স্মৃতিগাথা ২৯ এপ্রিল

12

সেই ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের কথা। এটা সাদারণ কোন দিন নয়। যেন এক মহাপ্রলয়। বিভীষিকাময় এক করুণ রাত। সেই রাতের ঘটনা এখনো আমাকে তাড়া করে বেড়ায়। তখন আমি ১০ বছরের এক বালক। ৫ম শ্রেণির ছাত্র। কিই বা আমার স্মৃতি। তবুও যা আমার মনে আছে তাতে এখনো আমি শিহরিয়ে উঠি। মন এখনো কাদে সেই দু:সহ স্মৃতি মনে পড়লে। আমরা ৫ ভাই, ২ বোন, আব্বা-আম্মা নিয়ে আমাদের সংসার। আমাদের ছিল দুধেল গাভীসহ ৪টি গরু, হাস-মুরগী আর পুকুর ভরা মাছ। একটি দোকান ছিল সমুদ্র পাড়ে, আরো ছিল ডিঙ্গি নৌকা ও মাছ ধরার জাল। যাহোক এরকম গ্রাম, এরকম পরিবেশ অনেকেরই ছিল। চমৎকার এক গ্রামীণ পরিবেশে আমরা বেড়ে উঠছিলাম। এত সুন্দর পরিবেশ ও সাজানো গ্রামকে তছনছ করে দিল ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়। যতটুকু মনে পড়ে ওই ঘূর্ণিঝড়ে পুরো গ্রাম ল-ভ- হয়ে যায়। এখানে বলে রাখি, আমাদের গ্রাম হলো আনোয়ারা থানার অন্তর্গত ৩ নং রায়পুর ইউনিয়নের গহিরা। ঘূর্ণিঝড় চলাকালীন আমার বড় ভাই ও বড় বোন ছাড়া পরিবারের অন্যরা ছিলাম ঘরের মধ্যে। বড় ভাই ছিল লেখাপড়ার জন্য চট্টগ্রাম শহরে আর বড় বোন ছিল শ্বশুড় বাড়ি। আমাদের বাড়ির আশেপাশে কোন সাইক্লোন সেন্টার বা বড় কোন বিল্ডিং ছিল না। পরিবারের কারো পরিকল্পনা ছিল না কোন আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার। যা হোক ঐদিন সকাল থেকে আমরা প্রতিদিনের মত রাস্তাঘাটে-সমুদ্রপাড়ে খেলাধূলায় ব্যস্ত সময় পার করছি। মনেও আসেনি যে ঐদিন রাতে এতবড় একটি ঘূর্ণিঝড় হবে। সন্ধ্যা হতে না হতেই চারিদিকে অন্ধকার, গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি আর হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বাতাস। আমরা ছেলে মানুষ আমাদের কোন ভয়ভীতি কাজ করছিল না। আশেপাশের প্রতিবেশীরা বলাবলি করছে রাতে নাকি ঘূর্ণিঝড় হবে। আব্বা-আম্মারাও শঙ্কিত হয়ে পড়েছিল কি করবে। আব্বা-আম্মাকে বলতে শুনেছি তাড়াতাড়ি যেন আমাদেরকে রাতের খাবার শেষ করে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। ততক্ষণে প্রচ- বাতাস আর বৃষ্টি প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে। আমার মনে আছে আব্বা গোয়াল ঘরে গিয়ে গরুগুলোকে ছেড়ে দিচ্ছে আর আমাদেরকে বলছে আল্লাহ্ আল্লাহ্ কর। কিছুক্ষণ পর পর আব্বা দরজা খুলে দেখছে বাহিরে কি অবস্থা। আব্বার অবশ্যই অভিজ্ঞতা আছে এরকম ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস দেখার। আমাদেরকে মাঝে মাঝে বলত ১৯৬০ সালের ঘূর্ণিঝড়সহ আরো কয়েকটি ঘূর্ণিঝড়ের অভিজ্ঞতার কথা। আমরা ঘরের মধ্যে আল্লাহ্ আল্লাহ্ করছি এরমধ্যে চতুর্দিকে প্রতিবেশীদের চিৎকার পানি পানি বলে। ততক্ষণাৎ আব্বা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে আমাদেরকে নিয়ে বাহির হওয়ার প্রস্তুুতি নিচ্ছেন। আমরা যখন ঘর থেকে বাহির হলাম তখন আমাদের বাড়ির উঠানে হাটুপানি। এখানে একটি কথা বলে রাখি আমাদের আম্মা দীর্ঘদিনের প্যারালাইসিসের রোগী, অন্যের সাহায্য ছাড়া চলতে পারে না। (বর্তমানে আব্বা-আম্মা দ্জুনেই ইন্তেকাল করেছেন। আম্মার মৃত্যু ২০০৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর আর আব্বা ইন্তেকাল করেছেন ২০১৭ সালের ২৫ এপ্রিল) যাই হোক দেখতে দেখতে পানির ¯্রােতে আমাদের রান্না ঘর ভেঙে গেল। আমি আর আব্বা ছাড়া বাকীরা সবাই রান্না ঘরের চালে উঠে পড়লাম। পানির ¯্রােত রান্না ঘরের চালে অবস্থান নেওয়া আমার আম্মা, ভাই-বোন সবাইকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল, তাদের আর দেখলাম না। আমি আব্বার সাথে থাকায় উনি আমাকে নিয়ে আমাদের একটি বড় ফুল গাছে উঠে পড়লেন। গাছে উঠে আবছা আবছা দেখলাম পুরো সাগর আর আমাদের বাড়ি একাকার হয়ে গেছে। খোলা আকাশে সারারাত আব্বা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে নিজে প্রচন্ড কষ্ট সহ্য করলেন। কি কষ্ট যে পেলাম তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। যাই হোক সকাল হলো। সকালে দেখি সব ধূলিস্যাৎ হয়ে গেছে। কাচা-আধা পাকা সব ঘর মাটির সাথে মিশে গেছে। গাছপালা উপড়ে গেল, আগের দিনের যে চিত্র তা উল্টো হয়ে গেল। নেই কোন মানুষজন, গবাদী পশু। পুরো এলাকায় যেন পানি আর পানি। আমাদের যে বেড়ীবাঁধ ছিল তা মাটির সাথে সমান হয়ে গেল। ভাবলাম এই বুঝি কেয়ামত। আব্বা আর আমি ছাড়া আর কেউ নেই। এখন খুজতে লাগলাম আম্মা কোথায়, আমার অন্য ভাই বোন এরা কোথায়, কারো কোন দেখা নেই। আম্মা অসুস্থ থাকায় বেশী চিন্তায় ছিলাম বুঝি আম্মা আর বেচে নাই। রাখে আল্লাহ মারে কে-আম্মা ছিল আমার সেজ ভাইয়ের সাথে, ছোট বোন ছিল মেজ ভাই এর সাথে। আরেক ছোট ভাই হয়ে গেল একা। নিজের জীবন বাজি রেখে সেজ ভাই আম্মাকে ধরে রাখলেন। আর মেঝ ভাই ধরে রাখলেন ছোট বোনকে। আশ্চর্য্যজনক হলেও সত্যি যে সকালে সবার আগে আমি দেখেছি আম্মাকে সুস্থ অবস্থায় সেঝ ভাই নিয়ে এসেছে। আম্মাকে পেয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলাম। সন্ধ্যার দিকে ছোট বোনকে নিয়ে মেঝ ভাই এসেছে। শুনেছি মেঝ ভাই ছোট বোনসহ সাঙ্গু নদী পাড়ি দিয়ে জুঁই দন্ডী ইউনিয়নে চলে গিয়েছিল। যা হোক বাঁচানোর মালিক আল্লাহ। ঘরের সবাই আসলেও আসছে না ছোট ভাই জালাল সে বর্তমানে সেনাবাহিনীতে কর্মরত আছে । একবার ভাবলাম সে বেঁচে নাই। এরই মধ্যে আশেপাশের অনেক প্রতিবেশীর মৃত্যুর খবর পেলাম। হতবাক হলাম কি হল গতকাল। যে লোককে গতকাল আমাদের মাঝে দেখেছি তিনি এখন আর নেই। অনেকেই নেই “ অল্প শোকে কাতর অধিক শোকে পাথর” এই প্রবাদই বাস্তব হল । সবার মৃত্যু দেখে কান্না যেন আর আসে না। পরের দিন দেখলাম মরা মানুষের সাথে গবাদী পশু, মানুষ খুজছে তার প্রিয় আপনজনকে যে যার মত করে। কেউ খুজে পাচ্ছে কেউ পাচ্ছে না। এমনও দেখেছি মরা মানুষকে কুকুর খাচ্ছে। আমার যেই বয়স সেই বয়সে এমন দৃশ্য কি কল্পনা করা যায় ? অবশ্য ২/১ দিন পর নৌবাহিনী /সেনাবাহিনী এবং অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এগিয়ে এসেছে বেওয়ারিশ লাশ দাফনের জন্য। ছোট ভাইয়ের কথাতো বলা হয়নি সে ৩দিন পর ফেরত এসেছে বাঁশখালী থেকে। ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছ্বাসে বাঁশখালীতে ভেসে গিয়েছিল। এই ঘূর্ণিঝড়ে আপনজনের এক হ্নদয় বিদারক বর্ণনা না দিয়ে পারছি না। তিনি হলেন আমার আপন বড় বোন। উনার ২ ছেলে ৩ মেয়ে নিয়ে গোছানো সুন্দর সংসার। এই ঘূর্ণিঝড়ে তার স্বামীসহ ২ ছেলে ৩ মেয়ে হারিয়ে প্রায় পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। এমন হতভাগ্য অবস্থা কি মেনে নেওয়া যায় তবুও মেনে নিতে হবে, আল্লার ইচ্ছা । অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী হারিয়ে পুরো এলাকা জুড়ে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল যা বলার মত নয়। ২৫ বছর আগে ঘটে যাওয়া এই ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ের কথা মনে পড়লে আজও যেন শরীর শিহরিয়ে উঠে। পরিশেষে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি আল্লাহ যেন এমন বিপদের মুখোমুখি আমাদের আর না করে এবং ঘটে যাওয়া বিপদ যেন মন থেকে ভুলে গিয়ে আমরা সাহসিকতার সহিত সামনে এগিয়ে যেতে পারি। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন । এই ঘূর্ণিঝড়ে যারা ইন্তেকাল করেছেন আল্লাহ তাঁদের বেহেস্ত নসিব করুন।

বিপদে মোদের রক্ষা করো এই নহে মোর প্রার্থনা

বিপদকে যেন করিতে পারি জয়।

লেখক : বজলুল হক, সাধারণ সম্পাদক- লাভ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন