মদের বোতলে চুড়ান্ত আঘাত

71

মুহাম্মদ আতিকুল ইসলাম

মদ্যপান বর্তমান সময়ে পাপাচারের ঝর্ণাধারা ও সন্ত্রাসের শষ্যক্ষেত্র এবং ইবলিশের ডাইনিং টেবিলে পরিণত হয়েছে।মদের সাথে সম্পৃক্ত সকল শ্রেণীর মানুষই আজ আত্বঘাতী, যা সমাজ, দেশ,মনুষ্যত্ব সর্বোপরি এবং বিশ্বব্যাপী ডেকে আনছে মহা বিপর্যয়। তাই এই মরণ থাবা থেকে বাচঁতে আজই মদকে বর্জন করি।সাথে সাথে মদের বোতলে চূড়ান্ত আঘাত করে সঠিক পথের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে দেরী না করি।না হয় বেশী দিন লাগবেনা আপনি ব্যক্তিজীবন ও সমাজ জীবনে মেরুদণ্ডহীন হইতে,তখন আপনাকে অন্যের গলগ্রহ হয়ে থাকতে হবে।আর ব্যক্তিজীবনে যেমন মাদক স্বাস্থ্য, সম্পদ, মান-সম্মান, প্রভাব -প্রতিপত্তি নষ্ট করে ব্যক্তিকে করে তোলে সমাজের ঘৃণ্য ও নিন্দার পাত্র,তেমনি তাদের মাঝে দেখা দেয়,অস্বাস্থ্য, অলসতা,অকর্মন্যতা এবং সামাজিক অপরাধের সীমাহীন নিষ্টুরতা। ধ্বসে যায় তার রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, চাকরি,সামাজিক, মূল্যবোধের মতো বহু অমূল্য গুনগুলো, বরং সে সাধারণ ছোট বাচ্চাদের নিকটও হাসি ঠাট্টার পাত্রে পরিণত হয়। অথচ ইসলামে মদ্যপান কে অবৈধ ঘোষণা করে দেড়হাজার বছর পূর্বেই মানবজাতি কে হুশিয়ারী করা হইয়াছে। মহান আল্লাহর দূত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যান্ত দরদি ও কঠোর কন্ঠে আহবান করেছেন, মাদক কে রুখে দাড়াঁও।সুস্থ সুন্দর সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তোলো। ইসলামের এই আহবান কে পাশ্চাত্য দেশগুলো মিথ্যা প্রমাণিত করতে বহু ঠাট্টাবিদ্রোপ করেছিল। অথচ এখন মাদক বিরুধী জনমত গঠনে বিশ্বের প্রতিটি দেশেই নানা ফোরাম গড়ে উঠেছে। অবশেষে ইসলামের সুমহান বাণী যা দেড়হাজার বছর পূর্বে অনুন্নত দেশে নবী মুহাম্মদ সা:ঘোষণা করেছিল তা আজ উন্নত বিশ্বের ও বিশ্বমানবের জন্য যে মাইলফলক অর্থাৎ চিরন্তন সত্য তা প্রমাণ করলো পশ্চিমারাই।

মদপানে,শারীরিক,মানসিক, সামাজিক,রুহানি, অর্থনৈতিক, ক্ষতির সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরেছি।আশা করি পাঠক মহল উপকৃত হবে ইনশাআল্লাহ।

ইসলামে মদ্যপান হারাম:-

রাব্বে কারীম ইরশাদ করেছেন :-তারা মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে,বলে দাও এতদুভয়ের মধ্যে রয়েছে মহাপাপ,আর মানুষের জন্য উপকারিতাও রয়েছে তবে এগুলোর পাপ উপকারিতা অপেক্ষা অনেক বড়।(সুরা বাকারা ২১৯) উক্ত আয়াতের সংক্ষিপ্ত তাফসির:-
মদ ও জুয়াতে যদিও বাহ্যিক দৃষ্টিতে কিছু উপকারিতা পরিলক্ষিত হয়।কিন্তু দু’টির মাধ্যমেই অনেক বড় বড় পাপের পথ উন্মোক্ত হয় যা এর উপকারিতার তুলনায় অনেক বড় ও ক্ষতিকর। পাপ অর্থে এখানে সে সব বিষয় ও বোঝানো হয়েছে যা পাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
যেমন মদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বড় দোষ হচ্ছে এই যে,এতে মানুষের সব চাইতে বড় গুণ, বুদ্ধি বিবেচনা বিলুপ্ত হয়ে যায়।কারণ বুদ্ধি এমন একটি গুণ যা মানুষ কে মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। পক্ষান্তরে যখন তা থাকেনা তখন প্রতিটি মন্দ কাজের পথই সুগম হয়ে যায়।( তাফসীরে মা’রেফুল কোরআন)

রাসুল সা:এর লা’নত:-

রাসুলুল্লাহ সা:মদ সম্পর্কে কঠোর শাস্তির ভয় প্রদর্শন করেছেন ইরশাদ হয়েছে।সর্বপ্রকার এবং অশ্লীলতার জন্মদাতা হচ্ছে মদ এটি পান করে মানুষ নিকৃষ্ট পাপে লিপ্ত হয়ে যেতে পারে। তিরমিযীতে হযরত আনাস রা:রাসুল সা:থেকে বর্ণনা করেছেন যে,রাসুল সা:মদের সাথে সম্পর্ক রাখে এমন দশ ব্যক্তির ওপর লা’নত করেছেন।
১.যে লোক নির্যাস বের করে ২.প্রস্তুত কারক ৩.
পানকারী ৪.যে পান করায় ৫.আমদানীকারক ৬. যার জন্য আমদানী করা হয় ৭.বিক্রেতা ৮.ক্রেতা
৯.সরবরাহকারী এবং ১০.এর লভ্যাংশ ভোগকারী

আল্লাহর যিকির হতে বিরত রাখে :-

অন্য কোন ইবাদত অথবা আল্লাহর কোন যিকির করাও সম্ভব হয় না। সে জন্যই কোরআন করীমে ইরশাদ হয়েছে :-শরাব তোমাদিগকে আল্লাহর স্বরণ ও নামাজ থেকে বিরত রাখে। নেশাগ্রস্থ অবস্থায় নামাজ পড়া চলেনা সুরা নিসা-৪৩ নং আয়াতে বলা হয়েছে। হে ঈমানদারগণ তোমরা যখন নেশাগ্রস্থ থাক তখন নামাজের ধারে কাছেও যেওনা

শরীরের মারাত্মক শত্রু:-

অনেক মাদকদ্রব্য আছে, যা সেবন করলে কিডনি বিনষ্ট হয়।মস্তিস্কের লক্ষ লক্ষ সেল ধ্বংস হয় যা চিকিৎসার মাধ্যমেও পুন:সচল হয়না। মদপানে ধীরে ধীরে মানুষের হজম শক্তি বিনষ্ট হয়ে যায়। খাদ্য স্পৃহা কমে যায়।চেহেরা বিকৃত হয়ে যায়।স্নায়ু দুর্বল হয়ে আসে। শারীরিক সক্ষমতার ওপর চুড়ান্ত ক্ষতি সাধন করে। একজন জার্মান ডাক্তার বলেছেন :-যারা মদ্যপানে অভ্যাস্ত তারা চল্লিশ বছর বয়সে ষাট বছরের বৃদ্ধের মত অকর্মন্য হয়ে যায়।এবং তাদের শরীরের গঠন এত হাল্কা হয়ে যায় যে ষাট বছরের বৃদ্ধের ও তেমনটি হয়না। তা ছাড়া মদ লিভার এবং কিডনীকে সম্পুর্ণভাবে বিনষ্ট করে ফেলে।যক্ষ্মা রোগ মদপানেরই একটি বিশেষ পরিণতি। ইউরোপের শহরাঞ্চলে যক্ষ্মা আধিক্যের কারণও অতিমাত্রায় মদ্যপান। সেখানকার কোন কোন ডাক্তার বলেছেন ইউরোপে অধিক মৃত্যুর কারণই হচ্ছে যক্ষ্মা। যখন থেকে ইউরোপে মদপানের আধিক্য দেখা দিয়েছে, তখন থেকে সেখানে যক্ষ্মার প্রাদুর্ভাব ও দেখা দিয়েছে। চিকিৎসকবিদগণ সবাই একমত যে মদ কখনো শরীরের অংশে পরিণত হয়না। এতে শরীরের রক্ত ও সৃষ্টি হয় না। রক্তের মধ্যে একটি সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হয় মাত্র।ফলে সাময়িকভাবে শক্তির সামান্য আধিক্য অনুভূতি হয় কিন্তু হঠাৎ রক্তের এ উত্তেজনা অনেক সময় মৃত্যুর কারণ হয়ে দাড়াঁয়। যা সম্প্রতি আমরা নিয়মিত সংবাদ পত্রে দেখতেছি।
যে সব শিরা ও ধমনীর মাধ্যমে সারা শরীরে রক্ত প্রবাহিত হয়ে থাকে মদ্যপানের দরুণ সে গুলো শক্ত ও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে দ্রুতগতিতে বার্ধাক্য এগিয়ে আসতে থাকে। মদের দ্বারা মানুষের গলদেশ এবং শ্বাসনালীর ও প্রচুর সা
ক্ষতি সাধিত হয়।ফলে স্বর মোটা হয়ে যায়।এবং স্থায়ী কফ হয়ে থাকে, তারই ফলে শেষ পর্যন্ত যক্ষ্মা রোগের সৃষ্টি হয়।

বংশহীন হয়:-

মদের প্রতিক্রিয়া উত্তরাধিকার সুত্রে সন্তানদের ওপর ও পড়ে। মদ্যপায়ীদের সন্তান দুর্বল হয় এবং অনেকে তাতে বংশহীনও হয়ে পড়ে।

মদ শরীরের জন্য বিষাক্ত বিষ:-

মদ্যপানের শুরুতে কিছুটা চঞ্চলতা ও স্ফুর্তি এবং শক্তি অনুভব করে ডা.দের মতামত কেও পাত্তা দেয়না। অথচ মদ একটি বিষাক্ত দ্রব্য যার বিষক্রিয়া ধারাবাহিকভাবে দৃশ্যমান হতে থাকে এবং কিছুদিনের মধ্যে ভয়াংকর ক্ষতি প্রকাশ পায়।

ঝগড়া -বিবেদ সৃষ্টি করে :-

সুরা মায়েদার ৯১ নং আয়াতে বলা হয়েছে :-শয়তান শরাব ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে পরস্পরিক বিদ্বেষ ও শত্রুতা সৃষ্টি করতে চায়।যা বাস্তব জীবনে আমরা দেখতে পাচ্ছি।

গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যায়:-

মাদক সেবনে মানুষ অজ্ঞান হয়ে পড়ে তখন সে নিজের গোপন কথাও প্রকাশ করে দেয়। যার পরিণাম অনেক সময় অত্যান্ত মারাত্বক ও ভয়াবহ আকার দেখা দেয়।বিশেষ করে সে ব্যক্তি যদি কোন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত থাকে, তবে তার দ্বারা বে ফাঁসভাবে কোন গোপন তথ্য প্রকাশিত হওয়ার ফলে সারা দেশেই পরিবর্তন ও বিপ্লব সৃষ্টি হয়ে যেতে পারে। দেশের রাজনীতি এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রের কৌশলগত গোপন তথ্য শত্রুুর হাতে চলে যেতে পারে বিচক্ষণ গুপ্তচরেরা এ ধরণের সুযোগ গ্রহণ করে থাকে।

হত্যাকান্ডের সহায়ক :-

মদ্যপান সকল মন্দ থেকে মন্দতর কাজে চালিত করে।ব্যভিচার ও নর হত্যার অধিকাংশই এর পরিণাম। আর এ জন্য অধিকাংশই শরাব খানা ব্যভিচার যেনায় ও হত্যাকান্ডের আখড়ায় পরিণত হয়।

আর্থিক ক্ষতি:-

যদি কোন এলাকায় একটি শরাবখানা খোলা হয়।তবে তা সমস্ত এলাকার টাকা পয়সা লুটে নেয়।একথা সর্বজনবিদিত এ ব্যায়ের পরিমান ও পর্যায় বহুরকমের। একজন বিশিষ্ট পরিসংখ্যানবিদের সংগৃহীত তথ্যানুযায়ী শুধু একটি শহরে মদের মোট ব্যয় সামগ্রীক জীবন যাত্রার অন্যান্য সকল ব্যায়ের সমান।এই হলো মদের ধর্মীয় পার্থিব শারীরিক এবং আধ্যত্বিক। ক্ষতির একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা যা রাসুল সা:একটি বাক্যের মাধ্যমে প্রকাশ করেছে
(উম্মুল ফাওয়াহিশা ওয়া উম্মুল খ’বাইছ) অর্থাৎ “মদ সকল মন্দ ও অশ্লীলতার জননী”এ প্রসঙ্গে জনৈক জার্মান ডাক্তারের মন্তব্য প্রবাদ বাক্যের মতোই প্রসিদ্ধ। তিনি বলেছেন,যদি অর্ধেক শরাবখানা বন্ধ করে দেয়া হয়।তবে আমি নিশ্চয়তা দিতে পারি,যে অর্ধেক হাসপাতাল -অর্ধেক জেলখানা আপনা থেকেই অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাবে। (তাফসীরে আল-মানার :মুফতি আব্দুহু-পৃ:২২৬-জিলদ-২)

লেখক:-গবেষক, সেক্রেটারি, আল-কোরআন ফাউন্ডেশন, পেকুয়া, কক্সবাজার।
E-mail : m.atikulislam2019@gmail.com