মকবুল আহমেদ
বাংলা ভাষায় দেশ বিদেশ নিয়ে লেখা ভ্রমন কাহিনী কম নেই। বেশিরভাগ ভ্রমন কাহিনী লেখা হয়েছে বিদেশ নিয়ে। রবীন্দ্রনাথ (রাশিয়ার চিঠি, জাপান যাত্রী, য়ুরোপ যাত্রীর ডায়রী, পশ্চিম যাত্রীর ডায়রী প্রভৃতি) থেকে একালের হাসানাত আবদুল হাই বা ফারুক মঈনউদ্দিনের লেখা যত ভ্রমন বৃত্তান্ত পাওয়া যায়- সব বিদেশ নিয়ে। সবই তাদের কর্মসূত্রে বিদেশে যাওয়া-আসার উপর ভিত্তি করেই লেখা। তবুও বিদেশের অনেক কিছু আমরা ওই সকল ভ্রমন কাহিনী থেকে জানতে পারি এবং বিচিত্র ঘটনার পরিচয় পাই, তা থেকে রস উপভোগ করতে পারি।
দেশের আনাচে-কানাচে ও বাংলাদেশের সকল জেলা ভ্রমন করে নিজের দেশকে জানা ও দেখার বাসনা থেকে দেশ ভ্রমন করেছেন এবং তা আবার সাইকেলে চড়ে, তা নিয়ে লেখা ভ্রমন কাহিনী এই প্রথম আমার পড়ার সুযোগ হলো। সাইকেলে চড়ে বাংলাদেশ ভ্রমন হয়তো আরো অনেকে করেছেন কিন্তু সেই ভ্রমনের রসাত্মক বিবরণ দিয়ে লেখা কোনো বই প্রকাশ হয়েছে কিনা তা আমার জানা নেই। সেই রকম বই প্রকাশিত হলেও তা আমার চোখে পড়ে নি। সাইকেলে চড়ে বাংলাদেশের সকল জেলা ভ্রমন করে ভ্রমনকারী সেখানে থেমে থাকেন নি, তিনি তা নিয়ে একটি ভ্রমন কাহিনী লিখেছেন। সেই বই নিয়েই আমার আলোচনার বিষয়। বইটির নাম ‘৬৪ জেলায় কি দেখেছি: সাইকেল ভ্রমনের রোজনামচা’, লেখকের নাম মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম। সেই বইটি পড়ে আমি ৬৪ জেলার একটা ছোঁয়া পেলাম। লেখক বিভিন্ন জেলায় গিয়ে কিভাবে পুরোনো বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করেছেন, কিভাবে রাত্রিযাপন করেছেন, কিভাবে রাতের ও দুপুরের আহার করেছেন তার বিবরণ একটা উপভোগ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। ভ্রমনকালে পরিচিত ব্যক্তির বা তার পরিচিত ব্যক্তির সহায়তা লেখক কিভাবে কাজে লাগিয়েছেন ভ্রমনপিপাসুরা এ বই থেকে তা জানতে পারবেন।
লেখক কোনো জেলায় গিয়ে প্রথমেই তিনি জেলা প্রশাসকের সন্ধান করেছেন। ভ্রমনের শুরুতেই লেখক এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন জেলায় গিয়ে জেলা প্রশাসকের সাথে সাক্ষাত করবেন, ভ্রমনের উদ্দেশ্য তাঁকে বলবেন এবং লেখকের ডায়রীতে ডিসি-র একটা স্বাক্ষরসহ মন্তব্য লিখে নেবেন। এটা নিতে গিয়ে বিভিন্ন মনোভাবের ডিসি-র তিনি সাক্ষাত পেয়েছেন। মন্তব্য ও স্বাক্ষর নিতে গিয়ে তিনি যে সকল ডি সি-র প্রীতিকর বা অপ্রীতিকর কথাবার্তার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি তা অকোপটে তাঁর ভ্রমন কাহিনীতে সরসভাবে বর্ণনা করেছেন। কোনোখানে ডিসি-র এমন বিরূপ কথার তিনি মুখোমুখি হয়েছেন যার জন্য ডিসি-র মন্তব্য লেখা ও স্বাক্ষর সংগ্রহের আশা বিসর্জন দিতে তিনি বাধ্য হন।
লেখক যেহেতু সৌখিন ভ্রমণকারী নন, তিনি বের হয়েছেন পুরো দেশেকে জানতে, বলতে গেলে দেশের মানুষকে জানতে- তাই তাঁকে চলতে হয়েছে বেশ হিসেব করে। কম খরচে থাকা ও খাওয়া তাঁকে সবসময় মাথায় রাখতে হয়েছে। এমন কি পারলে থাকা ও খাওয়ার দায়িত্ব সরকারী প্রতিষ্ঠানের উপর নতুবা বন্ধুদের, পরিচিত জনদের কিংবা বন্ধুর বন্ধুদের উপর অর্পন করতেও চেষ্টা করেছেন। কারন লেখকের ইচ্ছে শুধু খাদ্যগ্রহণ নয়, খাদ্য-গ্রহণ ও অন্যের বাড়িঘরে জীবনযাপনের সাথে অঞ্চল ভেদে যে সংস্কৃতি মেশে থাকে তাকে পরখ করে দেখা তাঁর উদ্দেশ্য। বিখ্যাত জনের একটি কথা আছে “পাথরকে চেনা যায় তার সাঁজানো কায়দায়, আর মানুষকে চেনা যায় তার ডেরায়” (আমার জন্মভূমি- রসুল গামজাতভ)। তাই তিনি ভ্রমণকালে হোটেলের চাইতে পরিচিত বা অপরিচিত মানুষের গৃহে রাত্রিযাপন ও তাদের বাড়িতে খাদ্যগ্রহণকে বেছে নিয়েছেন।

সকল জেলায় বন্ধু থাকলেও রাত্রিযাপনের সুযোগ হয়তো সকলের সমান থাকে না। তাই লেখক কোনো জেলায় পৌঁছে প্রথমেই খোঁজ নিয়েছেন জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত ডাক-বাংলোর। অধিকাংশ জেলায় তিনি সাদরে অভ্যর্থনা পেয়েছেন। যেখানে তার সুযোগ পান নি কিংবা কোনো বন্ধুর কিংবা বন্ধুর অন্য কোনো বন্ধুর সান্নিধ্যু পাওয়া যায় নি, সেখানে তিনি সাধারণ কম খরচের হোটেলে থেকেছেন। একজন দেশপ্রেমিক ভ্রমণকারী হিসেবে জেনে অনেক হোটেল মালিকও তাঁকে বিশেষভাবে সম্মানিত করেছেন। বিশেষ করে ভ্রমনকারী লেখকের সারল্য ও সুবোধ আচরণে অনেকেই তাঁকে সহজে সাদরে গ্রহণ করেছেন।
এক জেলা থেকে আরেক জেলায় পৌঁছুতে অচেনা পথে নানা লোকের সান্নিধ্য পাওয়া, তাদের সাথে কথোপকথনের নানা বিবরণ ও নানা ঘটনার কথা বইটিতে পাওয়া যায়। জেলা সদরের বাইরে পথ-প্রান্তরের বিচিত্র নাম ও নদনদীর নাম বইতে পাওয়া যায়। সাইকেল চালিয়ে যাওয়ার পথে নানা উল্লেখযোগ্য স্থানের নাম কাগজে টুকে নিতে লেখককে হয়তো বারে-বারে থামতে হয়েছে। গ্রাম বাংলার বিভিন্ন স্থানের বিচিত্র নামের সাথে চলার পথে লেখকের দেখা নানা ঘটনার, মানুষের সাথে নানা কথাবার্তার বিবরণ বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠেছে। কোথায় কার বাড়িতে কি তরকারী দিয়ে খাওয়া-দাওয়া করে আপ্যায়িত হয়েছেন, কেমন আদর-¯েœহ পেয়েছেন তার সকল বিবরণ তিনি কোথাও বাদ দেন নি। কোনো আশ্রয় প্রদানকারী গৃহকত্রী বিদায়কালে তাঁকে টাকা দিয়েও আশীর্বাদ করেছেন।
লেখকের জন্ম, বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরে হলেও তার নিজের জেলা নরসিংদী বলে তিনি বইতে উল্লেখ করেছেন। চট্রগ্রাম-কক্সবাজারের লোক সকালের খাবার/ব্রেকফাস্ট/নাস্তা খাওয়াকে ‘নাস্ত করা’ বলে থাকেন। এই ভ্রমন কাহিনীর লেখকও নাস্তা খাওয়াকে নাস্তা করা উল্লেখ করেছেন। এতে বোঝা গেল নরসিংদীর লোকেরাও নাস্তা খাওয়াকে নাস্তা করা বলে থাকেন। তিনি দেশের পথে-প্রান্তরের নানা স্বাদের নাস্তার স্বাদ নিতে চেষ্টার ত্রুটি করেন নাই।
সাইকেল চালাতে গিয়ে পদে-পদে তাকে বিপদও মোকাবেলা করতে হয়েছে। বহু মাইল ভুল পথে চলে গিয়ে আবার ফিরে আসার কসরত তাঁকে করতে হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বিড়ম্বনায় তাঁকে পড়তে হয়েছিল আকস্মিকভাবে চাকা পাংচার হয়ে পড়ার। বিভিন্ন শহরে চাকার টিউব খুঁজতে হয়েছে কেনার জন্য। আর কারা কারা বর্তমান লেখকের পূর্বে সাইকেল নিয়ে বাংলাদেশ ভ্রমন করেছেন কিংবা আর কে কে সাইকেল নিয়ে দেশ ভ্রমন করে বই লিখেছেন বইটি পড়ে তার হদিশও পাওয়া যাবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা ইনস্টিটিউটের সামনে থেকে লেখক সাইকেলে চড়ে দেশ ভ্রমণে যাত্র শুরু করেন ২০১০ সালের ১ লা মার্চ রাতে এবং ৫৫ দিনে ৬৪ জেলা ভ্রমণ শেষ করেন কক্সবাজার জেলায় এসে। ভবিষ্যতের সাইকেল ভ্রমণকারীদের জন্য ভ্রমণ পথের এক জেলা সদর থেকে অন্য জেলা সদরের দৈর্ঘ্য ও তাঁর নিজের খরচ করা টাকার একটি বিবরণ বইয়ের শেষে লেখক দিয়েছেন। ‘৬৪ জেলায় কি দেখেছি: সাইকেল ভ্রমনের রোজনামচা’ বইটির পাঠক প্রিয়তা বোঝা যায় ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রথম প্রকাশের পর। এ বছরের আগস্ট মাসেই তার দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ হয়েছে।

৬৪ জেলায় কি দেখেছি: সাইকেল ভ্রমনের রোজনামচা লেখক: মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম। আগামী প্রকাশনী, ৩৬ বাংলাবাজার, ঢাকা ১১০০, ফোন: +৮৮০২৯৫৯১১৮৫, ৪৭১১০০২১।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *