আমার শিক্ষক এম এ শুক্কুর : দখিনের অনিন্দ্য জ্যোতির্ময়

11

মোহাম্মদ আলম চৌধুরী

জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে?

চিরস্থির কবে নীর হায়রে জীবন নদে?

জন্মদাতা, শ্বশুর, শিক্ষক, অন্নদাতা ও ভয়ত্রাতা- শাস্ত্রানুযায়ী এ-পাঁচজন পিতা। আজকে এখান থেকে একজনকে নিয়েই স্মৃতিভা-ার খুলে লিখতে হবে। আমার স্মৃতিকোষে অমলিন ঘটনারাজি নিখুঁতভাবে তুলে ধরা তেমন সম্ভবপর নয়। কারণ, কখনও কখনও স্মৃতিও প্রতারণা করে। যাঁদেরকে হৃদয়ের মণিকোঠায় রেখেছি শ্রদ্ধার আসনে, সেখানকার কথাগুলো গুছিয়ে বলাও মুসিবত বলে মনে হয়। স্মৃতির সাথে আবেগের ধাক্কা-ধাক্কিতে অবিকলভাবে স্মৃতিরোমন্থন দুঃসাধ্য বটে. আজ স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তা-ই মনে হচ্ছে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা, ভাষাসৈনিক এম এ শুক্কুর- আমার শিক্ষক। উখিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পাঁচবছর তাঁকে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছি। তিনি এখনও আমার অন্তরাত্মায় শিক্ষক হিসেবে আছেন। দেহগতভাবে লোকান্তরিত হলেও তাঁর শিক্ষা তো আমার ভেতর আছে। তাই আমি ‘শিক্ষক ছিলেন’ কথাটি এখানে কিংবা কোথাও বলবো না। সবছাত্রই শিক্ষক পেয়ে থাকে। কিন্তু শিক্ষকের প্রিয়জন হয়ে ওঠা সকল ছাত্রের পক্ষে সম্ভব নয়। সবছাত্রই শিক্ষকের নাম জানে, কিন্তু সকল ছাত্রের নাম শিক্ষকের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। কিন্তু ব্যতিক্রম তো ব্যতিক্রমই। ষষ্ঠ শ্রেণিতে সবেমাত্র ভর্তি হওয়া কোনো ছাত্রকে যখন এতগুলো ছাত্রদের মাঝখান থেকে প্রধান শিক্ষক ছাত্রের নাম ধরে ডাকে- নিশ্চিতভাবে তো তা যে কোনো ছাত্রের জন্যে বাড়তি ও গৌরববোধের বিষয়। আমার বেলায় ঠিক ঘটনাটি এভাবেই ঘটেছিলো।

আমার নানা আলহাজ ফয়েজ আহমদ চৌধুরী আমাকে উখিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ট শ্রেণিতে ভর্তি করাতে নিয়ে গেলেন। দিন-ক্ষণ আজ আমি ঠিক ঠাহর করতে পারছি না। সে দিনই শুক্কুর স্যারের সাথে আমার আনুষ্টানিক পরিচয়। যে পরিচয়ের ব্যাপ্তিকাল ছিলো আমৃত্যু।

লোকান্তরিত শিক্ষককে নিয়ে স্মৃতিচারণ দুরুহ কাজ। কারণ, শিক্ষকের কখনও মৃত্যু ঘটে না। তাঁরা নিজ ছাত্রদের মনোজগতে অমরত্বের বীজবপন করে যান। দেহগতভাবে লোকান্তরিত হয়েও তাঁরা এ-প্রক্রিয়ায় অমর থাকেন। শুক্কুর স্যার ছাত্রদের অন্তরাত্মার সবটুকুতে জাগ্রত একটি সত্ত্বা। নিজজীবনের সমস্ত সুন্দর মিলিয়ে শিক্ষকেরা ছাত্রদের যে মানসজগত তৈরি করে দেন, তাতেই তাঁদের চিরবসতির স্থান নির্ধারিত থাকে।

শুক্কুর স্যারকে নিয়ে আমার অজ¯্র স্মৃতি রয়েছে। কোনটি রেখে কোনটি যে বলি, আমি বুঝে ওঠতে পারছি না। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত দেশ-বিদেশের বহু শিক্ষকের পাঠ জীবনে গ্রহণ করেছি। তম্মধ্যে আমার প্রিয় একজন শিক্ষক হচ্ছেন শুক্কুর স্যার। স্যার সম্পর্কে বলতে যেয়ে আজ বহু কথাই স্মৃতিপটে উঁকি দিচ্ছে। আমার দশা হয়েছে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শ্রীকান্ত উপন্যাসের ‘শ্রীকান্ত’র মতো। শ্রীকান্ত উপন্যাসের একেবারে প্রথম বাক্যটিই এক্ষণে মনে পড়ছে, ‘আমার এই ‘ভবঘুরে’ জীবনের অপরাহ্নবেলায় দাঁড়াইয়া ইহারই একটা অধ্যায় বলিতে বসিয়া আজ কত কথাই না মনে পড়িতেছে।’ সব কথা তো আর বলা সম্ভব নয়। স্মৃতির নির্বাচিত কিছু কথাই এখানে রোমন্থন করব।

উখিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬০ বছর পূর্তিউৎসব উপলক্ষ্যে প্রকাশিত স্মরণিকা ‘শিকড়’-এ আমি স্মৃতির বীজতলা নামক একটি লেখা লিখেছিলাম। স্যারের জীবদ্দশায় লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিলো। অল্প কয়েকটি বাক্যে আমি সেদিন পুরোকথাই বলতে চেয়েছি। সেখানে আমি লিখেছিলাম, ‘আমি যখন উখিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হই তখন প্রধান শিক্ষক ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ভাষাসৈনিক এম এ শুক্কুর স্যার। অমায়িক শান্ত ব্যবহারের কারণে আমাদের মনে পরম শ্রদ্ধাভাজন হিসেবে আছেন। স্যারকে নবম শ্রেণিতে ক্লাশটিচার হিসেবে পেয়েছিলাম। ইংরেজি পড়াতেন। পড়া শুরুর আগে ছোট্ট একটি গল্প দিয়ে শুরু করতেন। ফলে আমাদের মনমেজাজ ফুরফুরে হয়ে ওঠতো। তারপর পাঠদান শুরু করতেন। মনে হতো কথাগুলো বাতাসের মাধ্যমে কোত্থেকে যেনো ভেসে আসছে।’

দখিন জনপদ থেকে শুক্কুর স্যার ভাষাসৈনিক ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। ক্লাশে প্রসঙ্গক্রমে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্মৃতিচারণ করতেন। কী যে এক দুঃসহ পরিস্থিতি মোকাবেলা করে এদেশের মুক্তি ত্বরান্বিত করেছিলেন তার স্মৃতিচারণ করতেন। তখন এসবের আর কতটুকুই বা বুঝি। তবুও স্যারের কথায় আবেগাপ্লুত হতাম। কখনও কখনও শিহরিত হতাম তাঁর নেতৃত্বে সংঘটিত বিভিন্ন অপারেশনের কথা শুনে। আমার পিতা জাফর আলম চৌধুরী একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। স্যারের কথাগুলো বাসায় গিয়ে যখন আব্বার সাথে আলাপ করতাম, তখন তিনি আবেগাপ্লুত হতেন। আব্বাও তখন জীবনবাজি রেখে দেশকে স্বাধীন করার যে দৃঢ়প্রত্যয় বুকে ধারণ করেছিলেন তার কথা বলতেন। অশ্রুসজল নয়নে সেই সময়ের ছবি ভেসে ওঠতো। বলতেন, ‘দেশের স্বাধীনতার জন্যে ব্যয় করা সময়টুকুই আমার জীবনের শ্রেষ্ট স্বর্ণোজ্জ্বল সময়।’

শুক্কুর স্যারের নিত্য আলাপেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিলো মুক্তিযুদ্ধ। কীভাবে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে বাংলার আপামর জনসাধারণ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলো তার ফিরিস্তি তিনি সুন্দর করে বয়ান দিতেন। তাঁর ভাষাশৈলি, উপস্থাপন কৌশল, বাস্তবতার সাথে আবেগের মিশ্রণ তাঁর বক্তব্যকে শ্রুতিমধুর করে তুলতো। আবেগপ্রবণ হয়ে গেলে তিনি কালো ফ্রেমের চশমাটি হাতে নিয়ে সাদা রুমালে মুছতেন। এভাবেই আমাদের হৃদয়কুঠুরীতে তিনি বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ আর প্রিয় বাংলাদেশের জন্মবৃত্তান্তকাহিনী গেঁথে দিয়েছিলেন। বিরলপ্রজ এ-জাতশিক্ষককে নিয়ে লিখতে বসে আমি আমার অসহায়ত্বের বিভিষীকা টের পাচ্ছি।

শুক্কুর স্যার প্রথাগত শিক্ষক ছিলেন না। তাঁর ভেতর বহুমাত্রিক জ্যোতির্ময়তা ছিল। তিনি ছিলেন দখিনের অনিন্দ্য বহুমাত্রিক জ্যোতির্ময়। নিরস পাঠ্যবইয়ের শুষ্ক গল্প তিনি রসালো করে ছাত্রদের মনোযোগ আকর্ষণ করতেন তাঁর জাদুকরী শব্দশক্তি দিয়ে। শেক্সপিয়রকে তিনি প্রচন্ড ভালোবাসতেন। তাঁর রচনার বহু সংলাপ বাংলা রূপান্তর করে আমাদের শুনিয়েছেন। তখন তা হৃদয়ঙ্গম করতে না পারলেও ভালোলেগে ছিলো। তিনি বলতেন, ‘তোমরা বড় হয়ে শেক্সপিয়রের লেখা পড়বে। জীবন ও জগত সম্পর্কে বহু উপকরণ তোমরা সেখানে পাবে।’ স্যারের কথাটি এখনও কানে ফিরে ফিরে আসে।

শুক্কুর স্যারের বেশভুষা খুব সাদাসিদে ছিলো। শ্বেতশুভ্র পাঞ্জাবী-পায়জামা তিনি পরিধান করতেন। দীর্ঘাঙ্গী কায়ায় তা বেশ মানানসই বলে আমার মনে হতো। চোখবন্ধ করলে এখনও তাঁকে স্কুলের বারান্দায় হাঁটতে দেখি। বহু শিক্ষকই তো জীবনে পাঠদান করেন, কিন্তু কেউ কেউ অতি আপনজন হয়ে ওঠেন; শুক্কুর স্যার তাঁদের মধ্যেই একজন।

আমি তখন নবম শ্রেণির ছাত্র। অ্যাসেম্বেলি ক্লাশ শেষ করে ক্লাশরুমে ঢুকেছি মাত্র। ঝরঝর করে ঘাম ঝরছে। গা কেমন জানি রি রি করে ওঠছে ঘামের কারণে। কিছুক্ষণ পরেই স্যার ক্লাশে আসলেন। স্বভাব সুলভ ভঙ্গিতে সবার কুশলাদি জানিয়ে ক্লাশ শুরু করলেন। অনান্য দিনের চাইতে স্যারকে আজ একটু ব্যতিক্রম মনে হচ্ছে। ক্লাশের মাঝামাঝি সময়ে সে রহস্যও উন্মোচিত হলো। স্যার নিজেই হঠাৎ হা করে দাঁতের মাড়িটি আমাদের দেখালেন। তারপর বলতে লাগলেন আসল কাহিনী। সেদিন সকালে নূর হোটেলে নাস্তা করার সময় পরোটার সাথে একটি দাঁত ওঠে পড়ে। আফসোস আর হালকা রসিকতার মাধ্যমে স্যার সে বিষয়টি তুলে ধরেন।

উখিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে যাদেরকে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলাম, তাঁদের মধ্যে অনেকের শূণ্যতা এখনও অনুভব করছি। সোহাগে-শাসনে তাঁরা আমাদের প্রকৃত জীবনের সন্ধান দেয়ার চেষ্টা করতেন। আমার ভেতরের আমাকে খুঁজতে গেলেও আমার কিছু শিক্ষকদের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাই। শিক্ষকরা রক্তের সম্পর্কের কেউ নন, কিন্তু তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ আত্মার সম্পর্কে গ্রোথিত।

ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক পৃথিবীতে একটি ব্যতিক্রমী সম্পর্ক। এ-শুধু দাতা-গ্রহীতার সম্পর্ক নয়, এর চেয়ে ঢের বেশি। ‘জীবন কত দ্বীপান্বিত ও জ্যোতির্ময় তা একজন ছাত্র দেখতে পারে একটি মাত্র পথে : তার জীবনের শিক্ষকদের ভেতর দিয়ে। বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন, কিংবা চারপাশের বড়ো বা সাধারণ মানুষ- কেউই এ-ব্যাপারে শিক্ষকের সমকক্ষ হতে পারে না।’ কথাগুলো বলেছেন অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সাইয়িদ তাঁর ‘নিষ্ফলা মাঠের কৃষক’ নামক বইতে।

আমার কয়েকজন শিক্ষক পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়ে আকাশের তারকারাজি হয়ে উর্ধ্বলোকে বিরাজ করছেন। স্মৃতি থেকে তাঁদের কোনো মতেই বিস্মৃত করা যাবে না। নীরবে নিভৃতে যখন ভাবি, তাঁদের উপস্থিতি চিন্তায় আপনা-আপনি চলে আসে। নিজের জীবনের সাথে, স্মৃতিরাজির সাথে, অন্তরাত্মার সাথে তাঁরা মিশে আছেন আমার অস্তিত্বের মতো সত্য হয়ে।

শুক্কুর স্যারের মতো শিক্ষকের প্রয়োজন স্বপ্ন দেখানোর জন্য, স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য। সুন্দর বাচনভঙ্গি, মোলায়েম স্বর, নির্ভয়-সুরত তাঁকে ছাত্রদের মাঝে আশা-ভরসাস্থল হিসেবে পরিণত করেছিলো। কতো ছাত্র তাঁর কাছে জীবনের সঠিক নির্দেশনা পেয়েছে, প্রতিষ্টিত হওয়ার জীবনপথের পাথেয় পেয়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই।

আজকে যখন শিক্ষক ও শিক্ষকতা শব্দযুগল বিভিন্নভাবে কালিমালিপ্ত হচ্ছে, তখন শুক্কুর স্যারের মতো শিক্ষকদের শূণ্যতা সমাজে তীব্রভাবে অনুভুত হচ্ছে।

শুক্কুর স্যার আপাদমস্তক শিক্ষক ছিলেন। তিনি কখনও শিক্ষা ব্যতীত অন্য কোনো বিষয়ে মনোযোগী ছিলেন না। একজন শিক্ষকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে শিক্ষাকে আনন্দের মাধ্যম করে তোলা, স্যারের এ-গুণটি ছিলো। শ্রুতিমধুর ভাষণ দিয়ে তিনি ছাত্রদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতেন।

স্যারের পঠন-পাঠন ব্যাপক ছিলো। আজ যা অনেক চাকুরিজীবি শিক্ষকের কাছে কল্পনার মতো মনে হবে। যথাসময়ে ক্লাশে আসাও তাঁর একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিলো। প্রত্যেক ছাত্রের সাথে শ্রেণিকক্ষে পাঠসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কথা বলার চেষ্টা করতেন। শিক্ষক যখন শ্রেণিকক্ষে কোনো ছাত্রের নাম ধরে ডাকেন, তখন ঐ ছাত্রের মনে আনন্দের ফল্গুধারা সৃষ্টি হয়। আমার নিজের অনুভূতি থেকেই কথাটি বললাম।

অবসরজীবন স্যার টেকনাফের লেঙ্গুরবিল গ্রামেই কাটিয়েছেন। যে গ্রামের মাটি আর হাওয়ায় তিনি বেড়ে ওঠেছিলেন তিনি বারবার সেখানেই ফিরে গিয়ে স্বাচ্ছন্দবোধ করেছেন। সেখানেই তিনি এখন চিরশায়িত আছেন। আর আমরা যারা তাঁর চিন্তার সন্তান, আমরা ছড়িয়ে আছি শুধু দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

শুক্কুর স্যার আমার হৃদয়ে অমলিন একজন জ্যোতির্ময় শিক্ষক।

আমি স্যারের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি পরম আল্লাহর কাছে। ।

* শিক্ষক, রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। পরিচালক, পালং একাডেমি, কক্সবাজার।