা সম্ভব হতোনা।

ঠিক বেলা আড়াইটায় বজলুল হুদার একজন বিশ্বস্ত লোক খুরুস্কুলের মাওলানা আব্দুল আউয়ালের সাথে আমি হোটেল সায়মনের (বাহারছড়া) ৩০২ নাম্বার রুমে যাই। মূলতঃ মাওলানা আব্দুল আউয়ালের মাধ্যমেই আমি এই সাক্ষাতের প্রোগ্রামটি করেছি এবং তার কাছ থেকেই হুদাদের কক্সবাজার আসার নিশ্চিত খবর গুলো সংগ্রহ করেছি।

রুমে গিয়ে দেখলাম মেজর হুদা জোহরের নামাজ পড়ছেন এবং অন্য লোকটি তাকে পাহারা দিচ্ছেন। পরে জানলাম তার নাম ফারুক আহমদ (খুনী ফারুক নয়)। নামাজ শেষে কুশল বিনিময় হলো এবং অল্প কথার পরে আমরা চলে আসতে চাইলে তারাও বললো এক্ষুণি তারা ঢাকা চলে যাবেন। নীচে এসে তাদের অনুরোধে তাদেরই সাদা পাজেরোতে আমরা উঠলাম। আমি ড্রাইভারের পাশে বসেছিলাম আর ভাবছিলাম— এই গাড়িতেই একটি হ্যাণ্ডগ্রেনেড রাখা যেতো। লালদীঘির পার এসে আমি আর মাওলানা আব্দুল আউয়াল গাড়ি থেকে নেমে গেলাম এবং পূর্বদিকে যতদূর দেখা যাচ্ছিল গাড়িটির দিকে চেয়ে থাকলাম।

অত্যন্ত গোপনীয় ও আইনশৃঙ্খলা সম্পর্কিত বিষয়টি অনেক আগেই লিখতে চেয়েছিলাম কিন্তু পরিবেশগত কারণে লেখা সম্ভব হয়নি। ভেবেছিলাম এডভোকেট জহিরুল ইসলাম সাহেব বেঁচে থাকতেই লিখবো ; যেন কারো প্রশ্ন না আসে কিন্তু হয়ে উঠেনি। তবে লেখায় উঠে আসা পিপি ফরিদুল আলম ও খুরুস্কুলের মাওলানা আব্দুল আউয়াল এখনো বেঁচে আছেন। একজন আমার পরিকল্পনার পক্ষের মানুষ ফরিদুল আলম, অন্যজন আমাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে মোটেই জানতেননা এখনো জানেননা তিনি মাও. আব্দুল আউয়াল। ফ্রীডম পার্টিতে নেয়ার উদ্দেশ্যে সরল বিশ্বাসে তিনি আমাকে মেজর হুদার সকল তথ্য দেন এবং তার সাথে দেখা করতে হোটেল সায়মনে নিয়ে যান।

আমাদের পরিকল্পনা সফল না হলেও সেখান থেকে একটা বিষয় অনুধাবন করলাম যে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামীলীগ একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সংগঠন। তারা সন্ত্রাসের মাধ্যমে বা হঠকারী পদ্ধতিতে কোন কিছু অর্জন করতে চায় না। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়েই ন্যায় সংগত ভাবে ক্ষমতা অর্জন করতে চায়। যেমন করেছিল ১৯৯৬ সালে। ক্ষমতায় এসেই প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে মেজর হুদা সহ বঙ্গবন্ধুর খুনিদের মৃত্যুদণ্ড প্রদান এবং তা কার্যকর করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *