কক্সবাজারের কিংবদন্তিতুল্য রাজনীতিবিদ অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম (৮৫) এর মরদেহ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় আজ মঙ্গলবার বিকেলে শহরের বইল্যাপাড়া কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। তাঁর বাবা আলহাজ্ব আশরাফ মিয়া এবং মা খুইল্লা বিবির কবরের পাশে শায়িত করা হয়।

গতকাল সোমবার দুপুরে চট্টগ্রামে অসুস্থ অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলামের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বাণী দিয়েছেন।

প্রয়াত অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম ছিলেন আজীবন সৎ এবং স্বচ্ছ রাজনীতির পথিকৃৎ, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠকক, সাবেক সংসদ সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক নির্বাহী সদস্য, সাবেক মহকুমা গভর্নর এবং কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, ৩ পুত্র ও ৩ কন্যাসহ অগণিত আত্নীয়-স্বজন রেখে গেছেন।

আজ জোহরের নামাজের পর কক্সবাজার বায়তুশ শরফ মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রয়াত রাজনীতিককে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয়া হয়। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সীমিত পরিসরে নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

মঙ্গলবার (১৯ মে) বেলা আড়াইটার দিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ‘গার্ড অব অনার’ দেয়া হয় বীর এই মুক্তিযোদ্ধাকে। মৃতদেহের খাটিয়ায় দেশের জাতীয় পতাকা দেয়া হয়। এর কিছুক্ষণ পর নামাজে জানাযা শেষে কক্সবাজার শহরের বইল্যাপাড়া কবরস্থানে মরদেহ দাফন করা হয়।

এর আগে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন ও পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেনের উপস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় ভাবে সম্মান জানানো হয়। এতে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।

করোনাভাইরাসের কারণে জেলার বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদের জানাযায় মানুষের উপস্থিতি তেমন বাড়তে দেয়নি প্রশাসন। পরিবারের পক্ষ থেকেও ছোট পরিসরে জানাযার প্রদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল। সে মোতাবেক বায়তুশ শরফ জামে মসজিদের জানাযার মাঠে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, আপনজন ও গুটিকয়েক শীর্ষ নেতাকর্মী ছাড়া বাইরের কাউকে ঢুকতে দেয়া হয়নি। কক্সবাজার সদর মডেল থানা পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ কড়াকড়ি লক্ষ্য করা গেছে।

জানাজার পূর্বে সংক্ষিপ্তভাবে মরহুমের স্মৃতিচারণ করা হয়। এ সময় কক্সবাজারের সাংসদ সাইমুম সরওয়ার কমল, সাংসদ আশেক উল্লাহ রফিক, জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন, পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান লে. কর্নেল (অব) ফোরকান আহমেদ, কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা, কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র ও কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লিগ সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান, বাইতুশ শরফ কমপ্লেক্সের মহাপরিচালক সিরাজুল ইসলাম, কক্সবাজার আইনজীবী সমিতির সভাপতি আ জ ম মঈন উদ্দিন এবং অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলামের দুই ছেলে জাহেদুল ইসলাম ও রাশেদুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এসময় বক্তারা বলেন, জহিরুল ইসলাম কক্সবাজারের রাজনীতি ছাড়াও জাতীয় পর্যায়েও রাজনীতি করেছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় এমপি ছিলেন। ব্যক্তিজীবনে অত্যন্ত সাদা অন্তরের মানুষ ছিলেন তিনি। জীবনে কোন মানুষকে খারাপ আখ্যা দেননি তিনি। সবসময় ইতিবাচক মনোভাবের মানুষ ছিলেন।

তারা বলেন, কক্সবাজার ছাড়া জাতীয় রাজনীতি করলেও জীবনে কখনো সম্পদ তৈরি করেননি। বায়তুশ শরফ মসজিদ সংলগ্ন এই বাড়ি ছাড়া আর কিছুই অর্জন করেননি। সবসময় মনে করতেন কক্সবাজারবাসীই তাঁর সম্পদ। তার মৃত্যুতে কক্সবাজারের যে শুন্যতা দেখা দিয়েছে তা কখনো পূরণ হবে না।

কক্সবাজারের অন্যতম প্রবীণ সাংবাদিক এবং জেলা থেকে প্রথম প্রকাশিত দৈনিক কক্সবাজার এর সম্পাদক মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম প্রয়াত অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলামের জ্যেষ্ঠ ভাই।

।। অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলামের বর্ণাঢ্য জীবনের সারাংশ ।।

অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম। তিনি পেশায় একজন আইনজীবী এবং আদর্শিক চেতনার একজন রাজনীতিবিদ। ১৯৬৪-তে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় তিনি আওয়ামী রাজনীতির সাথে জড়িত হন মহকুমা আওয়ামীলীগ থেকে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক এবং বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য হিসেবে ১৯৯৩ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭০ এর চকরিয়া-কুতুবদিয়া সংসদীয় আসন থেকে আওয়ামীলীগের সংসদ সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হন এবং সংবিধান প্রনয়ন কমিটির সদস্য হিসাবে কাজ করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাকশাল পদ্ধতির প্রবর্তন করলে এডভোকেট জহিরুল ইসলামকে কক্সবাজার জেলার গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেন।

অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন স্বনামধন্য আইনজীবী। তিনি এদেশের প্রথিতযশা রাজনীতিবিদদেরও অন্যতম ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিল এর সদস্য ছিলেন। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে তিনি সমাজের ভাঙ্গা-গড়া দেখেছেন, সামাজিক উন্নয়নের কথা ভেবেছেন এবং দেশ ও জাতির সমৃদ্ধির লক্ষ্যে নিবেদিত সমাজকর্মী হিসেবে কর্মমুখর জীবনযাপন করেছেন। প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ দীর্ঘকাল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। পাকিস্তান আমলে ষাট-এর দশকে বাঙালী জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থানের কালে বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে তার রাজনীতির হাতেখড়ি। ষাট এর দশকে নিজ যোগ্যতায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়েও নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি আকর্ষণীয় বাচনভঙ্গিমার অধিকারী, রাজনৈতিক মহলে সুবক্তা হিসেবেও তিনি খ্যাত ছিলেন।

তিনি গতকাল ১৮ এপ্রিল দুপুর ২.৪৫ মিনিটে ইন্তেকাল করেন। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম এর মৃত্যু তে শোক প্রকাশ করেন। বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সম্পাদক ড.হাসান মাহমুদ ও প্রচার সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া মরহুমের মৃত্যতে শোক প্রকাশ করেন এবং শোক সন্তপ্ত পরিবার পরিজনদের প্রতি সমবেদনা জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *