এনজিও জমানা বনাম কক্সবাজারবাসীর ভবিষ্যৎ

23

তারেক হায়দার
এনজিও জমানা বনাম কক্সবাজারবাসীর ভবিষ্যৎ নিয়ে লেখার আগে আপনাদের কিছু কথা স্মরণে দিতে চাই, তা হল- বর্তমান বাংলাদেশের একটি বৃহৎ সংকটের মধ্যে রোহিঙ্গা সংকটেই অন্যতম। এখন প্রশ্ন কেন তারা সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে? কক্সবাজারের উখিয়া টেকনাফে বন্যপ্রাণীর আবাস ও সবুজের অভয়ারণ্যের হাজার হাজার একর পাহাড় ধংস করে পরিবেশ ঝুঁকি, কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কে পরিবহন সংকট, জেলা জুড়ে দব্রমূল্যের বাড়তি চাপ, স্বাস্থঝুঁকি, রোহিঙ্গাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া, রোহিঙ্গা নারিদের দেহব্যবসায় লিপ্ত হওয়া, মাদক সন্ত্রাস ও বিভিন্ন অপকর্মে লিপ্ত হওয়া, ইয়াবার চোরাচালানে লিপ্ত সহ নানান প্রলোভনে বিভিন্ন দেশে পাচার হওয়ার কারণেই এরা দেশের প্রধাণ সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এবার আসি মূল কথায়- ২০১৭ এর আগস্ট থেকে যখন বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্ত থেকে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে মৌমাছির ঝাঁকের মত মায়ানমার থেকে লক্ষ্য লক্ষ্য রোহিঙ্গা শরণার্থী অনুপ্রবেশ করে তখন তাৎক্ষণিক রোহিঙ্গাদের সেবা দানের জন্য মাত্র হাতে গুনা কয়েকটি এন জিও অবস্থান করেছিল। ধীরে ধীরে দিন যত যায় কক্সবাজারে তত বিদেশী সাহায্যকারী সংস্থা এন জিও গুলোর অবস্থানও কক্সবাজারে তত বাড়তে থাকে। শুরুর দিকে এন জিও গুলো তাদের কাজের জন্য অনেকটা চাপের মুখে যাকে যেভাবে পারে যোগ্যতা বিবেচনায় না নিয়ে চাকরিতে যোগদান করিয়েছিল। ঐসব এনজিও গুলোতে কাজ করার জন্য তখনো জেলার অনেক তরুণ-যুবকদের আগ্রহ তেমন ছিল না। ধীরে ধীরে কক্সবাজারের এন জিওদের আনাগোনা বাড়তেছে, যারা যোগদান করেছে তাদের মাসিক সম্মাননাও অনেক বেশি, চাকরির মেয়াদ বাড়তেছে, সব মিলিয়ে সবার মনে এনজিওতে চাকরির একটা প্রলোভন জাগে এবং শুরু হয় প্রতিযোগিতা। একটাই ধারণা- এন জিওতে গড়িমসি করে চাকরি হয়ে গেলেই তাদের জীবন উদ্ধার।
কক্সাবাজারের তরুণ- যুবক ছেলে-মেয়েরা তাদের চাচা-মামা, কাছের-দূরের অনেক আত্মীয়তার পরিচয়ে এন জিও গুলোতে চাকরি নিয়েছে। যাদের মধ্যে বেশির ভাগই যোগ্যতা ছাড়াই এবং যাচাই বাচাই না করেই চকরি পেয়েছে। তাদের মধ্যে ছিল, ইন্টার, অনার্স এবং মাস্টার্সে অধ্যয়নরত অনেক শিক্ষার্থী। খুব কমই আছে গ্রেজুয়েশন এবং পোস্ট গ্রেজুয়েট সম্পন্ন। তারা চাকরি করছে, দিন থেকে দিন যাচ্ছে বেড়ে, মাস শেষে চাকরির ভাল টাকা পাচ্ছে, পকেট ভর্তি টাকা পূর্তি মাস্তি সব মিলিয়ে এন জিও চাকরিজীবীরা খুব ভালই আছে। ইন্টারের যে ছেলেটা সন্ধ্যায় ছোলামুড়ি খেয়ে টিউশনিতে গিয়ে মাসের ১৫০০ টাকা দিয়ে পুরো মাস চলে যেতো সে এখন প্রতি সন্ধ্যায় তারকা মানের রেস্টুরেন্টে ছাড়া খাই না। প্রতি মাসে একটা করে স্মার্টফোন চেঞ্জ করছে, আর পছন্দের একটি মটর বাইক নিয়ে ঘুরছে বন্ধুদের সাথে, আর আড্ডায় মাতোয়ারায় কাটে দিন। এভাবেই ঘুরছে তাদের দিন চক্র। কিন্তু এদের পেছনের গল্পটা জানে না অনেকেই। যাদের ইন্টারে অধ্যয়নরত অবস্থায় চাকরি হয়েছে তারা এখনো ইন্টারেই রয়ে গেছে, সেটা হোক ফার্স্ট ইয়ার কিংবা ইন্টার ফাইনাল। যারা অনার্স প্রথম বর্ষে কিংবা দ্বিতীয় বর্ষে চাকরিতে যোগদান করেছে তাদের ক্যারিয়ার এখন প্রথম এং দ্বিতীয় বর্ষেই থেমে গিয়েছে। চাকরির কারণে অনেকে ক্লাসে অনুপস্থিত থাকায় ও পরিক্ষায় অংশ না নেওয়ায় বার বার ইনপ্রোভ দিচ্ছে একই বর্ষে। আবার অনেকেই ইন্টার কিংবা অনার্সের পড়া-লেখা সম্পূর্ণ বন্ধ রেখেই এনজিওকেই প্রফেশন হিসেবে বেচে নিয়েছে।
অন্যদিকে অনার্স শেষ করা এবং মাস্টার্স শেষ করা ছেলে মেয়েরাও এন জিও চাকরির জন্য প্রতিযোগিতায় ঠেলাঠেলি করছে এবং যারা চাকরি করছে তারাও স্থায়ী হওয়ার চেষ্টা করছে। এন জিওতে এই একটা চাকরির প্রবণতায় তারা হারিয়ে ফেলছে সরকারি চাকরির বয়স। এতেকরে কক্সবাজারের ভবিষ্যতের সংকট গুলো হচ্ছে- একটা সময় গিয়ে সরকারি যেকোনো সেক্টরে কক্সবাজার জেলার কোন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকবে না এবং অধ্যয়ন বন্ধ রাখার কারণে জেলায় ধারাবাহিক গ্রেজুয়েট ও পোস্ট গ্রেজুয়েট শেষ করা ছেলে মেয়েদের হার অনেকটা কমে আসবে। একটা সময় যখন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিশ্চিত হবে তখন এন জিও তে চাকরি করা অনেক গ্রেজুয়েট-পোস্ট গ্রেজুয়েট ছেলে মেয়েদের সরকারি চাকরির বয়স শেষ হয়ে যাবে এবং তারা চাইলেও সরকারি চাকরিতে আবেদন করতে পারবে না।

তারেক হায়দার আহবায়ক, বাংলাদেশ লিবারেল এসোসিয়েশন, কক্সবাজার জেলা।