বাংলাদেশের উপকূলীয় বনায়নবাংলাদেশের উপকূলীয় বনায়ন

883

দেওয়ান জাফরুল হাসান :

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি সার্বভেীম রাষ্ট্র যা দক্ষিন-পূর্বে (১৯৩ কি.মি.) মায়ানমার বেষ্টিত ক্ষুদ্র সীমান্ত ছাড়া তিনদিকে ভারত দ্বারা বেষ্টিত (৪০৯৫ কি.মি.) বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের দক্ষিণ অবস্থিত (৭১০ কি.মি.)। বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানা ২০০৩র্৪ ও ২৬০৩র্৮ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৮০০র্১ ও ৯২০৪র্১ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত। এটি উষ্ণমন্ডলীয় দেশ যার আয়তন ১,৪৭,৫৭০ বর্গ কি.মি.। অক্টোবর থেকে জানুয়ারী পর্যন্ত মৃদু শীতকাল এবং মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত আর্দ্র গ্রীষ্মকাল। এদেশের জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্য। মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে মে থেকে সেপ্টেম্বর সময়কাল সহ বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ প্রায় ২০০০ মি.মি.।

ঘুর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছাসসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রায়ই এদেশে আঘাত হানে। বাংলাদেশ অসংখ্যা নদী বেষ্টিত  নিম্ন ভূমির ব-দ্বীপ। প্রধান নদ-নদীর মধ্যে রয়েছে গঙ্গা (পদ্মা), ব্রহ্মপুত্র এবং মেঘনা। এর ভূমিরূপ গভীর, উর্বর এবং সমতল। অধিকাংশ ভূমি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কমপক্ষে ১২ মি. উঁচুতে অবস্থিত যেখানে সর্বাধিক উচ্চতা প্রায় ১০৫২ মি.। এদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৫২.৫১৮ মিলিয়ন (BBS জরিপ ২০১১) এবং মাথাপিছু আয় প্রায় ৮৪৮ মার্কিন ডলার (১ মার্কিন ডলার= ৮২ টাকা; ২০১১ সাল)। মোট জনসংখ্যার ৯৮% বাঙালী এবং অল্পসংখ্যক উপজাতি রয়েছে। দেশের ৮৯% লোক ইসলাম, ১০% হিন্দু এবং ১% লোক বৌদ্ধ ও খ্রীষ্টধর্মাবলম্বী। সামগ্রিক (নারী ও পুরুষ) স্বাক্ষরতার হার ৫১.৮% (WARPO, ২০০০ এবং বিবিএস জরীপ ২০১১)।বাংলাদেশের নদ-নদী ঃ বাংলাদেশ নিম্নভূমির ব-দ্বীপ যা গঙ্গা(পদ্মা) ব্রহ্মপুত্র (যমুনা) এবং মেঘনা নদী এবং এদের উপনদীগুলোর প্রবাহে গঠিত। গঙ্গা যমুনার সাথে মিলিত হয়ে (প্রধান শাখা ব্রহ্মপুত্র) পরবর্তীতে মেঘনার সাথে সংযুক্ত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়। এসব নদী বাহিত পলল জমা হয়ে সৃষ্টি করেছে পৃথিবীর সবচেয়ে উর্বর সমতল ভূমি। বঙ্গোপসাগরের মোহনায় নতুন জেগে ওঠা কর্দমাক্ত সমতল ভূমিকে (স্থানীয়ভাবে চর নামে পরিচিত) স্থিতিশীল করার জন্য ১৯৬৬ সাল থেকে বাংলাদেশ উপকূলীয় বন বিভাগ ম্যানগ্রোভ বনায়ন সৃষ্টি করে চলছে। এই ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ঘুর্ণিঝড় এবং সামুদ্রিক জলোচ্ছাসের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক বেষ্টনী হিসেবে কাজ করছে। বনভূমি ঃ ভৌগোলিক বিস্তৃতি  ভূ-সংস্থান এবং জলবায়ু বিভিন্ন ধরণের বনভূমি সৃষ্টি করে। অধিকন্তু বাংলাদেশ বনবিভাগ দক্ষিণ উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক হারে বনায়ন করে চলছে, যেখানে বাংলাদেশের তিনটি বড় আকারের প্রাকৃতিক বন রয়েছে। প্রাকৃতিক এবং পত্রঝরা সমতল শালবন (Shoria robusta) বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় এবং উত্তর-পশ্চিমাংশের সমতল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। প্রধানত ঢাকা, টাঙ্গাইল এবং ময়মনসিংহ এই তিন জেলা জুড়ে বনভূমি বিস্তৃত। সিলেট, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার জেলার উত্তর-পশ্চিমাংশ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাংশ জুড়ে রয়েছে চিরসবুজ পাহাড়ী বন। এছাড়া রাঙামাটি ও বান্দরবনেও রয়েছে পাহাড়ী বন। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে, সাতক্ষীরা, খুলনা এবং বাগেরহাট জেলায় অবস্থিত দেশের সর্ববৃহৎ একক প্রাকৃতিক বনাঞ্চল যা সুন্দরবন (৬০০০.০০ বর্গ কি.মি.) নামে পরিচিত। বনের প্রকারভেদ, অধিকৃত এলাকা এবং বিস্তৃতি ঃ যদিও “গৃহসংলগ্ন” বনাঞ্চল ০.৭৭ মিলিয়ন হেক্টর (৭৭০০ বর্গ কি.মি.) এলাকা জুড়ে আছে দেশের বৃহত্তম বনাঞ্চল হচ্ছে চট্টগ্রামের পাহাড়ী এলাকা ও সুন্দরবন। জনপ্রশাসনের অন্থর্ভুক্ত প্রায় ০.৭৩ মিলিয়ন হেক্টর (৭৩০০ বর্গ কি.মি.) রাষ্ট্রীয় বনভূমি বা অন্তভূক্তিহীন রাষ্ট্রীয় বনভূমি নামে পরিচিত তা বিলীন হয়ে যাচ্ছে এবং প্রতিকূলতার সম্মুখীন হচ্ছে বিশেষত উপজাতি অধিবাসীদের চাষাবাদের ফলে। ১৯৬৬ সাল থেকে বন বিভাগ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের উন্নতি সাধন করেছে প্রধানত বঙ্গোপসাগরের মোহনায় নতুন বৃদ্ধি পাওয়া কর্দমাক্ত সমতল ভূমিতে কেওড়া রোপনের মাধ্যমে যা ০.০২ মিলিয়ন হেক্টর জুড়ে ব্যপ্ত। পাহাড়ের চিরসবুজ ও পত্রঝরা বন ৬৭০০ বর্গ কি.মি. এলাকা জুড়ে ব্যপ্ত এবং এটি টিক বৃক্ষের উৎস যা ভারী নির্মাণ ও নৌকা বানানোর কাজে ব্যবহৃত হয়। ¯্রােতজ ম্যানগ্রোভ বনভূমি সুন্দরবন বঙ্গোপসাগরের তীরে প্রায় ৬০০০ বর্গ কি.মি. এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এটি কড়িকাঠের উৎস যা বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়। যেমনঃ কাগজ শিল্পে মন্ড তৈরীতে, বৈদ্যুতিক তারের খুটি এবং ঘরের জন্য ছাউনি নির্মাণে পাতা।বাংলাদেশের উপকূলীয় দৃশ্যপট ঃবাংলাদেশের উপকূলীয় সীমানা ৭১০ কি.মি.। ১৯ টি উপকূলীয় জেলা, ১৫৩ টি উপজেলা এবং সংরক্ষিত অর্থনৈতিক অঞ্চল (EEZ) বঙ্গোপসাগর নিয়ে বাংলাদেশের উপকূল সীমানা গঠিত। ১৯ টি উপকূলীয় জেলার মধ্যে ১২ টি জেলা উন্মুক্ত উপকূল বিশিষ্ট যা প্রাকৃতিক দুর্যোগ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। তীর হতে উপকূলীয় অঞ্চলে ভূমির দূরত্ব ৩০ থেকে ১৯৫ কি.মি. এর মধ্যে যেখানে উন্মুক্ত উপকূলীয় অঞ্চলের দূরত্ব ৫৭ কি.মি. পর্যন্ত। উপকূলীয় অঞ্চল দেশের মোট আয়তনের ৩২% এবং মোট জনসংখ্যার ২৮% উপকূল অঞ্চলে বসবাস করে। উপকূলীয় ভূমি মূলত কৃষিকাজ, চিংড়ি ও মৎস্য চাষ, বনায়ন, লবণ উৎপাদন, জাহাজ নির্মাণ শিল্প, সমুদ্র বন্দর এবং শিল্প কারখানার জন্য ব্যবহৃত হয়। উপকূলীয় অঞ্চলের জমির ব্যবহার বহুবিধ, প্রতিযোগিতামূলক এবং কখনও সংঘাতমূলক। বাংলাদেশের উপকূলীয় বনায়নের উদ্দেশ্য ঃ প্রচুর মানুষের জীবন এবং সম্পদ নষ্ট করে একটি বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় হওয়ার পর ১৯৬৬ সালে উপকূলীয় বনায়নের প্রাথমিক পদক্ষেপ শুরু হয়। বাংলাদেশে উপকূলীয় এলাকাকে রক্ষা করার জন্য অগ্রবর্তী এবং উপকূলীয় বেষ্টনীতে কেওড়া গাছ লাগিয়ে ভূমিকে স্থিতিশীল করে দেয়। উপকূলীয় বনায়নের পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্দেশ্যসমূহ নিম্নরূপ ঃ উদ্দেশ্য ঃক্স মানব বসতিকে রক্ষা করা।ক্স প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে জীবন, সম্পত্তির এবং কৃষি শস্য রক্ষা করা। ক্স নতুন জেগে ওঠা ভূমিকে স্থিতিশীল করা। ক্স দেশের বনজ সম্পদকে বৃদ্ধি করা। ক্স পরিবেশের অবনতি থেকে উন্নতি সাধন করা এবং জীব বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করা। ক্স বনায়নের মাধ্যমে প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে বেঁচে থাকার ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। বিভিন্ন প্রকল্পের নাম/ বাংলাদেশের উপকূলীয় বনায়নের কর্ম পরিকল্পনা ঃ ১৯৬৫-৬৬ থেকে ১৯৭৪-৭৫ সালের মধ্যে ‘Mangrove a forestation Project’ ’ এর মাধ্যমে কৃত্রিম ম্যানগ্রোভ বনায়নের প্রাথমিক পদক্ষেপ বাংলাদেশের বন বিভাগ থেকে নেওয়া হয়। যদিও প্রধান ম্যানগ্রোভ বনায়ন বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে করা হয়েছিল, রাজস্ব খাত থেকে খুবই স্বল্প পরিসরে ম্যনাগ্রোভ বনায়ন অথবা উপকূলীয় বা সুন্দরবন এলাকায় ভিন্ন রকম বনায়ন করা হয়েছিল।  নি¤েœ প্রকল্পের নাম ও ব্যপ্তি দেওয়া হল যে গুলোর উপকূলীয় বনায়নের মধ্যে প্রধানত ম্যানগ্রোভ বনায়ন ছিল। উপকূলীয় বন বিভাগ সমূহের মধ্যে বরিশাল, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার দক্ষিণ এবং ফেনী বিভাগে ২০১২ সাল পর্যন্ত মোট ১,৯০,১৯৬.৭০২ হেক্টর ম্যানগ্রোব বনাঞ্চল; ৮৪৬০.০৩ হেক্টর অম্যাগ্রোভ; ২৮৭২.৮৮ হেক্টর Nipa; ১০.০ হেক্টর নারিকেল, ৪০ হেক্টর Arica Palm; ২০০.০০ হেক্টর বাঁশ-বেত এবং ১১৭৭৬.৭৩ কি.মি. সরু বনায়ন করা হয়েছে। যদিও বাংলাদেশ উপকূলীয় এলাকার সারি বনায়ন ২০০৫-২০০৭ সাল থেকে গৃহসংলগ্ন বনাঞ্চলকে অন্তর্ভূক্ত করেছে, জাতীয় উদ্যান এবং বনসম্পদকে আত্তীকরণ এর মাধ্যমে। সরু বনায়ন বাংলাদেশে সকল উপকূলীয় বনায়ন এলাকা বহির্ভূত। মোট বনায়নের মধ্যে ৯৪% ম্যানগ্রোভ (অধিকাংশ Sonneratia aretala) এবং অবশিষ্টাংশ অতি ক্ষুদ্র, “Community Based Adaptation to Climate Change through through Coastal Affrication in Bangladesh প্রকল্পকে নন-ম্যানগ্রোভ বনায়নে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। ইঈঈজঋ ১৯১২ সালে শুরু হতে যাওয়া “Climate Resilient Participatory Aforestation and Reforstation in Coastal and Chittagong Hilly Areas প্রকল্পে বিভিন্ন উপকূলীয় বিভাগে সমৃদ্ধ বনায়ন তৈরি করার জন্য ম্যানগ্রোভ প্রজাতির কাংক্রা (Rhiziphora Mucronata), গেওয়া (Bruguiena gymnorhiza), বাইন (Avicennia marina), পশুর (Xylocapus mekongensis), সুন্দরী (Heritiera fomes) ইত্যাদি অপেক্ষাকৃত কম ঘনত্বের পুরানো বনায়ন অঞ্চল তৈরি করতে যাচ্ছে যা পূর্বে কখনও করা হয়নি। ঘরঢ়ধ উদ্ভিদ রোপনের ওপরও এই প্রকল্পে জোর দেওযা হয়েছে যা ভাল মাটি সংবন্ধক এবং উপকূলীয় ঝড় ও ¯্রােত প্রতিবন্ধক।  নি¤েœাক্ত সারণীদে (ঞধনষব ৩ থেকে ৮) বিভিন্ন বনবিভাগের অধীনে গৃহীত প্রকল্প সমূহের অধীনে বনায়ন এবং তাদের ব্যপ্তীকাল দেখানো হল।উপসংহার ঃজলবায়ু পরিবর্তনজনিত সৃষ্ট দুর্যোগ প্রবণ এলাকার মধ্যে বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম। ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুন্দরবন দেশের উপকূলীয় বনাঞ্চলকে রক্ষা করে চলেছে। ফলে দেশের অন্যান্য সবুজ বেষ্টনীবিহীন উপকূলীয় অঞ্চল অপেক্ষা এই অঞ্চলে দুর্যোগজনিত ক্ষয়ক্ষতির পরিামণ কম। ১৯৬৬ সালের প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় জীবন ও সম্পদের যে ব্যপক ক্ষতি সাধন করেছিল তার পর থেকেই বন বিভাগ উপকূলীয় বনায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করে। উপকূলীয় বনায়নের পরিমাণ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন যা প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে রক্ষাকারী বেষ্টনী হিসেবে কাজ করবে। উপকূলীয় বনায়ন জনগোষ্ঠী রক্ষা করা এবং জীবন ও সম্পদের ক্ষতির পরিমাণ হ্রাস করার পাশাপাশি নতুন জেগে ওঠা জমির পুষ্টি ও স্থায়িত্ব প্রদান করবে, দেশের বন সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি করবে, পরিবেশ বিপর্যয় রোধ করবে এবং জীব বৈচিত্রের উন্নতি সাধন করবে। উপকূলীয় বনায়ন জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত বিরূপ প্রভাব থেকে উপকূলীয় জনসাধারণকে সুরক্ষা প্রদান করবে।  চিত্রঃ উপকূলীয় এলাকায় চর বনায়ন।