আমাদের সময়কালেই ভালোবাসা প্রকাশের মাধ্যম চোখের সামনে কীভাবে বদলে গেল। বই আদান–প্রদানের নামে ভেতরে চিঠি-চালাচালি ছিল কার্যকর পদ্ধতি। এরপর এল ল্যান্ডফোন আর তারপর মুঠোফোন। খুদে বার্তা পেরিয়ে এখন তো ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামের যুগ। মাধ্যমের বিবর্তন যা-ই হোক, ভালোবাসার আবেগের প্রকাশ ঘটবেই, থাকবে গান, থাকবে কবিতা।

ভালোবাসা নিয়ে কথা বলব ভাবতেই মনে পড়ে গেল রবীন্দ্রনাথ অনুবাদিত জন ডান:

দোহাই তোদের, একটুকু চুপ কর্‌​।

ভালোবাসিবারে দে আমারে অবসর।

ভালোবাসা নিয়ে কথা বলে কোলাহল তৈরি না করে ভালোবাসবার একটু অবসর দেওয়া ভালো। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়ই বলি:

তুমি একটু কেবল বসতে দিয়ো কাছে

আমায় শুধু ক্ষণেক–তরে।

আজি হাতে আমার যা–কিছু কাজ আছে

আমি সাঙ্গ করব পরে।

না চাহিলে তোমার মুখপানে

হৃদয় আমার বিরাম নাহি জানে,

কাজের মাঝে ঘুরে বেড়াই যত

ফিরি কূলহারা সাগরে॥

কথা না বলে একটুখানি অবসর বের করে নেওয়া ভালো, তার পাশে গিয়ে বসা ভালো, হাতের যা কাজ আছে, তা না হয় পরে করা যাবে, তার মুখের দিকে না তাকালে যেকোনো কাজই করা হয়ে উঠবে না।

আহা, এই হাহাকার, এই বেদনা, এই মন কেমন করা অনুভবের নামই তো প্রেম! এর নামই তো ভালোবাসা! না, এত ছোট করে কি বলা যাবে, ভালোবাসা কারে কয়! তা যদি বলে ফেলাই যেত, তাহলে হাজার হাজার বছর ধরে এত গান, এত কাব্য, এত চিত্রকলা, এত চলচ্চিত্র কেন বানানো হচ্ছে, তারপরেও তো আশ মিটছে না, সাধ মিটছে না, জানা হচ্ছে না, ভালোবাসা কী!

মানুষ চিরটাকাল কি ভালোবেসে গেছে? নীরদ সি চৌধুরী বলেছিলেন, বাঙালি নাকি আগে ভালোবাসতে জানত না, তার ছিল শুধুই শরীর। বঙ্কিমচন্দ্র প্রথম বাঙালিকে রোমান্টিকতা, প্রেম, ভালোবাসা ইত্যাদি শিখিয়েছেন। আজ তর্ক করব না; কারণ আজ তর্ক করবার দিন নয়, আজ ভালোবাসবার অবসর খুঁজবার দিন।

তবে চিরটাকাল একজন মানুষ আরেকজন মানুষের কাছে, নারী তার পুরুষের কাছে, পুরুষ তার নারীর কাছে হৃদয়ের আকুতি পৌঁছে দিতে চেয়েছে। লিখেছে প্রেমপত্র।

খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০ সালে লেখা সং অব সলোমন-এ পাই:

‘দেখো হে ভালোবাসা, আমার ভালোবাসা, তুমি তো সুন্দর

দেখো হে ভালোবাসা, আমার ভালোবাসা

তোমার চোখ দুটি যেনবা কবুতর।’

কৃষ্ণের স্ত্রী রুক্মিণী কৃষ্ণকে লিখেছিলেন:

‘ও বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর, আমি আপনার গুণের কথা শুনেছি। আপনি যাদের কথা শুনেছেন, আর যাদের কর্ণকুহর দিয়ে আপনি প্রবেশ করেছেন, তাদের দেহকষ্ট চিরদিনের জন্য লাঘব হয়ে গেছে। যাদের চোখ আছে, যারা চোখ দিয়ে আপনার অপরূপ রূপ দেখতে পেয়েছে, তারা খুঁজে পেয়েছে তাদের জীবনের পরিপূর্ণ মানে। আর তাই আমি আপনাতে আমার হৃদয় অলজ্জিতভাবে সম্পূর্ণরূপে নিবেদিত করেছি, হে অচ্যুত।’

কালিদাসের কাল আনুমানিক খ্রিষ্টের জন্মের সাড়ে তিন শ বছর পরে। মেঘদূত–এ কালিদাস যক্ষের মনের আকুতি জানাচ্ছেন মেঘকে, মেঘ যেন তা বয়ে নিয়ে যায় তাঁর প্রেমিকার কাছে। সেই প্রেমিকা কেমন?

‘তন্বী, শ্যামা, আর সূক্ষ্মদন্তিনী নিম্ননাভি, ক্ষীণমধ্যা,

জঘন গুরু বলে মন্দ লয়ে চলে, চকিত হরিণীর দৃষ্টি

অধরে রক্তিমা পক্ক বিম্বের, যুগল স্তনভারে ঈষৎ-নতা,

সেথায় আছে সে-ই, বিশ্বস্রষ্টার প্রথম যুবতীর প্রতিমা। (অনুবাদ: বুদ্ধদেব বসু)

নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ১৭৯০-এ এসে তাঁর প্রথম স্ত্রী জোসেফিনকে লিখছেন:

একবারে ভালোবেসে—যদি ভালোবাসিতে চাহিতে তুমি সেই ভালোবাসাএকবারে ভালোবেসে—যদি ভালোবাসিতে চাহিতে তুমি সেই ভালোবাসা‘কিছুদিন আগে আমি ভাবতাম যে আমি তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু শেষবার তোমাকে দেখার পর আমার মনে হচ্ছে আমি তোমাকে ভালোবাসি এক হাজর গুণ বেশি। আমি যতই তোমাকে জানছি, তত বেশি করে তোমার পূজা করছি, তাহলে দেখা যাচ্ছে ওই প্রবাদটা ঠিক নয় যে ভালোবাসা প্রথম দেখাতেই শুরু হয়!’

১৮১২ সালের বিটোফেনের চিঠিটা বিশ্ববিখ্যাত আর চিরঞ্জীব। তাঁর অমর প্রেমাস্পদকে (সম্ভবত জোসেফাইন ব্রুনসভিক) তিনি লিখেছিলেন:

‘এমনকি আমার শয্যায় আমার ভাবনাগুলো তোমার জন্য আর্তনাদ করে, ও আমার অমর প্রেমাস্পদ, এখানে ওখানে সানন্দে, আবার দুঃখের সঙ্গে, বিধি কি সে আর্তি শুনতে পাবেন! আমি কেবল তোমাকে নিয়েই বাঁচতে পারি, তা না হলে বাঁচতে পারি না।’

হলিউডের কিংবদন্তী তারকা মেরিলিন মনরো লিখেছিলেন তাঁর প্রেমিক ও দ্বিতীয় স্বামী জো ডিম্যাগিওকে:

‘আমি জানি না কেমন করে এ কথা তোমাকে বলব যে আমি তোমাকে কতটা মিস করছি। আমার হৃদয় বিস্ফোরিত না হওয়া পর্যন্ত আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমার সমস্ত ভালোবাসা, আমার সমস্ত চাওয়া, আমার যা দরকার—তা হলো তুমি, চিরদিন। তুমি যেখানে চাও আর যেভাবে চাও, আমি সেখানে সেভাবে থাকতে চাই।’

আমাদের জীবদ্দশায় ভালোবাসা প্রকাশের মাধ্যম চোখের সামনে কীভাবে বদলে গেল! বই আদান–প্রদানের নামে ভেতরে চিঠি চালাচালি ছিল সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। আর হাতচিঠি পৌঁছে দিতে গিয়ে হয়তো পত্রলেখক নয়, পত্রবাহকের সঙ্গেই হয়ে যেত প্রেম।

এ নিয়ে একটা বিদেশি কৌতুক আছে, যা অবলম্বন করে আমি গল্প এবং নাটক লিখেছিলাম।

ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। এক ছেলে প্রেমে পড়ল এক মেয়ের। ছেলেটি মেয়েটিকে এক শুভক্ষণে বলল, যদি রাজি থাকো, বাকি সারাটা জীবন আমি থাকব তোমার! সাড়া দিয়ো।

ছেলেটি অপেক্ষা করে। মেয়েটি কিছু বলে না।

৩০ বছর পর দুজনের দেখা। দুজনেরই চুল গেছে পেকে। প্রবীণ বললেন প্রবীণাকে, তোমাকে যে আমি প্রপোজ করেছিলাম। তুমি উত্তর দাওনি কেন?

মেয়েটি বলল, তোমাকে যে আমি ইঞ্জিনিয়ারিং মেকানিকস বইটি দিয়েছিলাম, তুমি সেটা খুলেছিলে?

না তো। খুলিনি। আমি সব সময় নোটবই পড়েছি। কোনো দিনও মূল বই খুলিনি।

আহা, যদি একবার খুলতে…

কেন?

এই বইয়ের ভেতরে আমি তোমাকে চিঠি দিয়েছিলাম…

আমার নিজের কবিতার বই খোলা চিঠি সুন্দরের কাছে ছেলেটি দিয়েছিল মেয়েটিকে, তারপর তাদের প্রেম হয়ে গেছে, তারপর আমার কাছে এসেছেন দুজনই, বিয়ের আমন্ত্রণপত্র নিয়ে, এই রকম অন্তত দুবার ঘটেছে!

তারপর এল ল্যান্ডফোন। মা-বাবার সতর্ক প্রহরা। মেয়ে যেন আড়ালে–আবডালে কথা কইতে না পারে। মনিকা, মনিকা, আজকে তোমাকে যা লাগছিল না! আমি মনিকা না, মনিকার খালা! সরি আন্টি…

এরপর এল মোবাইল ফোন। প্রথমে টেক্সট মেসেজ। এরপর? উফ, ই–মেইল, চ্যাট, ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, স্ন্যাপচ্যাট…

বাবু তুমি খাইসো!

মুঠোফোনের কাব্য লিখে ফেললেন নির্মলেন্দু গুণ:

তাড়া দিয়ো না, নাড়া দিয়ো না।

চুপ করে থাকো মেয়ে।

Hold your body

and let me love.

মনে করো তুমি লতা,

উঠছ চীনের দীর্ঘ-প্রাচীর বেয়ে।

কাজের সময় কোনো কথা নয়।

চুপ করে থাকো মেয়ে।

এখন নিজের মনের কথা প্রকাশ করা সহজ হয়ে গেছে। আমরা বড় হয়েছিলাম নারীবর্জিত পৃথিবীতে, রবীন্দ্রনাথের এই যুগ বাসি হয়ে গেছে। এখন কি আর মনের কথা প্রকাশের জন্য কবিতার কাছে যেতে হবে, উপন্যাস থেকে লাইন উদ্ধৃত করতে হবে? চিঠিতে ফুলের পাপড়ি দিতে হবে?

ভার্চ্যুয়াল প্রেম যেমন প্রেম নয়, ভার্চ্যুয়াল চিঠিও হয়তো চিঠি নয়। তাই আজও একজন আরেকজনকে বলে, একটা চিঠি লিখো। নিজ হাতে লিখে আমাকে পাঠিয়ো।

তাই আজও হয়তো ইংরেজি মাধ্যমে পড়া কিশোর–কিশোরীটিও অর্ণবের কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না’ শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে! কৃষ্ণকলির কণ্ঠে শোনে ‘চোখ জ্বলে যায় দেখব তারে।’ নাকি আর্টসেলের লিংকনের গান শোনে, ‘এই বৃষ্টিভেজা রাতে তুমি নেই বলে সময় আমার কাটে না’?

আর আমরা যারা প্রবীণ, তাঁরা হয়তো রবীন্দ্রনাথেই মনের কথা খুঁজি। না হলে আছেন জীবনানন্দ দাশ:

একবারে ভালোবেসে—যদি ভালোবাসিতে চাহিতে তুমি সেই ভালোবাসা।

আমার এখানে এসে যেতে যদি থামি!—

কিন্তু তুমি চলে গেছ, তবু কেন আমি

রয়েছি দাঁড়ায়ে!

লেখক: প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও সাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *