কুরবানী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে অদ্যাবধি প্রতিটি যুগে, প্রতিটি ধর্মে কুরবানীর প্রথা চালু আছে। যদিও একেক ধর্মের নিয়ম-পদ্ধতী একেক ধরণের ছিল। আল কোর-আনের সূরা মায়েদার ২৭ নং আয়াতে আদমপুত্রদ্বয় হাবিল-কাবিলের কুরবানীর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা পাওয়া যায়। সূরা সাফফাতের ১০১ থেকে ১১১ নং আয়াতে হযরত ইব্রাহীম (আ.) কর্র্তৃক স্বীয় প্রিয়পুত্র ইসমাইল (আ.) এর কুরবানীর যে বিবরণ রয়েছে, তা ইতিহাসের এক স্মরণীয় অধ্যায়। বস্তুতঃ ইসলামী শরীয়তের কুরবানী একে কেন্দ্র করেই আবর্তিত।

কুরবানী কী?

কুরবানী শব্দটি আরবী ‘কুরব’ বা ‘কুরবানুন’ শব্দ হতে উদগত। এর অর্থ-নৈকট্য, সান্নিধ্য, উৎসর্গ, ত্যাগ স্বীকার, আতœদান ইত্যাদি। ব্যাপক অর্থে, যে বস্তু দ্বারা আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করা যায়। চাই তা যবেহকৃত বা অন্য কোন দান-খয়রাত হোক।আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় করা প্রত্যেক পুণ্যকাজকেই কুরবানী বলা হয়। ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় কুরবানী বলা হয়-আল্লাহর নৈকট্য লাভে যা নিবেদন করা হয় তা জন্তু হোক বা অন্য কিছু। তবে প্রচলিত অর্থে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উদ্দেশ্যে জন্তু জবেহকে বলা হয় কুরবানী। ‘উযহিয়া’ বা ‘নাহর’ সমার্থ শব্দ।

হযরত যাইদ বিন আরকাম (রা.) সূত্রে বর্ণিত আছে, একদা কতক সাহাবী মহানবী (সা.) এর প্রতি আরজ করলেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ! কুরবানী কী? মহানবী (সা.) বললেন, তোমাদের পিতামহ ইব্রাহীম (আ.)’র সুন্নাত। তারা পুনঃজিজ্ঞাসা করেন, এতে আমাদের ফায়দা কী? মহানবী (সা.) বললেন, কুরবানীর পশুর প্রতিটি লোমের বিনিময়ে একটি করে নেকী পাবে।” (ইবনে মাজাহ, মিশকাত) এ হাদীসের ব্যাখ্যায় আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী (রহ.) লিখেছেন, কুরবানী পূর্ববর্তী শরীয়তের এমন একটি ইবাদত যা ইসলামী শরীয়তেও বহাল রয়েছে। আল কোর-আনে বর্ণিত আছে, ‘আমি প্রত্যেক জাতির জন্য কুরবানীর প্রথা জারি রেখেছি। যাতে তোমরা আমার দেয়া চতুষ্পদ জন্তুর উপর আমার নাম নেবে।’ (সূরা হজ্ব) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা আলুসী (রহ.) লিখেছেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কুরবানীর প্রথা সকল ধর্মে বিধিবদ্ধ করে দেয়া হয়। তাফসীরে হাক্কানীতে আছে, হযরত মুসা (আ.), হযরত ইয়াকুব (আ.), হযরত ইসহাক (আ.) ও ইব্রাহীম (আ.)’র শরীয়ত সমূহেও কুরবানী করা ধর্মের আইনরূপে স্বীকৃত ছিল। বহুতর বিকৃত বাইবেলেও কুরবানীর উল্লেখ রয়েছে বহ জায়গায়।

কুরবানীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মানবেতিহাসে সর্বপ্রথম কুরবানীর প্রচলন হয় হযরত আদম (আ.)’র পুত্রদ্বয় হাবিল ও কাবিলের হাতে। আল কোর-আনে বর্ণিত আছে, ‘আদম পুত্রদ্বয়ের সত্য ঘটনা লোকদের শুনাও। যখন তারা উভয়ে কুরবানী পেশ করে।’ অতঃপর একজনের (হাবিল) কুরবানী কবুল হয় এবং অপরজনের (কাবিল) অগ্রাহ্য হয়। তখন কাবিল হাবিলকে বলে আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করব। হাবিল বলে, আল্লাহ খোদাভীরুদের কুরবানী কবুল করেন।’(সূরা মায়িদা)  হাবিল ও কাবিলের কুরবানী কি ছিল তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নে দেয়া হল।

হযরত আদম (আ.) ও মা হাওয়া (আ.) পৃথিবীতে অবতরণের পর থেকে তাদের ঔরসে তাদের মৃত্যুর সময় মানুষের সংখ্যা ৪০ হাজারে উপনীত হয়েছিল। মা হাওয়া (আ.) প্রতি বারই এক ছেলে ও এক মেয়ে জন্ম দিতেন। হযরত আদম (আ.)’র প্রথম পুত্র কাবিলের সাথে যে মেয়ে ভুমিষ্ঠ হয় সে ছিল খুবই সুন্দরী। আর হাবিলের সাথে যে মেয়ে ভুমিষ্ঠ হয় সে ছিল তুলনামূলক কম সুন্দরী। অতঃপর বিবাহের সময় হলে আদম শরীয়ত মতে সে পড়ে কাবিলের ভাগে। আর সুন্দরীটি পড়ে হাবিলের ভাগে। কিন্তু ইবলিশ শয়তানের প্ররোচণায় কাবিল এতে অসন্তুষ্ট হয়ে সে দাবী করে যে, তার সাথে ভূমিষ্ঠ ভগ্নিকে তার চাই। কিন্তু পিতা আদম (আ.) তা অস্বীকার করেন। ফলে সে রাগান্বিত হয় এবং হাবিলের শত্র“ হয়ে -উঠে। পিতা আদম (আ.) উভয়ের সংঘাত নিরসন কল্পে একটি পন্থা বের করে বললেন, তোমরা দু’জন আল্লাহর উদ্দেশ্যে কুরবানী কর। যার কুরবানী কবুল হবে-তার আকদে ঐ মেয়েটি দেয়া হবে।সেকালে কুরবানী কবুল হওয়ার লক্ষণ হিসেবে আসমান থেকে এক ধরণের আগুন এসে তা ভস্ম করে দিয়ে যেত। কিন্তু যা কবুল যোগ্য নয়, তাকে স্পর্শও করত না। হযরত নুহ (আ.)’র যুগেও কুরবানীর প্রচলন ছিল। হযরত নুহ (আ.) জন্তু জবেহ করার উদ্দেশ্যে একটি কুরবানীগাহ নির্মাণ করেছিলেন। এবং তাতে জবেহকৃত পশু আগুন দ্বারা জ্বালিয়ে দিতেন।

তারপর দুনিয়ার ইতিহাসে নজিরবিহীন কুরবানী পেশ করেন হযরত ইব্রাহীম (আ.), এবং তার যুগ থেকেই প্রচলিত কুরবানীর প্রচলণ শুরু হয়। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ ইব্রাহীম (আ.)’র কুরবানীর ইতিহাস বিবৃত করেছেন এ ভাবে যে, মুসলিম মিল্লাতের জনক হযরত ইব্রাহীম (আঃ)  এর কোন সন্তান-সন্তুতি ছিল না। তিনি বৃদ্ধ বয়সে মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করলেন- হে আমার প্রভূ ! আমাকে একটি সহনশীল পুত্র দান করুন। মহান আল¬াহ তাঁর প্রার্থনা কবুল করে একটি নেককার পুত্র দান করলেন। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) তাঁর আদুরে পুত্রের নাম রাখলেন‘ইসমাইল’।

ক্রমান্বয়ে ছেলেটি যখন বড় হতে লাগল। যখন ইসমাইল তের বছর বয়সে উপনীত হয়ে পিতার সাথে চলাফেরা করতে পারেন এবং বিপদে-আপদে পিতার সাহায্য করতে পারেন, তখন হযরত ইব্রাহীম (আঃ) স্বপ্নে আদিষ্ট হলেন তাঁকে কুরবানী করতে।হযরত ইব্রাহীম (আঃ) স্বীয় সন্তানকে বললেন-“হে আমার প্রিয় বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি-তোমাকে জবেহ করছি।” এখন তোমার অভিমত কী ? এখানে একটি কথা উল্লেখ্য যে, নবীদের স্বপ্ন ওহীস্বরূপ।

হযরত ইসমাইল (আঃ) এর হৃদয়ে প্রস্ফুটিত হয়ে গেল যে, এটা আল¬াহর আদেশ।তাই তিনি উত্তরে বললেন-“হে আমার মুহতারাম পিতা! আপনি আদেশপ্রাপ্ত কাজ অতিদ্রুত সম্পন্ন করে ফেলুন। ইনশা আল¬াহ আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন।”

পিতা-পুত্র মহান আল্ল¬াহর আদেশ পালনার্থে সন্তুষ্টিচিত্তে মিনা প্রান্তরের দিকে রওয়ানা হলেন। যাওয়ার সময় হযরত ইব্রাহীম (আঃ) স্বীয় আস্তিনে লুকিয়ে রশি ও ছুরি নিয়ে নিলেন। পথিমধ্যে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) কে শয়তান প্রতারিত করতে সচেষ্ট হলে, প্রতিবারই হযরত ইব্রাহীম (আঃ) কংকর মেরে শয়তানকে বিতাড়িত করে দেন। এ কাজটি আল্লাহর নিকট পছন্দ হওয়ায় তিনি পবিত্র হজ্জে এ আমলটি সন্নেবেশিত করে দিয়েছেন। তাই এই বিধানটি মিনা ময়দানে তিন স্তম্ভে তিন কংকর মারার মাধ্যমে পালিত হয়।

পিতা-পুত্র মিনায় পৌঁছার পর হযরত ইসমাইল (আঃ) বললেন- হে আমার পিতা! আমাকে খুব শক্তভাবে বেধে নিন; যাতে আমি ছটফট করতে না পারি। আর আপনার পরিধেয় গুটিয়ে নিন; যাতে তাতে রক্ত না লাগে, অন্যথায় আমার সাওয়াব হ্রাস পেতে পারে এবং আমার জননী তা দেখে অতি ব্যাকুল হয়ে যাবেন। আর আব্বাজান! আপনার ছুরি শানিত করে নিন এবং আমার গলায় দ্রুত চালাবেন; যাতে আমার প্রাণবায়ু অতিদ্রুত বের হয়ে যায়। কেননা মৃত্যু অতি কঠিন বিষয়। আর আম্মাজানকে আমার সালাম দিবেন। সম্ভব হলে আপনার সাথে আমার জামা নিয়ে যাবেন। হয়তো তা দেখে আমার জননী একটু শান্ত্বনা পাবেন।

এ কথা শুনে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) স্বীয় পুত্রকে চুমু খেলেন এবং বললেন- তুমি এ কাজে আমার বড়ই  সহায়তাকারী। অতঃপর তাকে জমিনে কাত করে শুইয়ে দিলেন।তারপর তাঁর গলায় দ্রুত ছুরি চালালেন। কিন্তু বহু চেষ্টা করেও গলা কাটতে পারলেন না, তখন হযরত ইসমাইল (আঃ) ছুরির নিচে শায়িতাবস্থায় বলতে লাগলেন-হে আব্বাজান! আমাকে উপুড় করে শুইয়ে দিন; তাহলে অতিদ্রুত আমাকে জবেহ করতে পারবেন। আমার চেহারা দেখে আপনার মায়া হয়; যার দরুণ আমাকে জবেহ করতে পারছেন না। তাছাড়া আমিও আপনার ছুরি দেখে ঘাবড়ে যাই।

একথা শুনে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) স্বীয় সন্তানকে উপুড় করে শুইয়ে দিয়ে তার গলায় দ্রুত ছুরি চালালেন। এমনি মুহুর্তে অদৃশ্য হতে আওয়াজ এলো- হে ইব্রাহীম (আঃ)! আপনি স্বীয় স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করেছেন। আপনি স্বীয় রবের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন।” ( সূরা সাফফাত)

আওয়াজ শুনে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) পাশে তাকিয়ে দেখেন-হযরত জিব্রাইল (আঃ) একটি জান্নাতি দুম্বা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তখন হযরত ইব্রাহীম (আঃ) আল্ল¬াহর আদেশে ঐ দুম্বাটিকে জবেহ করলেন।

মহান আল্ল¬াহর নিকট তাদের পিতা-পুত্রের এই সীমাহীন আত্মত্যাগ পছন্দ হওয়ায় কিয়ামত পর্যন্ত তিনি উম্মতে মুসলিমার সকল সামর্থবান নারী-পুরুষের উপর কুরবানী করা ওয়াজিব করে দিয়েছেন। ( তাফসীরে মা’আরেফুল কোরআন থেকে সংক্ষেপিত) কিয়ামত পর্যন্ত তার সেই নজিরবিহীন কুরবানীর স্মৃতিকে দুনিয়ার বুকে কায়েম রাখতে ইসলামী শরীয়তে প্রত্যেক সামর্থবান পুরুষ-মহিলার উপর কুরবানী ওয়াজিব করে দেয়া হয়।

কুরবানীর লক্ষ্য ও  উদ্দেশ্য

কুরবানীর উদ্দেশ্য হচ্ছে- তাক্বওয়া ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। এ সম্পর্কে আল কোর-আনে বর্ণিত হচ্ছে-‘আল্লাহর নিকট কুরবানীর পশুর গোস্ত ও রক্ত পৌঁছেনা, তার কাছে পৌঁছে শুধু মনের তাক্বওয়া।’ (সূরা হজ্ব-৩৭) এছাড়াও কুরবানীর লক্ষ্য হল- নিজের মনের খাহেশাত ও নফসের চাহিদাকে আল্লাহর রাস্তায় কুরবানী করে নিজেকে দ্বীনের জন্য নিবেদন করা। এবং প্রতিটি কাজে ইখলাস অবলম্বন করা। এক্ষেত্রে গোশ্ত খাওয়া কুরবানীর উদ্দেশ্য নয়, বরং পশু জবেহ করার মাধ্যমে আল্লাহর আদেশ পালন করাই মূল উদ্দেশ্য। আর গোশ্ত হচ্ছে- মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য উপহার।

Comments are closed.