নবম হিজরী। মক্কা বিজয়ের পর আরবের দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছড়িয়ে পড়েছে ইসলাম। আরবের বাইরে ও নানা দেশের রাজ দরবারে প্রেরিত দূত সাহাবায়ে কিরামের মাধ্যমে ও ব্যবসায়ী সাহাবাদের মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় ইসলামের দাওয়াত পৌছে যাচ্ছিল। অনেক দূর দূরান্ত থেকে ও গোত্রের পর গোত্র মদীনায় এসে ইসলাম গ্রহণ করে আল্লাহর রাসুলের (সঃ) আনুগত্যের শপথ নিচ্ছিলেন। চারদিকে ইসলামের জয়যাত্রা পূর্ণমাত্রায় ধাবমান ছিলো।
এমনই সময়ের একদিনের ঘটনা। মধ্য আরবের নজদ প্রদেশ থেকে দুজন লোক একটি গুরুত্বপূর্ণ চিঠি নিয়ে রাসুল (সঃ) এর দরবারে আসলো।
রাসূল (সঃ) এর মজলিশে এক সাহাবী এই চিঠি তাঁকে পড়ে শুনাচ্ছিলেন। চিঠিতে লিখা ছিলো–
“আল্লাহর রাসূল মুসাইলামার পক্ষ হতে আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের (সঃ) এর নিকট এই পত্র। আপনার সাথে (রিসালাতের) এই কাজে আমাকে ও (আল্লাহর পক্ষ থেকে) অংশীদার বানানো হয়েছে। তাই এখন থেকে দুনিয়ার অর্ধেক যমীন আমার ভাগে আর বাকী অর্ধেক কুরাইশের (আপনার) ভাগে। তবে কুরাইশরা সীমা লংঘনকারী অসভ্য সম্প্রদায়।”
চিঠির প্রথম বাক্য শুনেই রাসূল (সঃ) এর চেহারা মুবারক কালো হয়ে গেলো। তিনি পত্র বাহকদের জিজ্ঞেস করলেন, এই চিঠির ব্যাপারে তোমাদের বক্তব্য কি?? তখন পত্রবাহকেরা উত্তর দিলো “তিনি (মুসাইলামা) যা বলেছেন আমরা তা বিশ্বাস করি এবং আমরাও তাই বলি।” তখন রাসূল (সঃ) এই দূতদের বললেন, আল্লাহর কসম! তোমরা যদি দূত না হতে, তাহলে তোমাদের শির আজ ছিন্ন করে দিতাম।
তারপর রাসূল (সঃ) ফিরতি জওয়াবী চিঠি লিখে পাঠালেন মুসাইলামার কাছে।
“আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের কাছ হতে মিথ্যাবাদী মুসাইলামার নিকট (এই পত্র)। হিদায়াতের অনুসারীর উপর আল্লাহর শান্তি। আর এই দুনিয়া আল্লাহর। তিনি তাঁর বান্দাদের ভেতর যাকে ইচ্ছা তার উত্তারাধিকারী বানান। তবে সর্বশেষে সুন্দর শুভ পরিনাম মুত্তাকীদের জন্যেই।”
কিন্তু শয়তানের দোসর মুসাইলামাতুল কাজ্জাব। এত সুন্দর চিঠি পেয়ে ও সে হিদায়াতের পথে আসলো না। বরং রসুল হওয়ার নাম করে ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির স্বাদে পাগল হয়ে তার ভন্ডামীপূর্ণ কার্যক্রম চালিয়ে যেতে লাগলো। মিথ্যা নবুয়্যতের বিষাক্ত গাছের শিকড় ছড়িয়ে পড়তে লাগল বহু দূরে ও। অনেক মানুষ তার অনুসারী হয়ে গেলো।
অথচ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সঃ) সর্বশেষ নবী ও রাসুল। তাঁর পর আর কোন নবী রাসুল আসবেন না। তিনিই খাতিমুন নাবিয়্যীন।
অবশেষে তাকে থামাতে রাসূল (সঃ) আবারো পত্র লিখলেন। রাসূল (সঃ) এর সম্মানিত দূত হয়ে এই চিঠি নিয়ে মুসাইলামাতুল কাজ্জাবের কাছে ছুটে চললেন একজন সাহাবী।
যেমন সুদর্শন তেমনি বুদ্ধিমান, তেজোদীপ্ত ঈমানের বলে বলীয়ান অসম সাহসী এই সাহাবীর নাম ” হাবীব ইবনে যায়েদ (রঃ)”। একাই ছুটে চলছেন তিনি, সংগে কেউ নেই। অবশেষে দুর্গম গিরী কান্তার মরু উঁচু নিচু সব পাহাড় পর্বতের দুর্দম বাধা ডিংগিয়ে তিনি পৌছে গেলেন “নজদের” বনু হানীফা গোত্রে। তারপর সেখানে সোজা মুসাইলামাতুল কাজ্জাবের নিকট রাসূল (সঃ) এর চিঠি হস্তান্তর করলেন।
চিঠি পড়ে মুসাইলামাতুল কাজ্জাবের চেহারায় ঝড়ের পূর্বাভাস দেখা দিলো। হিংসা আর জিঘাংসা মিশ্রিত ক্রোধে অস্থির হয়ে চিৎকার দিয়ে সে তার অনুচরদের ডেকে বললো “যাও একে (সাহাবী কে) বন্দী করে রাখো। আগামীকাল ভরা দরবারে তাঁর বিচার হবে ”
পরদিন সকালে বিচারের ভরা মজলিসে জমকালো আসনে মুসাইলামা সমাসীন। আশে পাশে বিবেকান্ধ অনুচরেরা। সামনে উৎসাহী জনতার ভীড় প্রচুর। তারা মদীনা থেকে আগত রাসুল (সঃ) এর বন্দী দূত এর শাস্তি দেখতে অপেক্ষা করছে রুদ্ধশ্বাসে।
নিশ্বাস আটকে থাকা নিরব গুমোট এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি। সবার মাঝে বন্দী হাবীব ইবনে যায়েদ (রাঃ) দাড়িয়ে আছেন মাথা উঁচু করে, তাঁর চেহারায় ভয় ভীতির কোন চিহ্নই নেই।যেন সাহসী এক সিংহ পুরুষ অমিত তেজে দাড়িয়ে আছে একপাল ভীতু ছাগলের মাঝে। চলছে কথোপকথন মুসাইলামার সাথে তাঁর।
মুসাইলামাঃ তুমি কি স্বাক্ষী দাও মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল?
হাবীবঃ হ্যা, আমি স্বাক্ষী দেই মুহাম্মাদ (সঃ) আল্লাহর রাসুল।
মুসাইলামাঃ তুমি কি স্বাক্ষী দাও আমি ও আল্লাহর রাসূল?
একথা শুনেই হজরত হাবীব ইবনে যায়েদের রক্তে আগুন ধরে গেলো। এই উম্মাদ বলে কি? তিরস্কার আর বিদ্রুপের বান মেশানো কন্ঠে তিনি বললেন,
হাবীবঃ তোমার অইই নাপাক মুল্যহীন কথা গুলো রাখো। অন্য কিছু বলার থাকলে বলো।
সাথে সাথে ক্রোধে রাগে অস্থির হয়ে মুসাইলামা জল্লাদকে ডেকে নিলো। বললো তাঁর একটি অংগ তরবারীর আঘাতে বিচ্ছিন্ন করে ফেলো। জল্লাদ তাই করলো। হাবীব (রাঃ) এর শরীর থেকে রক্তের অঝোর ধারা নেমে এলো নজদের যমীনে।
এভাবে প্রতিবার তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো আর উনি প্রতিবার ই মুসাইলামার মত ভন্ডকে অস্বীকার করে আমাদের প্রিয়তম রাসূল (সঃ) এর সর্বশেষ রিসালাত আর নবুয়্যতের স্বাক্ষ্য দিয়ে যেতে লাগলেন। বিনিময়ে প্রতিবারই জল্লাদের তরবারীর আঘাতের পর আঘাতে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হতে লাগলো শরীর থেকে তাঁর একেকটি অংগ প্রত্যংগ।
তাঁর রক্তের ফিনকিধারা ভিজিয়ে দিচ্ছে শুকনো যমীনের বুক, অথচ তাঁর মুখে পবিত্র হাসির সাথে বের হচ্ছিলো খাতেমুন্নাবিয়্যীনের চিরন্তন স্বাক্ষ্য।
মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহি (সঃ) এর সর্বশেষ নবী ও রাসুল হওয়ার স্বাক্ষী দিতে দিতে প্রচুর রক্ত ক্ষরণে একসময় নিস্তেজ হয়ে এলো তাঁর চোখের আলো। দুর্বল হয়ে গেল পা দুটো। লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে। স্থির হয়ে গেল তাঁর জিহবা। ছিন্ন বিচ্ছিন্ন অংগহীন দেহ থেকে সাত আসমানের উপরে অন্তহীন জান্নাতের গন্তব্য পানে ছুটে যাচ্ছিল তাঁর পবিত্র রুহ টি।
তখনো তাঁর ওষ্ঠাধর থেকে ক্ষীন অস্ফুট আওয়াজ বের হচ্ছিলো…….
মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ….
মুহাম্মদ (সঃ) আল্লাহর রাসূল……..

Comments are closed.