করোনা মহামারীর কারণে চলতি বছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশে নেমে আসবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

এর আগে সংস্থাটি চলতি বছর দেশে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল। তবে ২০২১ সালে তা বেড়ে সাড়ে ৯ শতাংশ হবে বলে মনে করে আইএমএফ। ২০২১ সালের পূর্বাভাসটি নির্ভর করছে করোনাভাইরাসের বিস্তার কমে যাওয়ার পাশাপাশি অর্থনীতিতে স্বাভাবিক গতি ফিরে আসার ওপর।

আইএমএফের ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক ২০২০, দ্য গ্রেট লকডাউন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বিভিন্ন দেশের ২০২০ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধির এ পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। এটি মঙ্গলবার রাতে প্রকাশিত হয়েছে। ৭ এপ্রিল পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে আইএমএফ পঞ্জিকাবর্ষ ধরে জিডিপির পূর্বাভাস দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের যৌথ বসন্তকালীন ভার্চুয়াল বৈঠক উপলক্ষে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

এর আগে গত রোববার বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ২ থেকে ৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এর আগে বলেছে, করোনার কারণে বাংলাদেশের জিডিপির দশমিক ২ শতাংশ থেকে দশমিক ৪ শতাংশ ক্ষতি হতে পারে।

দ্য ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিট মনে করে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের নিচে নেমে আসতে পারে। অবশ্য এসব সংস্থা অর্থবছরের হিসাবে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে। গত অর্থবছরে বাংলাদেশে ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল অবশ্য বলেছেন, চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি কোনোভাবেই ৬ শতাংশের কম হবে না।

আইএমএফের পূর্বাভাস অনেকটাই বাস্তবসম্মত উল্লেখ করে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ২ কিংবা ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে কিনা সেটি না বললেও এটুকু বলতে চাই প্রবৃদ্ধি অনেক কমে যাবে। কেননা রফতানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হবে।

পোশাক খাতে ইতিমধ্যেই অনেক অর্ডার বাতিল বা স্থগিত হয়ে গেছে। এছাড়া রেমিটেন্স অনেক কমে যাবে। উৎপাদন খাতের মধ্যে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে বড় ধাক্কা লেগেছে। কৃষি খাতেও সমস্যা আছে। সব মিলিয়ে প্রবৃদ্ধি কমবে।

আইএমএফ বলছে, ‘করোনা মহামারীর কারণে বিভিন্ন দেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ মারা যাচ্ছে। এ কারণে ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে আইসোলেশন, লকডাউন করতে হচ্ছে, যা বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। যদি চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে এই ভাইরাসের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আনা যায় এবং অর্থনীতির গতি স্বাভাবিক হয়, তবে আগামী বছর প্রবৃদ্ধি বাড়বে।’

আইএমএফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরে বিশ্বের গড় জিডিপি আগের বছরের চেয়ে কমে যাবে। ২০২০ সালে তা ৩ শতাংশ নেতিবাচক হয়ে যাবে। অর্থনীতি স্বাভাবিক অবস্থায় গেলে ২০২১ সালে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ হবে।

করোনাভাইরাসের কারণে ২০২০ সালে বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশগুলো ভুগবে বলে মনে করছে আইএমএফ। সংস্থাটির পূর্বাভাস হল, প্রায় সব দেশের প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হয়ে যাবে। যেমন যুক্তরাষ্ট্র (মাইনাস ৫ দশমিক ৯ শতাংশ), জার্মানি (মাইনাস ৭ শতাংশ), জাপান (মাইনাস ৫ দশমিক ২ শতাংশ), যুক্তরাজ্য (মাইনাস সাড়ে ৬ শতাংশ), কানাডা (মাইনাস ৬ দশমিক ২ শতাংশ), ব্রাজিল (মাইনাস ৫ দশমিক ৩ শতাংশ) ও রাশিয়া (মাইনাস সাড়ে ৫ শতাংশ)। তবে চীনের ১ দশমিক ২ শতাংশ ও ভারতে ১ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে।

সংস্থাটি বলছে, এটা এখন স্পষ্ট যে, ১৯৩০-এর দশকের মহামন্দার পর সবচেয়ে ভয়াবহ মন্দার সামনে দাঁড়িয়ে পৃথিবী। এটা এক দশক আগের অর্থনৈতিক সংকটকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে। এই লকডাউন বিশ্বের প্রবৃদ্ধির রাশ নাটকীয়ভাবে টেনে ধরবে।

আইএমএফের প্রধান অর্থনীতিবিদ গীতা গোপীনাথ বলেন, এই সংকটে বিশ্ব আগামী দুই বছরে ৯ ট্রিলিয়ন ডলার প্রবৃদ্ধি হারাবে, এই অঙ্ক জার্মানি ও জাপানের মতো দুই শিল্পোন্নত দেশের মোট জিডিপির পরিমাণের চেয়েও বেশি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *