মিষ্টি রোদ আর পাখির কিচির মিচিরে সকাল হয় এই দেশ। গোধূলীর আঠালো রং আর পশু-পাখির নীড়ে ফেরা দিয়ে শুরু হয় রাত। তারপর রাতে পেঁচার ডাক। আকাশে তখন চাঁদের জ্যোৎস্নার বন্যা। মৃদু বাতাসে নদীর পানির সলাৎ সলাৎ শব্দ; পানির বুকের উপর চাঁদের আলো আছড়ে পড়ছে। ছোট ছোট ঢেউ-এ ঝিলিক ধরে, মনে হয় চাঁদের আলো আর পানির নৃত্য হচ্ছে।

ফসলি মাঠের কচি পাতা আর আম্রমুকুলের ঘন ঘ্রাণ বাতাসকে ভারি করে তোলে। এমন সৌন্দর্য পৃথিবীর আর কোথায়ও আছে বলে আমার জানা নেই। এটা তো গেল অন্তর আর বহিঃচক্ষুর সমন্বয়ের দেখা। এবারে আসল কথা বলি। আমাদের রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সমুদ্র সৈকত, রয়েছে বৃহত্তর ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। তাছাড়াও সমুদ্র সৈকত এবং বনাঞ্চলের নয়নভিরাম দৃশ্য রয়েছে পটুয়াখালীর কুয়াকাটায়। কুমিল্লার কোট বাড়িতে রয়েছে অসংখ্য ছোট বড় টিলা যা সবুজ গাছে আবৃত। এখানে চোখের দৃষ্টিসীমার মধ্যে শুধুই টিলা আর নানা প্রজাতির গাছ। অন্যদিকে রয়েছে সিলেট মৌলভীবাজারের টিলা ও চা-বাগান, রয়েছে মাধবকুন্ড পাহাড় ও ঝর্ণা। তাছাড়া বৃহৎ পার্বত্য চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান সেন্টমার্টিন দ্বীপ, যা পর্যটকদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এত সম্ভাবনাময় স্থান থাকা সত্ত্বেও যথার্থ অবকাঠামোর অভাবে পর্যটকদের ভিড় বাড়ছে না আমাদের দেশে। অন্যদিকে একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, ভারতের যেসব পর্যটন নগরীতে পর্যটকদের ভিড় থাকে তার চেয়ে সৌন্দর্যের দিক থেকে কমতি নেই আমাদের এই অঞ্চলের। মনে হতে পারে ভারত স্বয়ং সম্পূর্ণ বলে তারা পর্যটন অঞ্চলগুলোর অবকাঠামো সৃষ্টি করেছে। ব্যাপারটা ভুল। আসল সত্যটা হচ্ছে ভারত তার রিসোর্স সঠিকভাবে কাজে লাগাচ্ছে। তারা বুঝে গেছে এই খাতে স্বল্প বিনিয়োগে দীর্ঘমেয়াদী আয় করা সম্ভব। এই দিক থেকে আমাদের একটা সুবিধা হলো আমরা যে অঞ্চলগুলোকে আকর্ষণীয় পর্যটন স্পষ্ট বলে মনে করি, ঐসব অঞ্চলে এমনিতেই বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে, অতএব আমরা এক ঢিলে দু’টি কার্যসাধন করতে পারি।

১। ঐ অঞ্চলের সুবিধা বঞ্চিত মানুষ সুবিধা পাবে,

২। পর্যটন শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটবে। আমাদের পর্যটন শিল্প প্রসারিত না হওয়ার পেছনে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যেমন :

১। সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি : আমাদের দেশের সরকারগুলো এই খাতটি চিনতে পারেনি। কখনও এই সেক্টরে কারও নেক দৃষ্টিও ছিল না। আমরা কোন সরকারের সমালোচনা করতে চাই না। কিন্তু এতটুকু বলতে পারি, যদি দেশের উন্নয়নের কথা তারা আর একটু ভাবতেন তাহলে এ সেক্টরটা জ্বলে উঠা অসম্ভব ছিল না।

২। অধিবাসীদের সাথে বৈরী সম্পর্ক : পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা রাঙ্গামাটি, বান্দরবানে যুগযুগ ধরে বসবাস করে আসছে চাকমা, মারমা, মুড়ংসহ অনেক ধর্ম ও বর্ণের মানুষ। কিন্তু যেভাবেই হোক ঐ অঞ্চলের লোক তুলনামূলক সুবিধাবঞ্চিত। ফল স্বাভাবিকভাবেই ঐ অঞ্চলের মানুষের সাথে আমাদের দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে যা কাম্য ছিল না। সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত মানুষগুলো আজ কিছুটা হলেও পার্শ্ববর্তী ভারতের কিছু অঞ্চলের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। যেমন, মিজোরাম, এতে করে দু’টি সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে : ১। সুবিধা বঞ্চিত হয়ে ঐ অঞ্চলের অধিবাসীরা একটু উগ্র হয়ে উঠেছে এবং সরকারের সাথে এদের ব্যাপক দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে।

৩। সুবিধা বঞ্চিত মানুষগুলোর দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে ভারতীয় বিচ্ছিন্নবাদীরা। যে কারণে ঐ অঞ্চল হয়ে উঠেছে ভয়ংকর, তাই ভয়ংকর হয়ে উঠেছে স্বাভাবিক বিচরণ। আর এমন একটি অন্ধকার স্থানে পর্যটকরা অবশ্যই যাবেন না। তাই সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ঐ অঞ্চল রয়ে যাচ্ছে অন-উৎপাদনশীল। এতদসত্ত্বেও দু’টি আলোর শিখা দেখা যাচ্ছে এই সেক্টর ঘিরে :

১। এ অঞ্চলের দুর্গম পাহাড় কেটে রাস্তা নির্মাণ।

২। চা-শিল্পের প্রকল্পায়নে, চা-বোর্ডের সাথে ঐ অঞ্চলের নেতাদের বৈঠক। সেনা সদস্যরা এ অঞ্চলের দুর্গম পাহাড়ে রাস্তা নির্মাণের কাজ করছেন (পত্রিকা সংবাদ অনুযায়ী), যা অবশ্যই মঙ্গলময়। আর চা-শিল্প যদি এই অঞ্চলে গড়ে উঠে তবে দুইভাবে লাভবান হবে দেশ। ১। সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার হবে। ২। ঐ অঞ্চলের মানুষের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পাবে এবং পর্যটন শিল্পের একটি নতুন দিক উন্মোচন হবে।

সর্বোপরি এই শিল্পের সম্প্রসারণ করতে হলে, প্রথমেই রূপান্তরিত করার মানসিকা সৃষ্টি করতে হবে। মনে রাখতে হবে এখানে স্বল্প বিনিয়োগে অধিক এবং দীর্ঘমেয়াদী আয় করা সম্ভব। অন্যদিকে দেশের এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দৃশ্যপট পৃথিবীর বুকে তুলে ধরতে হবে যে কোন উপায়ে। যাতে পৃথিবীর মানুষ বারবার আসে, রবি নজরুল আর জীবনানন্দের রূপোসী বাংলায়।

Comments are closed.