প্রযুক্তি কীভাবে রাজনীতি ধ্বংস করে দিচ্ছে—কয়েক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যম এ-সংক্রান্ত খবরে ভরে গেছে। চীনের মতো একনায়কতান্ত্রিক দেশের ভয় হচ্ছে, সেখানে হয়তো জর্জ অরওয়েলের ১৯৮৪ উপন্যাসের মতো বড় ভাইসুলভ অতি ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের জন্ম হতে পারে। আর যুক্তরাষ্ট্রের মতো গণতান্ত্রিক দেশে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো ভুয়া খবর ছড়ানোর পথ সুগম করে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভাজন আরও বাড়িয়ে দেবে, এমন ভয় আছে। আর সেখানে তারা আদর্শিক ‘ফিল্টার বাবল’ তৈরি করতে পারে, যেখানে মানুষ শুধু নিজের পছন্দের মত নিয়েই থাকবে—এতে অনেকটা অল্ডাস হাক্সলির ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড-এর মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। বস্তুত, গণতন্ত্র ও একনায়কত্বের মধ্যে সাযুজ্য এনে নতুন প্রযুক্তি এই উভয় অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যবস্থাকে অসম্ভব করে তুলেছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে ভীত হওয়ার কিছু নেই।

গণমাধ্যম চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ১৯তম কংগ্রেসের যে খবর দিয়েছে, তাতে সি চিন পিংয়ের ক্ষমতা সংহত করার খবরই বেশি এসেছে। পর্যবেক্ষকেরা সতর্ক করে দিয়েছেন, তিনি তথ্যযুগের একনায়কত্ব তৈরির চেষ্টা করছেন, যেখানে আশা করা হয়েছিল, প্রযুক্তি একসময় চীনের ১৪০ কোটি মানুষকে স্বাধীনতা দেবে, সেখানে বরং তিনি নিজের ক্ষমতা সংহত করেছেন। ইন্টারনেট এখন চীনা নেতাদের জনগণের চাহিদা, অনুভূতি ও আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে জানান দেয়, ফলে তাঁরা এখন মানুষের অসন্তোষের খবর আগেই পেয়ে যান। অন্য কথায়, তাঁরা এখন পাশবিক বলপ্রয়োগ না করে বিগ ডেটা ব্যবহার করে স্থিতিশীলতা বজায় রাখছেন।

এই ডেটা বা তথ্য-উপাত্তের ভান্ডার সত্যিই বড়। চীনে এখন ১৭ কোটির বেশি মুখ চিহ্নিতকরণ নজরদারি ক্যামেরায় নাগরিকদের প্রতিটি গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় চালিত নিরাপত্তাব্যবস্থা সন্দেহভাজন অপরাধীদের চিহ্নিত করতে পারে—তারা কি হ্রদের ধার দিয়ে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে, নাকি রাস্তার ধারে পিঠা কিনছে—এই ব্যবস্থা সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে এই খবর জানিয়ে দিতে পারে। এই তথ্য সংগ্রহকারী ক্যামেরা চীনের ‘সামাজিক বিশ্বাস’-সংক্রান্ত তথ্যভান্ডারের সঙ্গে যুক্ত, যেখানে দেশটির সরকার জনগণের ঋণযোগ্যতা বা বিশ্বাসযোগ্যতা, ভোগের ধরন ও সামগ্রিক নির্ভরযোগ্যতা-সংক্রান্ত মোটা মোটা ফাইল জমা করে।

চীনা কমিউনিস্ট পার্টি দলের নিচু স্তরের নেতাদের নিয়ন্ত্রণে ডজনখানেক অ্যাপ বানিয়েছে, যার মাধ্যমে তারা দলীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে থাকে। এ ছাড়া তারা প্রযুক্তির আরও কিছু ক্ষমতায়নকারী বৈশিষ্ট্য রুখে দিয়েছে, ব্যাপারটা হলো, তারা সব প্রযুক্তি কোম্পানিকে চীনে সার্ভার রাখতে বাধ্য করেছে। কার্যত তারা দেশের ভেতরে সেন্সরশিপ আরোপ করেছে।

মার্কিন রাজনীতিতে প্রযুক্তির ব্যবহার আরও দৃশ্যমান। কিন্তু সেখানে ব্যাপারটা বাজারের সাপেক্ষে বিশ্লেষণ করা হয়, রাষ্ট্রের সাপেক্ষে নয়। সেখানকার সবচেয়ে দৃষ্টি আকর্ষক খবরের মধ্যে আছে গত বছরের নির্বাচনে ‘ভুয়া খবরের’ ভূমিকা। ফেসবুক স্বীকার করেছে, নির্বাচনী প্রচারণার সময় ১২ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন নাগরিক ভুয়া খবর দেখেছে। আরও সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের স্পেশাল কাউন্সেলর এবং গত বছরের নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপের বিষয়ে তদন্তকারী রবার্ট মুয়েলার ট্রাম্পের প্রচারণা ব্যবস্থাপক পল মানাফর্টের বিরুদ্ধে ১২টি অভিযোগ এনেছেন, যার মধ্যে ‘যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে’ ষড়যন্ত্রের অভিযোগও আছে। ট্রাম্পের প্রচারণার পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা জর্জ পাপাডৌপলাসের বিরুদ্ধে এফবিআইয়ের কাছে মিথ্যাচারের অভিযোগ উঠেছে, যদিও তিনি সম্প্রতি দোষ স্বীকার করে তদন্তকারীদের সঙ্গে সহযোগিতা করছেন।

তবে এসব বড় ঘটনার চেয়ে আরও উদ্বেগের কারণ হচ্ছে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো মানুষের প্রাপ্ত তথ্যের নিয়ন্ত্রণ করে। এরা গোপন অ্যালগরিদম দিয়ে নির্ধারণ করে, আমরা কীভাবে পৃথিবী সম্পর্কে ধারণা করব। ফলে মানুষের পক্ষে সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে উঠছে। দার্শনিকেরা মনে করেন, এটাই মানুষের মুক্ত ইচ্ছার মৌলিক মাত্রা।

বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মূল্যমান অনেক দেশের জিডিপির চেয়েও বেশি। তারা মুনাফা বাড়াতে চায়, সামাজিক কল্যাণ নয়। গুগলের প্রকৌশলী এবং পরবর্তী সময়ে অ্যাকাডেমিক বনে যাওয়া জেমস উইলিয়ামস বলেছেন, ডিজিটাল যুগে আমাদের মনোযোগ আকর্ষণের এক তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। আর এতে ট্রাম্পের চেয়ে কেউ বেশি উপকৃত হননি। তাঁর জন্য যেমন ইন্টারনেট আছে, তেমনি রোনাল্ড রিগ্যানের জন্য ছিল টেলিভিশন। একই সময়ে দেখা যাচ্ছে, প্রায় সব জায়গাতেই রাজনীতিতে প্রযুক্তির ব্যবহার প্রায় একই রকম। প্রযুক্তির কল্যাণে উন্মুক্ত ও বদ্ধ সমাজের মধ্যকার সুনির্দিষ্ট পার্থক্য ঘুচে যাচ্ছে। তেমনিভাবে পরিকল্পিত ও উন্মুক্ত অর্থনীতির বিভেদও ঘুচে যাচ্ছে। শেষমেশ যা হচ্ছে তা হলো, কোনোটাই আদর্শরূপে থাকতে পারছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ব্যাপক নজরদারির তথ্য ফাঁস করে এডওয়ার্ড স্নোডেন এটা পরিষ্কারভাবে দেখিয়ে দিয়েছেন, রাষ্ট্রের এমন সর্বভূতে বিরাজ করার আকাঙ্ক্ষা শুধু চীনের নয়, সবার মধ্যেই আছে। বরং ব্যাপারটা এর উল্টো, এটা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার ধারণার একদম গোড়ায় আছে। তবে চীনে ব্যাপারটা কিছুটা উল্টো দিকে যাচ্ছে। এটা নিশ্চিত যে চীনা সরকার বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে চাপ দিচ্ছে, যাতে করপোরেট সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখার সুযোগ দেওয়া হয়। আর এদের তথ্যভান্ডারে সরাসরি প্রবেশাধিকারও চাইছে তারা। একই সঙ্গে ইন্টারনেট চীনা রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রকৃতি বদলে দিচ্ছে, তাকে আরও বেশি করে ভোক্তা চাহিদার ব্যাপারে সচেতন হতে তাড়না দিচ্ছে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সার্চ ইঞ্জিন বাইদুর হয়ে কাজ করা এক বন্ধু আমাকে বলেছেন, তাঁদের কোম্পানি কীভাবে মানুষের নিয়ন্ত্রিত হওয়ার অভিজ্ঞতার পরিসর বাড়িয়ে থাকে। তারা পরীক্ষা করে, মানুষ কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হতে চায়। বিশাল প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান আলিবাবার প্রধান জ্যাক মা বলেছেন, চীন এই বিগ ডেটা ব্যবহার করে এমন রাষ্ট্রযন্ত্র বানাতে পারে, যা মুক্তবাজার অর্থনীতির চেয়েও বেশি কার্যকর হতে পারে। মা বিশ্বাস করেন, ‘পরিকল্পিত অর্থনীতি বড় থেকে আরও বড়ই হতে থাকবে।’

ডিজিটাল যুগে মুক্ত ও বদ্ধ সমাজ ক্রমশ পরস্পরের মুখোমখি দাঁড়িয়ে যাবে—এটাই কিন্তু বড় বিপদ নয়। বরং উভয় সমাজেই অরওয়েল ও হাক্সলির ভয়টাই দৃশ্যমান হবে, যেটা একধরনের অনাকাক্ষিত রাষ্ট্র তৈরি করবে। নাগরিকদের অনেক গভীর আকাঙ্ক্ষা পূরিত হলে তারা স্বাধীন ও ক্ষমতায়িত হওয়ার ভ্রমের মধ্যে থাকবে। কিন্তু বাস্তবে তাদের জীবন বা যে তথ্য তারা গ্রহণ করে এবং তাদের সিদ্ধান্ত—এসব কিছুই নির্ধারণ করবে অ্যালগরিদম ও জবাবদিহিহীন করপোরেট ও সরকারের কর্তা ব্যক্তিরা।

Comments are closed.