আপনি গরু বা ছাগল জবাই দিয়ে যদি তার পুরো মাংসটা ডিপ ফ্রিজে রেখে দেন তো সেটা কোরবানী নয়। বলা যেতে পারে কসাই সাহেবের উপরে আপনার আস্থা নেই, তাই আপনি নিজেই একটা আস্ত গরু জবাই দিলেন। এখন কয়েক মাস ধরে একটু একটু করে সেটা দিয়ে আপনি পেট পুজা করবেন।

তা হলে কোরবানী কি? কোরবানী হল আপনি আপনার টাকা খরচ করে একটা গরু/ছাগল/উট/দুম্বা কিনবেন। তারপর তার অধিকাংশ মাংসই অভাবী গরীব দুঃখীদের মাঝে বিলিয়ে দেবেন। অর্থাৎ আপনি ত্যাগ করবেন। তাতে অসহায় দুঃখী মানুষ উপকৃত হবে। এমন কি আপনি যদি পাড়ার বসিরউদ্দিন আর রইসুদ্দিনদের সাথে কে কত বড় গরু কোরবানী দিতে পারল, তার প্রতিযোগীতায়ও নামেন, তারপরও উপকারটা শেষ পর্যন্ত গরীব মানুষদেরই। হ্যাঁ, প্রতিযোগীতা করে কোরবানী দেয়ার কারণে আপনি অবশ্য নির্ধারিত সোয়াব থেকে বঞ্চিত হবেন। কিন্তু যেকোন বিচারেই কোরবানীটা গরীব দুখীদের জন্যই।

এবার আসা যাক ত্রাণ কি? প্রাকৃতিক র্দুযোগের কারণে কিছু মানুষ যে সাময়িক বা দীর্ঘ মেয়াদী অসহায়ত্বের শিকার হন, তার থেকে রক্ষা করার একটি প্রক্রিয়া। সহজ করে বলতে গেলে বলতে হয়, কিছু অসহায় মানুষকে সাহায্য করা। যদি ক্যামেরার সামনে ত্রাণ দেন, তো সেখানে কিছু দুই নম্বরী ব্যাপার থাকার সমূহ সম্ভাবনা। আর নিরবে নিভৃতে দিলে ধরে নেয়া যায় মানব সেবাই আপনার আসল লক্ষ্য। এ সমস্ত অসহায় মানুষদের অনেকেই নিজে থেকে ঘুরে দাঁড়াবার ক্ষমতা রাখেন। অনেকেই রাখেন না। তবে একথা অনস্বীকার্য যে ত্রাণ বিষয়টিও মূলতঃ অসহায় মানুষদেরই জন্যে। এবং এটাও এক ধরনের ত্যাগ।

অর্থাৎ, কোরবানী এবং ত্রাণ- দুটোই অসহায় বা গরীব মানুষদের সাহায্যের দুটি আলাদা আলাদা প্রক্রিয়া। প্রশ্ন উঠেছে কোনটা বেশী মানবিক? কোনটা বড় ত্যাগ?

এখন তাহলে বিবেচ্য বিষয়, ত্যাগের ক্ষেত্রগুলো কি কি? প্রশ্নটা বোধ করি জটিল হয়ে গেল। সহজ করে বলি, আপনার বাড়ির পাশের সখিমন বিবিকে আগে সাহায্য করবেন? নাকি ২০০ মাইল দূরের তারামন বেওয়াকে আগে সাহায্য করবেন? আপনার চাচার শ্যালকের ছোট ভাইয়ের ভাগ্নীকে আগে মানবতা দেখাবেন? নাকি দূর সম্পর্কের আত্মীয়কে এড়িয়ে একেবারেই চেনেন না এমন কারো উপকার করে মানবিক হবেন? চাচার শ্যালকের ছোট ভাইয়ের ভাগ্নীর কথা বললাম একারণে যে, যে ব্যক্তি তার আপন চাচা বা ভাইয়েরই খোঁজ রাখে না সে মূলতঃ মানুষ কিনা সেটাই প্রশ্ন সাপেক্ষ। যাহোক, কোনটাতে বেশী মহান হওয়া যায়, সেই বিচার আপততঃ আপনাদের উপরেই ছেড়ে দিলাম।

আমি একটু ভিন্ন কিন্তু সর্ম্পকিত বিষয়ে দৃষ্টি আর্কষণ করতে চাই। এ বছর তর্কটা ত্রাণ বনাম কোরবানী হলেও অন্যান্য বছরে ইস্যুটা থাকে সরাসরি কোরবানী দেয়া না দেয়া নিয়ে। কেউ বলেন এটা ধর্মীয় ব্যাপার, দিতেই হবে। কেউ বলেন গরীব দুখিদের জন্যেই তো এই মানবিক আয়োজন। কেউবা বলেন উৎসব করে পশু হত্যা কোন ভাবেই মেনে নেয়া যায় না। এটা অমনবিক।

এই পৃথিবীর অনেকেই পশুর মাংস খান না। তারা ভেজিটেরিয়ান বা নিরামিষাশি নামে পরিচিত। সংখ্যায় অল্প হলেও এক দল আছেন, যারা মনে করেন, গাছ থেকে ফল ছেঁড়াটাও এক ধরনের অমানবিক ব্যাপার। যে সব ফল আপনা থেকেই ঝরে পড়েছে, শুধু সেগুলোই খাওয়া যাবে। যতদূর জানি এরা নিজেদের ফ্রুটোরিয়ান বলে দাবী করেন।

এই পৃথিবীতে হরেক রকমের মানুষ বসবাস করে, আর এটাই এই পৃথিবীর সৌন্দর্য। ভিন্ন মত থাকবেই। কিন্তু সেটাকে প্যাঁচিয়ে উপস্থাপন করাটা বোধ হয় যুক্ত সংগত নয়। যারা উৎসব করে পশু হত্যা পছন্দ করেন না তারা বিষয়টার সাথে ত্রাণ বিতরণকে না জড়ালেই বোধ হয় ভাল হয়। সরাসরি বলেন, আমি কোরবানী প্রথার বিরুদ্ধে। যারা ধর্মকেই পছন্দ করেন না তারাও সরাসরি বলেন আমার র্ধমীয় কোন আচারে আস্থা নেই। এটা গণতন্ত্রের দেশ। আপনার বিশ্বাস, একান্তই আপনার। সেটা সরাসরি বলেন। আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেন। হয়ত আজ না হলেও কাল আপনার দল ভারী হবে। কিন্তু প্লিজ ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে আপনার আদর্শগুলোকে প্রকাশ করবেন না। তাতে শুধু অহেতুক বির্তকই বাড়ে।

লেখক :

ঢাকার বিশিষ্ট ফিল্ম নির্মাতা ত্রিকোণ চলচ্চিত্রের পরিচালক

Ihtisham Ahmad Tingku

Comments are closed.