আ.ন.ম মাঈন উদ্দিন

শ্রেণির পঠন-পাঠনের বাইরে যে কার্যক্রমগুলো নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর সুপ্ত প্রতিভা উৎসারিত হয় এবং শিক্ষার্থীর জীবন কেন্দ্রিক শিক্ষায় দক্ষ হয়ে গড়ে ওঠে তাকে সহপাঠ্যক্রমিক কার্যক্রম বলে। আমরা জানি, প্রাত্যহিক এসেম্বলী, ইনডোর আউটডোর খেলাধুলা, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, নাট্যানুষ্ঠান, অভিনয়, আবৃত্তি, ম্যাজিক শো, নিরক্ষরতা দূরীকরণ অভিযান, বৃক্ষরোপন অভিযান, দেয়াল পত্রিকা প্রকাশ, বার্ষিক ম্যাগাজিন রচনা, শিক্ষা সফর ইত্যাদি সহপাঠ্যক্রমিক কার্যক্রমের আওতায় পড়ে। এগুলোর যথাযথ অনুশীলনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর সার্বিক সুশিক্ষা পূর্ণতা পায় এটি অস্বীকার করার অবকাশ নেই। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহপাঠ্যক্রমিক কার্যক্রমের দৈন্য দশা এবং সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতার অভাব পরিলক্ষিত হয়। এটি সমৃদ্ধ জাতি গঠনের জন্যে শুভকর নয়।
গুগল বলছে, সহপাঠ্যক্রমিক কার্যক্রমের মধ্যে বেশী অনুশীলন হয় এমন কাজ হলো প্রাত্যহিক এসেম্বলী ক্লাশ। অধিকাংশ বিদ্যালয়ে উপযোগী মাঠের অভাবে তার সঠিক অনুশীলন ব্যাহত হয়। কিছু স্কুলের এসেম্বলী অনেকটা দায় সারা গোচর। প্রায় ১৫ বছর পূর্বে আমি একটি বিদ্যালয়ে যখন প্রথম বারের মতো যাই, তখন সে বিদ্যালয়ের এসেম্বলী দেখে

আমি বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যাই। জাতীয় সংগীত গাওয়ার পর জাতীয় পতাকার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার বাঁশি পড়লে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি আমিও জাতীয় পতাকার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য হাত তুলি। কিন্তু অন্যান্য স্যারেরা দুই হাত পকেটে, বুকে কিংবা পেছনে রেখে দাঁড়িয়েছিলেন!! সেই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বড় হয়ে তাঁদের স্যারদের সার্বিক কার্যক্রম সম্পর্কে বিরূপ ধারনা পোষন করবে এতে কোন সন্দেহ নেই।
আউটডোর খেলাধুলা শরীর মনে প্রফুল্লতা আনে। মাঠই যদি খেলার উপযোগী না হয় কেবল কম্পিউটারে গেইম খেলে কি আসল স্বাদ ও উপকারীতা পাওয়া যায়, বলেন ? ক্রীড়া প্রতিযোগিতার রাতে নিজের হাউস সাজানোর জন্য সে কি ব্যস্ততা ছিল আমাদের! এক এক হাউসে দু’জন করে স্যার থাকতেন। হাউসের নামগুলোও ছিলো চমৎকার- নজরুল হাউস, জীবনানন্দ হাউস, রবীন্দ্র হাউস, জসীম উদ্দিন হাউস ইত্যাদি। প্রতিযোগিতার দিন নিজের হাউসের একজন জিতলে সে কি আনন্দ পেতাম আমরা! নিজের দলের কেহ বিজয় মঞ্চে দাঁড়িয়ে সম্মান দেখানোর সময় অন্য রকম শিহরনে আন্দোলিত হত হৃদয় গভীরে। পেশাগত জীবনে এসে দেখতে পাই, অনেক বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার সময় বিভিন্ন দল হয় ঠিকই। বাহারী নামও জুড়ে দিই। কিন্তু হৃদয়ে দাগ কাটা সেই হাউস, সাজ সজ্জা আর চোখে পড়েনা। অবাক হবেন, কোন কোন বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার দিনই কেবল শিক্ষাথীরা মাঠে নামে এবং ঐ দিনই একেবারে ফাইনাল রাউন্ড হয় তাদের! বিজয়ী হওয়ার পরে বিজয় মঞ্চে গিয়ে সম্মান জানিয়ে হাততালি পাওযার ব্যাপারটি শিক্ষার্থীরা ভুলতে বসেছে। কারণ বিজয় মঞ্চ জিনিসটি কেমন তা দেখেওনি অনেক বিদ্যালয়ের শিক্ষাথীরা।
ব্যর্থতা আর নেতিবাচক স্মৃতি না বাড়িয়ে চলুন আমরা নিচের বিষয় গুলি ভেবে দেখি:
০১. এসেম্বলী ক্লাশ সুন্দর করার স্বার্থে বিপিএড শিক্ষক প্রধান শিক্ষকের সাথে পরামর্শ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন। এসেম্বলী ক্লাশ চলাকালে শিক্ষকদের পত্রিকা পড়া, জোরে জোরে কথা বলা পরিহার করা ভাল। জাতীয় পতাকার প্রতি শিক্ষকদের ও সম্মান প্রদশর্ন করতে হয় এটির বোধোদয় যেন আমাদের হয়।
০২. বর্তমানে অনেক বিদ্যালয়ে ব্রাকের অর্থায়ন ও সহযোগিতায় বছরে ২/১ বার আন্তঃশ্রেণি বিতর্ক প্রতিযোগিতার আযয়োজন হয়। কিন্তু তাতে সব ছাত্র-ছাত্রীর অংশগ্রহণ থাকেনা বলে কেবল অংশগ্রহণকারীরাই উপকৃত হয়। ছোটবেলায় আমাদের স্কুলে দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক ১০ম শ্রেণিকে দায়িত্ব দিতেন এসব কাজে। তারা প্রতি ক্লাশে গিয়ে বিতর্কের বিষয় জানিয়ে দিয়ে আসতো। সব শ্রেণির বিতর্কে আগ্রহী শিাথীরা ১০-১৪ দিনের মধ্যে পক্ষে বা বিপক্ষে বিতর্কের জন্য ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদেরকে তাদের নাম জানিয়ে দিয়ে আসতো। প্রতি মাসের ২য় ও শেষ বৃহস্পতিবার ৪র্থ ঘন্টার পরে বিরাট হলরুমে আমাদের বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন হতো। সবার অংশগ্রহনে হওয়া সেই সব বিতর্ক প্রতিযোগিতা যেন আমাদের প্রতি স্কুলে নিয়িমিত হয় এ ব্যাপারে আমাদের উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
০৩. প্রায় স্কুলে ২দিন ব্যাপী অনুষ্ঠিত হওয়া বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা চলাকালে প্রতিদিনই প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যায়। অনেক বিদ্যালয়ে আমরা শিক্ষকেরা দুপুরবেলা পেটপুরে ভাত খেলেও আমাদের শিক্ষাথীদের জন্য আমরা নাস্তার ব্যবস্থা করিনা। ভর্তির সময় সেশন ফি কিংবা খেলাধুলা ফি নেওয়ার পরেও অথবা ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পূর্বে শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে অতিরিক্ত ১০-২০ টাকা চাঁদা নেওয়া হলেও আমরা কেন তাদের জন্য নাস্তার ব্যবস্থা করতে পারিনা কে জবাব দেবেন ?
০৪. বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরনী অনুষ্ঠানে কমিটি ও শিক্ষকরা থাকার পাশাপাশি শিক্ষা সংশ্লিষ্ট গুনীজনেরা আসবেন, তাঁদের ইতিবাচক ও চমৎকার সব কথায় শিক্ষার্থীরা অনুপ্রাণিত হবে -এটিই স্বাভাবিক। বিদ্যালয়ের বিপেএড শিক্ষক সহ শিক্ষার্থীদের পুরস্কারের নিন্মমান এবং প্রতিদিন দেখতে পাই এমন ব্যক্তিদের উপস্থিতির আধিক্য পুরস্কার বিতরনী অনুষ্ঠানের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেনা বরং সুশিক্ষার প্রতি আমাদের আন্তরিকতাই মনে করিয়ে দেয়। এসবের পরিবর্তন হলে ভাল হয়।
০৫. ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পূর্বে পর্যাপ্ত অনুশীলনের সুযোগ যেন আমাদের শিক্ষার্থীরা পায়। একেবারে ফাইনাল রাউন্ডে শিক্ষার্থীদেরকে অংশগ্রহণ করানো খেলাধুলার প্রতি আমাদের উদাসীনতাকে প্রমাণ করে। আমরা যেন শিক্ষার্থীদেরকে পর্যাপ্ত অনুশীলনের সুযোগ দেবার চেষ্টা করি।
০৬. বিভিন্ন বিদ্যালয়ে কেবল কিছু প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে বছরে ২/১ বার দেয়ালিকা প্রকাশ হতে দেখা যায়। বিদ্যালয়ের অর্থায়নে আমাদের জাতীয় দিবসগুলোতে দেয়ালিকা প্রকাশ করা সম্ভব হলে তা আমাদের সন্তানদের সৃজনশীল প্রতিভা বিকশিত করতে সহায়ক হতো বলে আমি মনে করি।
০৭. বিদ্যালয়ের বার্ষিক ম্যাগাজিন প্রকাশ দেখার সৌভাগ্য যেন আমাদের শিক্ষার্থীদের হয়। নাট্যানুষ্ঠান, অভিনয়, আবৃত্তি, ম্যাজিক শো, নিররতা দুরীকরণ অভিযান, বৃরোপন অভিযান ও শিক্ষা সফরে শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্টতা বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরী।
০৮. বর্তমান যুগ তথ্য প্রযুক্তির যুগ। মানব সম্পদ উন্নয়নে সম্ভাবনার শেষ নেই এদেশে। আধুনিক বিশ্বের আধুনিক প্রযুক্তি বিস্ময় হচ্ছে- কম্পিউটার প্রযুক্তি। যেটির উন্নয়ন ঘটাতে পারলে বিপ্লব ঘটে যেতে পারে দেশের অর্থনীতিতে। এমনই একটি অপার সম্ভাবনাময় খাত হচ্ছে তথ্য প্রযুক্তি খাত। আমি আইসিটির মাষ্টার ট্রেইনার এর প্রশিক্ষণ নিয়ে মানব সম্পদ উন্নয়ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে নিত্য নতুন প্রযুক্তির ছোয়া পেয়ে বিস্ময়ে বিস্মিত হয়েছি। তাছাড়া বিগত জুলাই মাসে চট্টগ্রাম টিচার ট্রেইনিং কলেজে বিসিক টিচার ট্রেইনিং (বিটিটি) প্রশিক্ষণে মাষ্টার ট্রেইনার হিসেবে সিলেক্ট হয়েছি এবং তাতে শিক্ষা ও প্রযুক্তির যে জ্ঞান লাভ করেছি তাতে আমার প্রিয় শিক্ষক কুতুবী , শিশির, খালেক স্যার সহ সকল স্যারদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি এই জন্য যে, তারা শিক্ষা ক্ষেত্রে শিক্ষকদের শিখন শেখানো কার্যক্রমে দক্ষ করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। সুতরাং মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্ন বাস্তবায়নে দারিদ্র মুক্ত প্রযুক্তি নির্ভর ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে তথ্য প্রযুক্তি যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা আবশ্যক বলে আমি মনে করি। বর্তমান প্রজন্মের মাঝে তথ্য-প্রযুক্তির ছোঁয়া দিতে সক্ষম একমাত্র শিক্ষক সমাজ। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের এই কার্যক্রমকে আমি স্বাগত ও অভিনন্দন জানাচ্ছি। প্রযুক্তির উৎকর্ষতার যুগে আইসিটির ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরীর মাধ্যমে শ্রেণী কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে শ্রেণী কক্ষে শিক্ষার্থীদের শিখন শেখানো কার্যক্রমে অগ্রনী ভূমিকা এবং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে নিভিড়ভাবে কাজ করতে পারবে বলে মনে করি।
২৫ ডিসেম্বর ২০১২ প্রথম আলো’র প্রতিবেদনে ওঠে আসে ৫৫ শতাংশ এ+ প্রাপ্ত শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীায় পাশই করেনি! এটি সমৃদ্ধ জাতি গঠনে বিভোর প্রাজ্ঞদের জন্য শুভকর নয়। পাঠ্যক্রমিক শিক্ষা এবং সহপাঠ্যক্রমিক শিক্ষা একে অপরের পরিপূরক। তাই এ+ প্রাপ্তির পাশাপাশি আমাদের পড়াশোনার সার্বিক মান বাড়ানোর স্বার্থে পাঠ্য বিষয়ের পাশাপাশি সহপাঠ্যক্রমিক কার্যক্রমগুলোর প্রতি সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতা বাড়ানো প্রয়োজন। আশার কথা- ২০১৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে সরকার ৬ষ্ঠ থেকে ৯ম শ্রেণিতে (পরের শিক্ষা বর্ষে যা ১০ম শ্রেণিতে আবশ্যিক) ‘শারীরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য’, ‘চারু ও কারুকলা’ এবং ‘শারীরিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য বিজ্ঞান ও খেলাধুলা’ নামক ১০০ নম্বরের আবশ্যিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে আমাদের আশান্বিত করেছে। এটির পর্যাপ্ত ব্যবহারিক অনুশীলন নিশ্চিত করা ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ঠ সকলের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করা গেলে আমাদের শিক্ষার্থীদের সার্বিক শিক্ষার পূর্ণতা প্রাপ্তিতে তা কার্যকর ভূমিকা রাখবে সন্দেহ নেই।

লেখক : আ.ন.ম মাঈন উদ্দিন ,সিনিয়র শিক্ষক মোঃ ইলিয়াছ মিয়া চৌং উচ্চ বিদ্যালয় ,মাষ্টার ট্রেইনার (আইসটি) বিসিসি ও বিটিটি ,সদর,কক্সবাজার।

Comments are closed.