একজন সুর সাধকের বিদায়

71

সব কটা জানালা খুলে দাও না’, ‘মাঝি নাও ছাইড়া দে ও মাঝি পাল উড়াইয়া দে’, ‘সেই রেল লাইনের ধারে’, ‘সুন্দর সুবর্ণ তারুণ্য লাবণ্য’, ‘ও আমার আট কোটি ফুল দেখ গো মালি’, এই কালজয়ী গানগুলোর সুর স্রষ্টা খ্যাতমানা গীতিকার, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক ও মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল আর নেই। দীর্ঘদিন ধরে হৃদযন্ত্রের সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। গত বছরের জুনে কলকাতায় তাঁর হৃদযন্ত্রের ধমনীতে দুটি স্টেন্টও লাগানো হয়েছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। গতকাল মঙ্গলবার ভোরে ঢাকার আফতাবনগরের বাড়িতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নাল্লিাহি..রাজিউন)। ৬৩ বছরের এই শিল্পীর মৃত্যুতে গোটাদেশে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মাত্র ১৫ বছর বয়সে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। ১৯৭০’এর দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে দেশাত্মবোধক গান দিয়ে সুরকার হিসেবে যাত্রা শুরু করেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। তবে তিনি নিজে কখনো গায়ক হওয়ার ইচ্ছে পোষণ করেননি। আমার স্বপ্ন ছিল যে আমি গান লিখবো। যিনি গান গান, তিনি গান গাইবেন। আমি একাধারে গান লিখবো, গান সুর করবো – এমন দুঃস্বপ্ন কখনো দেখিনি,” এভাবেই নিজের সম্পর্কে বলেছিলেন তিনি।

সঙ্গীতে অনন্য অবদানের জন্য বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, রাষ্ট্রপতি পুরস্কার-সহ অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। বুলবুলের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক ও পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। কালজয়ী অসংখ্য বাংলা গানের স্রষ্টা বুলবুলকে বুধবার (২৩ জানুয়ারি) ঢাকার মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

তিনি সুরকারই ছিলেন একজন মুক্তিযুদ্ধা মাত্র ১৫ বছর বয়সে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেন। অগস্টে ভারতের আগরতলায় কিছুদিন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং ঢাকায় ফিরে ‘ওয়াই (ইয়াং) প্লাটুন’ নামে একটি গেরিলা দল গঠন করেন। এরপর বুলবুল পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আটকও হন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয়ী হওয়ার পর মুক্তিবাহিনী রমনা থানা থেকে আহতাবস্থায় তাকে উদ্ধার করেন।

পরবর্তীতে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ১৯৭৬ সাল থেকে সাল থেকে নিয়মিত গান করেন। ১৯৭৮ সালে মেঘ বিজলি বাদল ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন।১৯৮৪ সালে বেলাল আহমেদের পরিচালিত নয়নের আলো চলচ্চিত্রের গীত রচনা ও সঙ্গীত পরিচালনা করেন তিনি। সেই চলচ্চিত্রের তার লেখা ‘আমার সারাদেহ খেয়োগো মাটি’, ‘আমার বাবার মুখে’, ‘আমার বুকের মধ্যেখানে’, ‘আমি তোমার দুটি চোখের দুটি তারা হয়ে’ গানগুলো জনপ্রিয়তা পায়।

তিনি স্বাধীনভাবে গানের অ্যালবাম তৈরি করেছেন এবং অসংখ্য চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন। তিনি সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা, সৈয়দ আব্দুল হাদি, এন্ডু কিশোর, সামিনা চৌধুরী, খালিদ হাসান মিলু, জেমস, আগুন, কনক চাঁপা-সহ বাংলাদেশী প্রায় সকল জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পীদের নিয়ে কাজ করেছেন। বুলবুল সঙ্গীত প্রতিভা অন্বেষণে বাংলাদেশের রিয়েলিটি অনুষ্ঠান ক্লোজআপ ওয়ানের তিন মৌসুমে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিন আগে গত ২ জানুয়ারি ফেসবুকে একটি ছবি পোস্ট করে নিজেকে সর্বশেষ ভক্ত শ্রোতাদের সামনে তুলে ধরেন এই বরেণ্য শিল্পী। কলকাতা থেকে ঢাকা ফিরে আসার পথে এয়ারপোর্টে বসে তার তোলা ছবিটি তিনি পোস্ট করেন নিজের ওয়ালে। ছবির ক্যাপশনে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমাকে যেন ভুলে না যাও, তাই একটা ছবি পোস্ট করে মুখটা মনে করিয়ে দিলাম।’ ক্যাপশনের সঙ্গে ইমোজি হিসেবে ছিল বাংলাদেশের পতাকা।

‘সব ক’টা জানালা খুলে দাও না’- গানটি বাংলাদেশ টেলিভিশনে বাংলা সংবাদ ও ইংরেজি সংবাদের শুরুতে (ইনসিগনিয়া হিসেবে) ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়াও অসংখ্য জনপ্রিয় গানের সুরকার কিংবা গীতিকার ছিলেন বুলবুল। এ সব গানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হল- ‘আইলো দারুণ ফাগুনরে’, ‘আমার একদিকে পৃথিবী একদিকে ভালোবাসা’ ‘আমি তোমার দুটি চোখে দুটি তারা হয়ে থাকবো’ ‘আমার গরুর গাড়িতে বৌ সাজিয়ে, ‘পৃথিবীর যত সুখ আমি তোমারই ছোঁয়াতে যেন পেয়েছি’ ‘তোমায় দেখলে মনে হয়, হাজার বছর আগেও বুঝি ছিল পরিচয়’ ‘কত মানুষ ভবের বাজারে’ ‘তুই ছাড়া কে আছে আমার জগৎ সংসারে’ ‘বাজারে যাচাই করে দেখিনি তো দাম’ ‘আম্মাজান আম্মাজান’ ‘স্বামী আর স্ত্রী বানায় যে জন মিস্ত্রি’ ‘আমার জানের জান আমার আব্বাজান’ ‘ঈশ্বর আল্লাহ বিধাতা জানে’ ‘এই বুকে বইছে যমুনা’ ‘সাগরের মতই গভীর আকাশের মতই অসীম’ প্রেম কখনো মধুর, কখনো সে বেদনা বিধুর’ ‘আমার সুখেরও কলসি ভাইঙ্গা গেসে লাগবে না আর জোড়া, ‘পৃথিবীর জন্ম যেদিন থেকে’ ও ‘তোমার আমার প্রেম সেদিন থেকে’।

অন্য গানগুলো হলো- ‘পড়েনা চোখের পলক’, ‘যে প্রেম স্বর্গ থেকে এসে’, ‘প্রাণের চেয়ে প্রিয় ‘কী আমার পরিচয়’ ‘অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে’ ‘তুমি আমার জীবন আমি তোমার জীবন’ ‘তোমার আমার প্রেম এক জনমের নয়’ ‘তুমি হাজার ফুলের মাঝে একটি গোলাপ’ ‘জীবনে বসন্ত এসেছে ফুলে ফুলে ভরে গেছে মন’ ‘আমার হৃদয় একটা আয়না’ ‘ফুল নেব না অশ্রু নেব’, ‘বিধি তুমি বলে দাও আমি কার’ ‘তুমি মোর জীবনের ভাবনা হৃদয়ে সুখের দোলা’, ‘তুমি আমার এমনই একজন’ এবং ‘যারে এক জনমে ভালবেসে ভরবে না এ মন।’ এ রকম অসংখ্য জনপ্রিয় বাংলা গানের সুর করেছেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল।

শুধু তাই নয়, যুদ্ধাপরাধ মামলায় সাক্ষী দিয়েছিলেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। অনেকেই যেখানে টাকা আর জীবনের হুমকিতে স্বাধীনতা বিরোধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে সাক্ষী দিতে চাননি, চুপ থেকেছেন দিনের পর দিন; সেখানে বাঘের মতোই বীরত্ব দেখিয়েছেন এই গানের মানুষ। তিনি আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলেছেন সত্যের কথা, ন্যায়ের পক্ষে, রাষ্ট্রের হয়ে। মৃত্যু তাকে পিছপা করতে পারেনি। কিন্তু এই সাক্ষ্য দেয়ার বিনিময়ে অনেক চড়া মূল্যই দিতে হয়েছে তাকে। হারিয়েছেন ছোট ভাইকে। ভাইয়ের মৃত্যু তাকে হতবাক করে দিয়েছিল, হতাশাও। তিনি মেনে নিতে পারেননি, স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনতার নেতৃত্ব দেয়া দলের শাসনামলে স্বাধীনতার বিরোধীদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দেয়ার বিনিময়ে ভাই হারাতে হবে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে। রাজধানীর খিলগাঁও রেললাইনে পাওয়া গিয়েছিল বুলবুলের ভাইয়ের গলাকাটা লাশ। ভাইয়ের শোক নিয়ে ঘর থেকেই বের হতেন না গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। নিরবে নিভৃতে কাটিয়েছেন জীবনের শেষ দিনগুলো। এর মধ্যে আসে তারও মৃত্যুর হুমকি। এরপর থেকে সরকারি নিরাপত্তার বলয়ে বাঁধা পড়েন তিনি।

প্রায় ছয় বছরের গৃহবন্দী জীবন নিয়ে হাঁপিয়ে উঠছিলেন এই কিংবদন্তি। তার সঙ্গী বলতে ছিল একমাত্র পুত্র সামির ও একান্ত সহকারী রোজেন। গান তেমন নিয়মিত করতেন না। গানের মানুষদের সাথেও আড্ডা বা মেলামেশা কমে গিয়েছিল। যখন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন, গৃহবন্দী থেকে মুক্ত মনে হয় কি না জানতে চাইলে গণমাধ্যমে বুলবুল হতাশা নিয়ে বলেছিলন, ‘আমার গৃহবন্দী জীবন অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এখন আর কিছু মনে হয় না। আপনি তো ভালোভাবে বোঝেন যে, হার্টের চিকিৎসার পর আবার কিন্তু এই চার দেয়ালের মধ্যেই আসতে হবে। এটা কিন্তু সমাধান না। তাই না? আপনারা হার্টটা ঠিক করে আবার এই জায়গাটায় পাঠিয়ে দেবেন, হার্টটা আবার নষ্ট হবে। আপনারা মুক্ত করে দেন।’

গত ৪০ বছরে মরনের পরে, আম্মাজান, প্রেমের তাজমহল, অন্ধ প্রেম, রাঙ্গা বউ, প্র্রাণের চেয়ে প্রিয়, পরেনা চোখের পলক, তোমাকে চাই, লাভ স্টোরি, ভুলোনা আমায়, আজ গায়ে হলুদ, লাভ ইন থাইল্যান্ড, আন্দোলন, মন মানে না, জীবন ধারা, সাথি তুমি কার, হুলিয়া, অবুঝ দুটি মন, লক্ষ্মীর সংসার, মাতৃভূমি, মাটির ঠিকানাসহ দুইশ শতাধিক চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করেন বুলবুল।

প্রেমের তাজমহল সিনেমার জন্য তিনি ২০০১ সালে এবং হাজার বছর ধরে সিনেমার জন্য ২০০৫ সালে শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালকের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। দেশের সংগীত অঙ্গনে অবদানের জন্য ২০১০ সালে সরকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলকে একুশে পদকে ভূষিত করে। সুরের মায়া কাটিয়ে চিরবিদায় নিলেন বরেণ্য সুরকার, গীতিকার, সংগীত পরিচালক মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। হয়তো আর দেখা যাবেনা এই সংগীত প্রেমীকে। কিন্তু তার কালজয়ী গানগুলো স্মৃতি হয়ে চিরদিন বাজবে মানুষের হৃদয়ে।