কিংবদন্তী নেতার মুখোমুখি ও বাংলাদেশ নিয়ে প্রশ্নোত্তর

15

এ এম এম নাসির উদ্দিন

২০০৮ সালের জুন মাসের ঘটনা। আমি তখন পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (Member, Planning Commission) First World Cities Summit এবং International Water week এ যোগদানের জন্যে আমি বাংলাদেশ সরকারি প্রতিনিধি দলের নেতা হিসেবে সিংগাপুর যাই।সম্মেলনে গিয়ে বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের দু’একজন পার্টিসিপেন্টের সঙ্গে দেখা ও হয়।আন্তর্জাতিক এ সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী, সচিব, সিটি মেয়র, পলিসি মেকার সহ বহু পেশাদার ও বিশেষজ্ঞ যোগ দেন। সিংগাপুরের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সম্মেলন এর উদ্ভোবনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন।

১৯৮৯ সালের এপ্রিলে আমি প্রথম সিংগাপুর যাই। আমেরিকার লস এঞ্জেলসে একটা কোর্স শেষে দেশে ফেরার পথে সিংগাপুরে ৫-৬ দিন বেডাতে গিয়েছিলাম। এর পরেও সেদেশে বহুবার গিয়েছি। ২০০২ সালে Singapore National University তে এক মাসের একটা কোর্স ও করেছি। ১৯৬৩ সালে সিংগাপুর বৃটিশদের থেকে মুক্ত হয়ে মালয়েশিয়ান ফেডারেশনে যোগ দেয়। কিন্তু মালয়রা সব ক্ষেত্রে প্রাধান্য পাওয়ায় সিংগাপুর এর জনগণ বিদ্রোহী হয়ে উঠে। দাংগা-হাংগামাও হয়। বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে। ১৯৬৫ সালের আগস্ট মাসে মালয়েশিয়ার তদানিন্তন প্রধানমন্ত্রী টুনকু আব্দুর রহমান এক তরফাভাবে সিংগাপুরকে মালয়েশিয়ান ফেডারেশন থেকে বের করে দেন। তখন সিংগাপুরের অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। বেকারত্ব,আবাসন সমস্যা, প্রাকৃতিক সম্পদের অভাব, অবকাঠামোর সমস্যা ইত্যাদি ছিল প্রকট ও ব্যাপক ।

যাক- আসল কথায় আসি। ওই সম্মেলনের শেষ দিনে প্রতিনিধি দলের নেতাদের সম্মানে এক নৈশভোজের আয়োজন করা হয় বিলাস বহুল সাংগ্রীলা হোটেলে। প্রায় ৬৫০ জন অতিথি আমন্ত্রিত ছিলেন সেদিন। সিংগাপুরের অবিসংবাদিত কিম্বদন্তী নেতা, সিংগাপুরের উন্নয়ন এর প্রাণ পুরুষ সাবেক প্রধানমন্ত্রী, অবিসংবাদিত নেতা লি কুয়ান ইউ ছিলেন প্রধান অতিথি। উনি ডিনারের পূর্বে বক্তৃতা দিবেন। বক্তৃতার পর ছিল প্রশ্নোত্তর পর্ব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী, এমপিরা ছিলেন মঞ্ছের সামনে। আমার টেবিল ছিল হলরুমের মাঝামাঝি। উনার বক্তব্য শেষ হওয়ার সাথে সাথেই আমি দ্রুত মঞ্চের একদম কাছে চলে গেলাম। উদ্দেশ্য ছিল দুটো। সিংগাপুরকে বদলে দেওয়া এই কিম্বদন্তী নেতাকে কাছে থেকে দেখা এবং প্রথমেই প্রশ্ন করার সুযোগটি নেয়া।

গোড়া থেকেই আমি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ এবং সিংগাপুরের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ এর একজন কডা ভক্ত। আমার আগেই এক সাদাচামড়া ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে প্রশ্ন শুরু করে দিলেন। যাক পরের সুযোগটি প্রধান অতিথি আমাকে দিলেন।মঞ্চের একদম সামনে দাড়িয়ে প্রশ্ন করা শুরু করলাম। এদিকে স্থানীয় মিডিয়ার কল্যাণে প্রধান অতিথির স্ত্রীর অসুস্থতার খবর আগেই জেনেছি। আমি এই অসুস্থতার জন্যে দুঃখ প্রকাশ করে এবং সমবেদনা জানিয়ে প্রশ্ন শুরু করি। পরে তিনি এজন্যে আমাকে ধন্যবাদ দেন।

আমার প্রশ্ন ছিল দুটি-

১।আপনি সিংগাপুর কে উন্নয়ন এর শিখরে নিয়ে এসেছেন। আপনার অনুপস্থিতিতে এটা টেকসই হবে কি?
২। আপনার অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশের সফলতার জন্যে অতি প্রয়োজনীয় অন্তত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিন।

অবিসংবাদিত নেতা লি কুয়ান ইউ সাবলীল উত্তর দিলেন। জডতা বিহীন সাবলীলভাবে উনার জবাব সমস্ত দর্শক একাগ্রচিত্তে শুনেছেন।সত্যি বলতে কি উনার প্রশ্নোত্তর পর্বের প্রায় পুরোটা আমার প্রশ্নের জবাব দিতেই ব্যয় হয়েছে।

উনার কাছে জানতে চেয়েছিলাম উনার অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের উন্নয়নে সফলতার জন্যে অতিব গুরুত্বপূর্ণ তিনটি সুপারিশ কি কি হতে পারে। বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে উনি প্রথমেই অনেক প্রসঙ্গের অবতারণা করলেন। উদার গনতন্ত্রে (liberal democracy) অযোগ্যদের ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্বে চলে আসা,পশ্চিমা গনতন্ত্র বিশেষত ওয়েস্ট মিনিস্টার ধরনের গনতন্ত্রের অসুবিধা (ইত্যাদি) সম্পর্কে বললেন। আমেরিকার ওবামা-হিলারির নির্বাচন নিয়েও বললেন। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে কিছু সরস মন্তব্য করলেন যা এমুহুর্তে উল্লেখ করা সমীচীন মনে করলামনা। তবে তা ছিল আমরা বিগত দুই-তিন দশক ধরে যা দেখে আসছি তার নির্যাস। বুঝতে বাকী রইলনা উনি আমাদের বিষয়ে সম্পুর্ণ ওয়াকেবহাল। বাংলাদেশের উন্নয়নে সফলতার জন্যে উনার মতে তিনটি পূর্ব শর্তঃ

এক(১) – এমন একটা সরকার যার উপর জনগণের আস্থা রয়েছে। কঠিন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সময়ও যার উপর জনগণ আস্থাশীল থাকবে।

দুই(২)- নিজ উদ্যোগে যথাসময়ে প্রয়োজনীয় সিন্ধান্ত গ্রহণের যোগ্যতা নেতৃ্ত্বের থাকতে হবে। সিদ্ধান্ত হবে দেশের স্বার্থ বিবেচনায়,নিজ লাভের বিবেচনায় নয়।

তিনি স্বপ্রণোদিতভাবেই যোগ করলেন অতি গুরুত্বপূর্ণ একটা দিক। বললেন, “সিংগাপুরের জনগন জানে তাদের এরুপ নেতৃত্ব রয়েছে কারণ সময় পরিক্রমায় সিংগাপুর ধনী হয়েছে কিন্তু নেতারা ধনবান হননি” ।

তিন (৩)- যোগ্য লোকের হাতেই কতৃত্ব থাকতে হবে। যারা কাজ সমাধান করতে পারবে, তাদেরই দায়িত্বে আনতে হবে।

উনার অনুপস্থিতিতে সিংগাপুরের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে লি কুয়ান ইউ বলেন, একটা খামখেয়ালি পুর্ন (freak) নির্বাচনের রেজাল্টই সিংগাপুরের সব অর্জন ধ্বংস করার জন্যে যথেষ্ট। জনগণ যদি বিরক্ত হয়ে বা হালকা বিবেচনা বোধ থেকে বা খামখেয়ালি ভাবে বিরোধী দলের পক্ষে ভোট দেয় তবে সিংগাপুরের সব অর্জন পাঁচ বছরের মধ্যে ধংস হয়ে যাবে। সিংগাপুরের অস্তিত্ব পারফরম্যান্স এর উপর নির্ভরশীল,অসাধারণ পারফরম্যান্স,প্রতিযোগীদের চেয়ে শ্রেয়তর পারফরম্যান্স। এই পারফরম্যান্স যে ভিত্তির উপর নির্ভর শীল সেটা যদি ধংস হয়ে যায়, তবে সব শেষ হয়ে যাবে। তিনি সুস্পষ্ট ভাবে বললেন,একমাত্র যুবক সমাজই সিংগাপুরের অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে পারে। তবে তার জন্যে তাদের সেভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। ভবিষ্যতের দুনিয়া অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক হবে এবং সিংগাপুরের যুবকদের তা মোকাবিলার প্রস্তুতি এখন থেকেই নিতে হবে। যুবক সমাজ যদি তা নিতে ব্যর্থ হয়,তবে সিংগাপুরের অগ্রযাত্রায় ছেদ পড়বে। উনার এই বক্তব্য বাংলাদেশের জন্যে ও ষোল আনা প্রযোজ্য। আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ ও যুবক সমাজের উপরই নির্ভর করছে নিঃসন্দেহে। ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা মোকাবিলায় তাদের প্রস্তুতিতে ঘাটতি হলে দেশের সামনে মহাবিপদের আশংকা অমুলক নয়।

আমার প্রশ্ন ও উনার উত্তর নিয়ে পরের দিন (২৬ জুন ২০০৮) সিংগাপুরের বিভিন্ন পত্রিকা হেড লাইন করেছিল। সিংগাপুরের প্রধান ইংরেজি পত্রিকা The Straits Times মুলত আমার প্রশ্নোত্তর নিয়ে লিড নিউজ করে। ওই দিকে বিবিসি সহ বিভিন্ন টিভি চ্যনেল প্রোগ্রামটি সরাসরি সম্প্রচার করছিল যা আমি জানতাম না। জেনেছি দেশে ফেরার পর। এক সামাজিক প্রোগ্রামে আমার এক ব্যবসায়ী ছোট ভাই এস এম নুরুল হক (সাবেক বি জি এম ই এ সভাপতি এস এম ফজলুল হকের ছোট ভাই) আমাকে দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে জড়িয়ে ধরেন এবং বলতে থাকেন “ওই দিন সিংগাপুরের ওই ডিনার রিসেপশনে আপনার ভূমিকায় একজন বাংলাদেশী হিসেবে আমি অত্যন্ত প্রাউড ফিল করেছি। বললাম,”তুমি কীভাবে জানলে?” বলল,সে চিকিৎসার জন্যে সিংগাপুর গিয়েছিল। হোটেলে শুয়ে টিভিতে লাইভ পোগ্রামটি দেখছিল আর ভাবছিল হায় এত বড়ো একটা আন্তর্জাতিক প্রোগ্রামে আমার দেশের কেউ কি নেই?, ঠিক ওই সময়ই সে আমাকে প্রশ্ন করতে দেখে। তখনই জানলাম লাইভ সম্প্রচারের বিষয়টি।

লেখক: সাবেক সচিব । পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ছাড়াও তথ্য মন্ত্রণালয়, জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এর সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। জন্মসূত্রে কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার কৃতি সন্তান।