স্বাধীনতার আগে-পরের নির্বাচন ও আমাদের ‘চেতনা’

109

আহমদ গিয়াস

প্রায় ৪৭ বছর আগে বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে ‘স্বাধীন’ হয়েছে। এরপর আমরা অনেকগুলো নির্বাচনের মুখোমুখি হয়েছি। অনেক সরকার দেখেছি। সামনে আরো একটি নির্বাচন। কিন্তু এই নির্বাচন কীভাবে হবে, আমরা ভোট দিতে পারব কীনা- তা আমরা আম জনতা এখনও নিশ্চিত নই। কারণ এটা শাসকদের মর্জির ব্যাপার।
স্বাধীনতার অব্যাবহিত আগে আমার জন্ম। তাই স্বাধীনতার আগের নির্বাচন আমি দেখিনি। স্বাধীনতার অব্যাবহিত পরের নির্বাচনও কেমন হয়েছিল, তা আমার মনে নেই। তবে সত্তর দশকের শেষ দিকের নির্বাচন থেকে শুরু করে বাকী নির্বাচনগুলোর কথা আমার মনে আছে। কিন্তু স্বাধীনতার অব্যাবহিত আগে-পরের নির্বাচন কেমন হয়েছিল তা আমার মনে না থাকলেও মুরুব্বীদের কাছে নিশ্চয় মনে আছে।
আমি আমার বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম- তিনি ৭০ সালে ভোট দিতে পেরেছিলেন কীনা এবং দিলে কাকে দিয়েছেন। হ্যাঁ, ইয়াহিয়ার সামরিক সরকারের অধীনে যে নির্বাচন হয়েছিল, সে নির্বাচনে তিনি এবং পরিবার-গোষ্ঠীর সকলেই ভোট দিতে পেরেছিলেন এবং তারা সকলেই আওয়ামীলীগকে ভোট দিয়েছিলেন। জানান আমার পিতা।
এরপরের কাহিনী সবার জানা। ওই নির্বাচনে আওয়ামীলীগ বা বাঙালীরা বিজয়ী অর্জন করেছিল। কিন্তু পাকিস্তানের ক্ষমতায় আর যেতে দেওয়া হয়নি। কত আশা করে ভোট দিয়েছিলেন সবাই। পাকিস্তানীরা ধরে নিলো, বাঙালীরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক! তারা ক্ষমতা পাওয়ার মতো যোগ্য নয়!
ভোটের মর্যাদা রক্ষায় অবশেষে অস্ত্র হাতে নিল বাঙালীরা আর দীর্ঘ ৯ মাসের যুদ্ধে লক্ষ প্রাণের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জন করে বিজয়। ছিনিয়ে আনে দেশের স্বাধীনতা। এরপর ৭৩ সালে কী ধরনের নির্বাচন হয়েছিল বা এরপরের নির্বাচন- তা আমরা কমবেশি জানি। কিন্তু স্বাধীনতার পর এই পর্যন্ত অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোর মধ্যে মাত্র ৪টি মোটামুটি গ্রহণযোগ্য হলেও কোন নির্বাচনই বিতর্ক বা সন্দেহমুক্ত ছিল না। অর্থাৎ স্বাধীনতার পর আমরা বাঙালীরা একে অপরকে বিশ্বাস করতে পারিনি। ক্ষমতার জোরে, পেশীর জোরে একজন আরেকজনকে ঠকিয়েছি।
আমার বাবাকে প্রশ্ন করেছি, পাকিস্তান আমলেও কি এই ধরনের নির্বাচন হত? তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, এই ধরনের নির্বাচন হলে ৭০-এ আমরা (আওয়ামীলীগ) কি বিজয়ী হতে পারতাম?
আমরা দেখি বর্তমান পাকিস্তান, এমনকি যাদেরকে আমরা ‘বর্বর’ বলি সেই বার্মার সামরিক জান্তা যে নির্বাচন করেছে সেই নির্বাচনও কি আমরা জাতিকে উপহার দিতে পেরেছি? বা সেই স্বাধীনতার আগের পাকিস্তানী সামরিক শাসকদের মতো?
যদি প্রশ্নটির উত্তর নেতিবাচক হয়, তাহলে আমরা কীভাবে তাদের চেয়ে উৎকৃষ্ট হলাম? উৎকৃষ্ট হওয়াতো দূরের কথা, বরং তাদের চেয়ে নিকৃষ্ট নই কি?
আমরা নিজের ভোটতো বটেই, অপরের ভোটও নিজের খুশিমত দিয়ে দিই। আমাদের প্রশাসন সেখানে সহযোগিতা করে। আমাদের দেশের নেতারা কারচুপি বা জালিয়াতির পেছনে নানা যুক্তি খাড়া করে। এরমধ্যে সবচেয়ে ‘শক্তিশালী’ ও বহুল ব্যবহৃত যুক্তি হল ‘চেতনা’। যারা ক্ষমতায় যায়, তারাই একেক চেতনা খাড়া করে। আমার দেশের প্রশাসনও সেই চেতনায় চলে! কিন্তু আমাদের স্বাধীনতার চেতনা বা লক্ষ্য কি ছিল এই ধরনের নির্বাচন অনুষ্ঠানের? এই প্রশ্ন করার পর বাবার মুখে কোন উত্তর নেই। দু:খিত তাঁকে বিব্রত করার জন্য।