কারা আইনের কথা

40

এড. সামশুল আলম কুতুবী
অপরাধীকে সমাজ সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার স্থান “কারাগার” আমরা জেলখানা বলি। কারাগার ব্যবস্থা চালু হয় ১৭৮৮ সালে বৃটিশ আমলে। আদিতে কারাগার ছিল হত্যা, খুন ও দৈহিক নির্যাতনের বিকল্প ব্যবস্থা।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেখা যায় আদালতের আদেশে কোন অপরাধীকে আটক রাখা কিংবা ছেড়ে দেয়া কারাগার প্রশাসনের কাজ। কারাগারে আটক থাকা অবস্থায় তার অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার দায়িত্ব কারা প্রশাসনের। কারাগার পরিচালনার কাজ ৩(তিন) ভাগে বিভক্ত যথা (১) আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন (২) কারাগারের নিরাপত্তা বিধান ও (৩) বন্দিদের স্বাস্থ্য রক্ষা। বন্দী অবস্থায় অপরাধী যাতে পলায়ন ও কারা বিদ্রোহ করতে না পারে তার প্রতি সজাগ দৃস্টি রাখা। বৃট্রিশ আমলে বাংলাদেশের রাজশাহীতে সর্বপ্রথম কেন্দ্রিয় কারাগার প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৬৪ সালে কারাগার পরিচালনার জন্য জেল কোড প্রণয়ন করা হয়। আইনের স্বাভাবিক নীতি হল অপরাধী আদালত কর্তৃক যতক্ষণ দোষী প্রমানিত না হবে তৎক্ষণ সে নির্দোষ। কিন্তু কোন ব্যক্তি গ্রেফতার হওয়ার সাথে সাথে তার স্বাধীনভাবে থাকার অর্থাৎ তার সমস্ত মৌলিক অধিকার রহিত হয়ে যায়। জামিন না হলে তাকে বিচার প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারাগারে থাকতে হয়। যদি সে নির্দোষ প্রমানিত হয় তাহলে কারাগার থেকে মুক্তি পায়। কারাগারে থাকার ফলে তার জীবনের মূল্যাবান সময় নষ্ট হয়ে যায়। অপুরণীয় ক্ষতির কারণে তার মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃস্টি হয় এবং সামাজিক মর্যাদা পারিবারিক বন্দন ও দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। দীর্ঘকাল বিনা বিচারে হাজতবাস/ অন্যায়ভাবে আটক থাকার কারণে বন্দীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ দেখা দে এবং অতিষ্ট হয়ে উঠে। এহেন অবস্থায় কারা কর্মচারীরা শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য বন্দীদের প্রতি অমানুষিক আচরণ করিয়া তাদের জীবন আরো চরম অসহায়ত্বের সীমানায় নিয়া যায়। কারা কর্তৃপক্ষ শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য কোমল মনের পরিচয় দিয়া বন্দীদের প্রতি অভিভাবক হিসাবে মানবিক আচরণ করে বন্দীদের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনায় চেষ্টা চালাইয়া যাইতেছে। কারা ব্যবস্থাপনার সাথে রাষ্ট্রযন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ জড়িত। তাছাড়াও আদালত, পুলিশ প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, পূর্ত বিভাগ, খাদ্য বিভাগ এবং সমাজ কল্যাণ বিভাগও জড়িত। সবার সম্মিলিত ভুমিকার উপর কারা প্রশাসনের সাফল্য নির্ভর করে।
অতীতে কারা সংস্কারের লক্ষ্যে অনেক কার্য্যকরী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কারাগারের ভিতর বন্দীদের প্রত্যেকের উপযুক্ততা মতে উৎপাদন কাজে নিয়োজিত করার কিঞ্চিত ব্যবস্থা করেছে মাত্র। বন্দীদের কারাগারে ব্যাপক উৎপাদনমূলক কাজে নিয়োজিত করিতে পারিলে প্রত্যেকের অপরাধী মন পরিবর্তন হইয়া কর্মীরূপে পরিবর্তিত হইয়া দেশ ও সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখিতে পারিবে। কারাগারে রাজনৈতিক বন্দীদের অন্যান্য অপরাধীদের মত ব্যবহার করা সমিচিত নহে।
বৃষ্টিশ আমলে ১৯৩৭ সালে জেল কোড সংস্কার করা হয়। শিশুদের আইন হিসেবে বিশেষ সুবিধা দিয়া জেল কোড সংস্কার করার সময়ের দাবী। ভিকটিমকে নিরাপদ হেফাজতে রাখার আইন, অপরাধীকে সংশোধন মূলক প্রবেশনের আইন, বিদেশী নাগরিক, ডিটেন্যু দৈহিক মানষিক ও বুদ্ধি প্রতিবন্দীদের জন্য জেলকোড সংস্কারের মাধ্যমে ও সরকারের নির্বাহী আদেশে কারাগার পরিচালিত হয়ে আসিতেছে। একইভাবে কারা আইন, বন্দী আইন, বন্দী সনাক্তকরণ আইন, একইভাবে পরিচালিত হয়ে আসিতেছে। নালিশের মাধ্যমে মামলা শুরু আদালতের রায় ঘোষণার মাধ্যমে তার সমাপ্তি। রায়মতে তা কার্যকর করার দায়িত্ব একমাত্র কারা কর্তৃপক্ষের। সাজার নমুনা হচ্ছে অপরাধীর দৈহিক, আর্থিক ও মানসিক ক্লেশ সৃষ্টি করা। সাজার উদ্দেশ্য হচ্ছে অপরাধীকে সংশোধন করা যাতে ভবিষ্যতে কোন অপরাধ না করে। আদালত ৭ (সাত) প্রকার সাজা প্রদান করে থাকে, তৎমধ্যে (১) মৃত্যুদন্ড (২) যাবজ্জীবন কারাদন্ড (৩) সশ্রম কারাদন্ড (৪) বিনাশ্রম কারাদন্ড (৫) সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত (৬) জরিমানা ও (৭) বেত্রদন্ড। সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও জরিমানা ব্যতিত অন্যান্য ৫ প্রকারের সাজা কারাগার কার্যকর করিয়া থাকে। আদালত ব্যতিত অন্য কারো সাজা প্রদানের অধিকার নাই। কারাদন্ডে দন্ডিত ব্যক্তিকে কারাগার ব্যতিত অন্য কোথাও রাখার বিধান নাই। বর্তমানে বেত্রদন্ডের প্রয়োগ বিরল। কারাজীবন, বিষন ক্লেশের, দু:খ কষ্টের জীবন পূর্ব থেকে এই কারাজীবন সর্ম্পকে জানা থাকিলে মানুষ হঠাৎ রাগের বশে, লোভের কারনে অপরাধ সংগঠন হইতে বিরত থাকিত। জ্ঞানীরা বলেন মাসে একবার হলেও কারাবন্দীদের দেখতে যাবে। কারাবন্দীদের দু:খ ক্লেশ দেখলে মন থেকে অপরাধ প্রবনতা দুর হবে।
হাসপাতালে রোগীদের দেখতে যাবে। রোগিদের করুন অবস্থা দেখে শরীরে প্রতি যত্ন নেওয়ার এবং বেহিসাবি চলা থেকে হুসিয়ার হবে। কবরস্থানে জেয়ারত করতে যাবে। তাতে দুনিয়ার প্রতি লোভ ও দীর্ঘ জীবনের আশা দুর হবে।
সিভিল আদালত সিভিল বন্দীকে কারাগারে প্রেরণ করেন। সিভিল বন্দীর খাবারের খরচ ডিগ্রীদার বহন করে থাকেন কারা কর্তৃপক্ষ নয়।
জেল কোডে কারাগার পরিচালনার জন্য ১৩৫০টি বিধি রয়েছে। প্রয়োজনে সময় সময় সরকার আরো বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা রাখে। বাংলাদেশে ১০টি কেন্দ্রিয় কারাগার ও ৫৫টি জেলা কারাগার রয়েছে।
লেখক : প্রফেসর আইন কলেজ, কক্সবাজার।